ইউরোপে উদারতাবাদ বনাম চরমবাদের উত্থান-পতন

আপডেট : ০১ জুন ২০১৯, ২১:৪৭

ইউরোপ গোটা পৃথিবীর সভ্যতার পাদপীঠ। সঙ্গত কারণেই ইউরোপের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজনীতি পৃথিবীকে আলোড়িত করে। সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপের সমাজ ব্যবস্থায় এমন সব পরিবর্তন প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে যা সকলের জন্য উদ্বেগ-উত্কণ্ঠার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ষোড়শ শতাব্দীতে ইউরোপীয় রেনেঁসার মাধ্যমে যে উদারতাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ও মানবতাবাদ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পৃথিবীকে আলোকিত করছিল সাম্প্রতিক সময়ে তা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে। স্নায়ু যুদ্ধের অবসানের পর তা ক্রমশ দৃশ্যমান হতে থাকে। সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদের আদর্শিক সীমারেখা দ্বারা বিভাজিত ইউরোপ সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করে। কিন্তু ‘সম্মুখে ঠেলিছে মোরে পশ্চাতের আমি’। অতীতের উত্তরাধিকার পরিবর্তন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। দীর্ঘ ৭০ বছর ধরে যে আদর্শে লালিত হয়েছে পূর্ব ইউরোপ, তাতে পরিবর্তন সহজ সাধ্য ছিল না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ‘নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার’ বা নতুন বৈশ্বিক ব্যবস্থায় একক সভ্যতার বিশ্ব অগ্রসরমান ছিল। এ সময়ে তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লব পৃথিবীকে ‘গ্লোবাল ভিলেজে’ পরিণত করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় পুঁজিবাদের অপ্রতিহত সম্প্রসারণ। গ্লোবালাইজেশন বা বিশ্বায়নের দর্শন রীতিমতো অর্থনৈতিক বিপ্লব সাধন করে। এ সব ইতিবাচক ঘটনার বিপরীতে পাশ্চাত্যের কতিপয় উদ্দেশ্যবাদী সমাজ বিজ্ঞানী ‘ক্লাস অব সিভিলাইজেশন’ বা সভ্যতার দ্বন্দ্ব তত্ত্ব হাজির করেন। এই তত্ত্বে সমাজতান্ত্রিক আদর্শের অবসানে ইসলামের সমাজ-সংস্কৃতিকে  ভবিষ্যত্ পৃথিবীর জন্য বিপজ্জনক বিবেচনা করা হয়। এ দিকে দীর্ঘকাল ধরে ঔপনিবেশিক যাঁতাকলে নিষ্পিষ্ট তৃতীয় বিশ্ব বিশেষত মুসলিম বিশ্বে ধূমায়িত ক্ষোভের প্রকাশ ঘটে। এক দল বিপদগামী মুসলিম গণতান্ত্রিক তথা নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষোভ প্রশমনের পরিবর্তে সন্ত্রাস তথা জঙ্গিবাদের পথ গ্রহণ করে। ওসামা বিন লাদেনের নেতৃত্বে বৈশ্বিক সন্ত্রাসী সংগঠন ‘আল কায়দা’ সমসাময়িক বিশ্বের সবচেয়ে ন্যক্কারজনক ঘটনাটি ঘটায়। ৯/১১ এর ঘটনায় আক্রান্ত হয় বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ার এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এ রকম নির্মম ও দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী আক্রমণ আর কখনো ঘটেনি। এই ঘটনা পাল্টে দিয়েছে পৃথিবীর ইতিহাসের গতি। শুরু হয় এক দীর্ঘমেয়াদি ঘোষিত এবং অঘোষিত যুদ্ধ। আক্রান্ত হয় লাদেনের আশ্রয়দাতা রাষ্ট্র আফগানিস্তান। সন্ত্রাসী রাষ্ট্রের অভিধায় দখলকৃত হয় ইরাক।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মূলত ইউরোপের সম্প্রসারিত অংশ। আবিষ্কার থেকে অধিকার ও অভিবাসন—সবকিছুই হয়েছে ইউরোপীয় শক্তিসমূহের প্রযত্নে। স্বাভাবিকভাবেই ৯/১১ এর ঘটনা ইউরোপকে ভাবিত ও প্রভাবিত করে। ইসলামি জঙ্গিরাও তাদের আক্রমণের লক্ষ্যস্থল ইউরোপে সম্প্রসারিত করে। আক্রান্ত হয় লন্ডন, প্যারিস, ব্রাসেলস এবং আরো অনেক জনপদ। যে সভ্যতার দ্বন্দ্ব ছিল শুধুমাত্র দর্শন তার বাস্তব প্রকাশ ও প্রমাণ ঘটে পাশ্চাত্যের ঘোষিত যুদ্ধে এবং ইসলামি জঙ্গিদের অঘোষিত আকস্মিক আক্রমণে। ঘোষিত হয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। যৌক্তিক কারণেই প্রায় ইউরোপীয় সকল রাষ্ট্রসমূহ এই যুদ্ধে সামরিক শক্তি নিয়ে সহায়তা করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে। বেড়ে যায় ইউরোপ কেন্দ্রিক জঙ্গি আক্রমণের পরিধি। অপরদিকে, চির অস্থির মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ- সিরিয়া, ইরাক, লিবিয়া, ইয়ামেন এবং অন্যান্য এলাকা থেকে আশ্রয়প্রার্থী মানুষের ঢল নামে উন্নত ইউরোপের প্রান্ত সীমায়। এমনিতেই ইসলামি জঙ্গিদের ক্রমবর্ধমান আক্রমণে ইউরোপের জনগণ মুসলিম জনগোষ্ঠীর উপর ক্ষুব্ধ। এর পর অভিবাসীদের সাগর পথে এবং স্থল পথে ইউরোপের বিভিন্ন সীমান্তে মুসলিম উদ্বাস্তুদের উপস্থিতি তাদের অনেকের ক্ষোভের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। একদা যে ইউরোপ গোটা পৃথিবীকে ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ শিক্ষা দিয়েছে তারা এ সময়ে সাম্প্রদায়িক আচরণ করে। খ্রিষ্ট ধর্মালম্বীরা সাদরে গৃহীত হয়। মুসলিমরা পরিত্যক্ত হয়। জার্মানি ও স্পেন অধিকতর উদার আচরণ করে। অন্যত্র তীব্র ঘৃণার প্রকাশ ঘটে। ইউরোপের বিভিন্ন শহর ও জনপদে ইসলামের ধর্মগ্রন্থ, নবী মুহাম্মদ (স), হিজাবের মতো ইসলামি প্রতীক আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। ইউরোপের সর্বত্র রাজনৈতিক দল, সিভিল সোসাইটি ও নাগরিক সাধারণ ইসলামি সন্ত্রাসের দ্বারা প্রভাবিত হয়। এমনকি বিভিন্ন দেশের জাতীয় এবং স্থানীয় নির্বাচনে এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। গোটা ইউরোপে উদারতাবাদ, চরমবাদের উত্থান-পতন ও নানা ধরনের সমীকরণের ঘটনা ঘটে।

