সড়কে শৃঙ্খলা কেন ফিরিতেছে না

আপডেট : ০১ জুন ২০১৯, ২১:৪৭

সড়ক-মহাসড়কে মৃত্যুর মিছিল বন্ধ হইতেছে না। প্রতিদিনই ঝরিতেছে তাজা প্রাণ। খালি হইতেছে মায়ের বুক। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে ১০-১৫ জন করিয়া মৃত্যুর খবর পাওয়া যাইতেছে। এমন অনেক দুর্ঘটনাও ঘটে, যাহার খবর শেষ পর্যন্ত সংবাদপত্রের পাতায় ছাপা হয় না। সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনা এই দেশে জাতীয় দুর্যোগে পরিণত হইয়াছে। কিন্তু এই দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের এখনো  কোনো বিশেষ প্রস্তুতি নাই, উদ্যোগ নাই। কয়েক দিন আগে সাভারের আশুলিয়ায় বাসের চাকায় পিষ্ট হইয়া মারা যান একজন গার্মেন্ট শ্রমিক। ইহাতে তাঁহার সহকর্মীরা সড়ক অবরোধ করিয়া বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। তাঁহারা কয়েকটি বাস ভাঙচুর করিয়া আগুন লাগাইয়া দেয়। মাঝেমধ্যেই আমরা এমন বিক্ষোভ প্রদর্শন করিতে দেখি। বিশেষ করিয়া সড়ক দুর্ঘটনায় কোনো শিক্ষার্থী হতাহত হইলে তাহার সহপাঠীরা অনেক সময় রাস্তায় নামিয়া আসে। ইহার আগে সারাদেশে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের এই ধরনের ব্যাপক আন্দোলন গড়িয়া উঠিতে দেখিয়াছি আমরা। কিন্তু ইহার পরও আমাদের টনক নড়িতেছে না, দুর্ঘটনা কমিতেছে না। সড়কে নিয়ম-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায়  চালক ও পথচারীসহ সকলকেই সচেতনতার পরিচয় দিতে হইবে।

সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়া না আসিবার বড় কারণ চালকের বেপরোয়া মনোভাব ও নাগরিকদের সচেতনতার অভাব। চালকদের অনেকেই অপ্রাপ্তবয়স্ক। অদক্ষ ও প্রশিক্ষণবিহীন। কেহ কেহ মাদকাসক্ত। কেহ-বা আবার দীর্ঘসময় গাড়ি চালাইবার কারণে ঠিকমতন ঘুমাইতেও পারে না। চোখে ঘুম নিয়া গাড়ি চালাইতে বাধ্য হয়। মালিকদের দৈনিক জমা পরিশোধে চাপ থাকে। আবার যানজট-জনজটে তাহারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকা থাকিবার পর যেই একটু মুক্ত হয়, অমনি সময় বাঁচাইতে গাড়ি চালায় দ্রুত বেগে । কখনো কখনো ওভারটেকিংয়ের নির্মম প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় এবং দুর্ঘটনা ঘটায়। এদিকে রোড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ত্রুটি-বিচ্যুতির শেষ নাই। একটু পর পর সড়কে বাঁক, সড়ক ভাঙাচোরা। অনেক জায়গায় নাই প্রয়োজনীয় সাইন-সিগন্যাল। গ্রামগঞ্জ তো বটেই, খোদ রাজধানীর অনেক সড়কের সঙ্গে নাই ফুটপাত। ফুটওভারব্রিজের সংখ্যাও অপ্রতুল। ট্রাফিক পুলিশও সীমিত। বিভিন্ন সড়কে বসে কাঁচাবাজার, হকাররা তাহাদের পসরা সাজাইয়া বসে। তাহাদের ভিড় ঠেলিয়া গাড়ি চালানোই কঠিন।

এদিকে সড়কের অব্যবস্থাপনায় পথচারীরাও বেপরোয়া। তাহারা যত্রতত্র ও হাতের ইশারা দিয়া রাস্তা পার হয়। ফুটওভারব্রিজ থাকিলেও তাহা ব্যবহার না করিয়া ঝুঁকিপূর্ণভাবে চলাচল করে। এমনকি অনেক সময় পুলিশও তাহাদের আটকাইতে পারে না। যাহারা যাত্রীসাধারণ তাহারাও কম কীসে। জোরে গাড়ি না চালাইলে চালককে গরুর গাড়ির চালক বলিয়া বিদ্রুপ করে। এমনকি চালক-হেলপারকে গালিগালাজসহ তাহাদের গায়ে হাতও তোলে। অর্থাত্ নৈরাজ্য সর্বব্যাপী। এইসব নৈরাজ্য বন্ধে প্রথমে রাস্তাঘাট আগে ঠিক করিতে হইবে। ইহার পর চালক ও গাড়ি নিবন্ধন, প্রশিক্ষণ ইত্যাদি ব্যাপারে নিয়মকানুন প্রতিষ্ঠা করিতে হইবে। অতঃপর আসিবে সর্বস্তরের জনগণের সচেতনতার প্রশ্ন। আসিবে নিরাপদ সড়ক আইন বাস্তবায়নের প্রসঙ্গও। নূতন একটি আইন প্রণয়ন করা হইয়াছে, অথচ বিধিমালার অভাবে তাহা বাস্তবায়ন করা যাইতেছে না। ইহা কেমন কথা? এইসব অনিয়ম, অবহেলা ও উদাসীনতা বন্ধ হইলে কমিতে পারে সড়ক দুর্ঘটনা।