প্রায় সমগ্র ইউরোপে উগ্র জাতীয়তাবাদের সম্প্রসারণ ঘটে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে হিটলার-মুসোলিনীর পর জাতীয়তাবাদী চিন্তায় এমন ওলট-পালট আর পরিলক্ষিত হয়নি। চিন্তার জগতে, রাজনীতিতে এ রকম বিরূপ প্রভাবের দৃশ্যমান কারণ ইসলাম ও মুসলমানরা হলেও একমাত্র কারণ নয়। সমাজতত্ত্ববিদরা মনে করেন, নাগরিক মানস পরিবর্তনে আরো অনেক গুরুতর কারণ রয়েছে। ইউরোপের অতিমাত্রিক আধুনিকায়ন জীবন ব্যবস্থাকে কৃত্রিম ও ভঙ্গুর করে তুলেছে। বিজ্ঞানের অসম্ভব অগ্রগতি মানবিকতার বিপর্যয় ঘটিয়েছে। ব্যক্তিগত স্বার্থপর জীবন দৃষ্টি তাদেরকে অধিকতর অন্তরমুখী করেছে। দেশ, ধর্ম, সংস্কৃতি ও বর্ণের ভিত্তিতে জাতীয় পরিচয় নির্ণয়ের প্রবণতা তাদেরকে চরম চিন্তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অভিবাসী দূরে থাক নিজ দেশের সংখ্যালঘু এবং আদিবাসীদের প্রতি তাদের অসহিষ্ণুতা বেড়ে চলেছে। অন্য দিকে বিশ্বায়ন, মুক্ত বাণিজ্য, অর্থনীতিক সহযোগিতা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রাধান্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে কোনো কোনো জনগোষ্ঠী। এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ হচ্ছে ‘ব্রেক্সিট’। ইতালি ও গ্রিসের মতো আরো কিছু দেশে এই বিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া জোরদার  হচ্ছে। এছাড়া অর্থনৈতিক মন্দা, সুশাসনের অভাব ও গণতন্ত্রের অবক্ষয়ের মধ্য দিয়ে জন্ম লাভ করছে এক ধরনের উগ্র মতবাদ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এর নাম দিয়েছেন ‘পপুলিজম’। বাংলায় এর প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে— লোকরঞ্জনবাদ বা জনহিতবাদ। জেনোফোবিয়া বা বিদেশিদের বিরুদ্ধে অসহিষ্ণু মনোভাবের বিস্তার ঘটছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আদলে কোনো কোনো দেশের নেতৃত্ব স্বার্থপর ও একদেশদর্শী নীতি গ্রহণ করছে। উদাহরণ হিসেবে অস্ট্রিয়ায় ফ্রিডম পার্টি, ব্রিটেনে ইনডিপেনডেন্টস পার্টি, ফ্রান্সে ন্যাশনাল ফ্রন্ট, ডেনমার্কে ডেনিস পিপলস পার্টি এবং হাঙ্গেরিতে কেডিএনপি-এর মতো দলের উত্থান উল্লেখ করা যায়। এসব দেশে তথাকথিত পপুলিজমের নামে কর্তৃত্বপরায়ণ নেতৃত্বের বিকাশ ঘটছে। জার্মানিতে উদার এঙ্গেলা মার্কেলের বিপরীতে এএফডির মতো উগ্র জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটেছে। মার্কেলের ক্ষমতার প্রতি চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়েছে। ইতালির ক্ষমতাসীন সরকার অভিবাসীদের ঢল সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। সেখানে দু-দুটি চরমপন্থি রাজনৈতিক দলের প্রতিপত্তি লক্ষ করা যাচ্ছে।

একক ইউরোপের ধারণা নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিকাশ ঘটেছে তা আজ অবক্ষয়ের সম্মুখীন হয়েছে। একটি জরিপে দেখা যায় যে, একক ইউরোপের ধারণা ৬০ থেকে ৩০ শতাংশে নেমে এসেছে। গোটা ইউরোপে গণতন্ত্রের ঘাটতি রয়েছে বলে একটি সমীক্ষায় দেখিয়েছেন সমাজবিজ্ঞানী আয়ান বারোমা। ব্যাপকভাবে দক্ষিণপন্থি চরমবাদ ও মধ্য দক্ষিণপন্থিদের উত্থান ঘটছে বিভিন্ন দেশে। ব্রিটেনে চরম দক্ষিণপন্থি ইনডিপেন্ডেস পার্টির কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। গ্রিসে দক্ষিণ মধ্যপন্থি গোল্ডেন ডন গোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটেছে। ইউরোপের রাজনৈতিক দলগুলো মুসলিমবিরোধী আবার কোথাও-বা ইহুদিবিরোধী এবং অভিবাসীবিরোধী ভূমিকা পালন করছে। বুলগেরিয়ায় ইহুদিরা কোণঠাসা হয়ে আছে। অন্যান্য দেশে অভিবাসনবিরোধী আন্দোলন জোরদার রয়েছে। এরা ক্রমশ গণতন্ত্রের পথে বাধার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চেথাম হাউজের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এর প্রমাণ রয়েছে। ইউরোপের উন্নত এবং শিক্ষায় অগ্রসর জাতিসমূহের মধ্যেও এই প্রবণতা বহমান রয়েছে। ফ্রান্সে ফ্রন্ট ন্যাশনাল পার্টি, সুইডেনে গণতান্ত্রিক দল এবং অস্ট্রিয়ার ফ্রিডম পার্টির নাম করা যায়। এই সব উদাহরণের বিপরীত চিত্রও রয়েছে।

অতি সম্প্রতি ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনে মধ্য ডানপন্থি ইউরোপিয়ান পিপলস পার্টি—এপিপিও মধ্য বামপন্থি সোস্যালিস্ট অ্যান্ড ডেমোক্রেটিক গোষ্ঠী তাদের জোটবদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। এবার নির্বাচনে সমর্থন বেড়েছে লিবারেল ও গ্রিনদের। এপিপির আসন কমলেও এককভাবে তারা পার্লামেন্টে বড় ব্লগ হিসেবে অবস্থান বজায় রেখেছে। প্রাথমিক ফলে দেখা গেছে, ইউরোপীয় পার্লামেন্টে ক্ষমতার নতুন ভারসাম্য সৃষ্টি হতে যাচ্ছে। মধ্যপন্থি অ্যালায়েন্স অব লিবারেল ডেক্রেটিক ফর ইউরোপ, উগ্র ডানপন্থি ইউরো সংশয়ী দলগুলো এবং গ্রিনস/ইউরোপিয়ান ফ্রি অ্যালায়েন্সের আগের চেয়ে বড় ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।

n লেখক :অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়