সময় গেলে সাধন হবে না

আপডেট : ০১ জুন ২০১৯, ২১:৪৮

যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে অবিরাম ছুটেচলা আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে গেছে যা নিজ সত্ত্বা থেকে আলাদা করা রীতিমতো দুঃসাধ্য। বেশিরভাগ সময় আমরা আমাদের কর্মফলের জন্য ভাগ্যকে দোষারোপ করে থাকি অথচ বাস্তবিকপক্ষে বিষয়টা তার উল্টো। আমরা নিজ নিজ কর্মফলের জন্য শুধু আমরাই দায়ী। মনে করি রাস্তা পারাপারের জন্য আমাদের হাতে সময় খুব কম থাকে। আবার একই সঙ্গে কম সময়ে রাস্তা পারাপারের জন্য যে পন্থা আমরা বেছে নেই তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এখন পছন্দের বিষয় আপনার হাতে যে বেশি ঝুঁকি গ্রহণ না কি নিরাপদে পার হবার জন্য সময় বেশি ব্যয় আপনার জন্য যথাযথ হবে। তবে সিদ্ধান্ত কিন্তু সময়ের যথার্থ বিশ্লেষণের সঙ্গেই নির্ধারণ করা আবশ্যক। প্রচণ্ড ব্যস্ত রাস্তায় কোনো নিয়ম না মেনে পার হবার দরুন যে দুর্ঘটনা দেখা যায় তা কমানোর জন্য সর্বাগ্রে চাই সচেতনতা ও দূরদর্শিতা।

প্রতিষ্ঠিত হবার লক্ষ্যে গন্তব্যে ছুটে চলার জন্য জীবনে রোজ আমরা কতশত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যাই। অথচ সময় জ্ঞানের অভাব ও তা যথাযথ কাজে না লাগাবার যে হেয়ালি আমাদের অভ্যাসগত ধ্যানধারণায় রূপান্তর হয়েছে তার ফলাফল সম্পর্কে ন্যূনতম সতর্কতা অবলম্বনের প্রয়াস নেই। যদি কেউ ছাত্র জীবনের সময়কে কাজে না লাগিয়ে হেয়ালি-দায়িত্ব জ্ঞানহীন জীবন কাটায় তবে পরবর্তী সময়ে জীবনে চলার পথটা অমসৃণ ও সংগ্রামে রূপান্তর হতে থাকে। প্রতিটা সময় নিজ নিজ স্থান থেকে সর্বোচ্চ দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে নিজ দায়বদ্ধতা নেওয়া একান্ত জরুরি।

সময় হচ্ছে তলোয়ালের মতো, যদি আমরা তা দিয়ে না কাটি তবে সেই আমাদের কেটে ফেলবে। প্রতিসেকেণ্ডে হারিয়ে যাওয়া সময়ের হিসেব করে রাখার যন্ত্র আমরা আবিষ্কার করতে সফল হলেও সময়ের কাজ সময়ে না করার কুফল আজো অপরিমেয়। আপনি চাইলেই ঘড়ির কাটা বদলে দিতে পারেন তবে  তা কখনোই আপনার অলসগতিতে কাটানো সময়ের কুফল কমাতে সহায়ক হবে না। আর এজন্যই বলা হয়, ‘সময়ের একফোঁড়, অসময়ের দশফোঁড়।’ এখানে অদৃশ্য শর্ত এই যে প্রকৃতি আপনাকে অসময়ের দশফোঁড় দিয়ে ক্ষতিপূরণের সুযোগ দিতে পারে।

আমরা পরে করবো করবো করে কত কাজ, দায়িত্ব তুলে রাখি যা করা হয়ে ওঠে না কিংবা সময়ের সঙ্গে তার গুরুত্ব হারিয়ে যায়। কিন্তু মানুষের সৃষ্টির সেরা জীব হবার সুবাদে এতটা বোকামি, অপারগতা ও অসচেতনতা মোটেও কাম্য নয় যা তাকে শুধু ভোগান্তি ও কুফলের দিকে ঠেলে দেবে। আমাদের নিজ ও পাশের মানুষগুলোর প্রতিদিনের! কার্যক্রম অনুধাবন করলে এ ধারণা বিশ্বাসে পরিণত হয়ে যায় যে আমরা মানুষ কতটা হেয়ালির সঙ্গে মূল্যবান সময় বিনা ভাবনাচিন্তায় নষ্ট করছি। একজন শিক্ষার্থীর ছাত্র জীবনে পড়াশুনার প্রতি দায়িত্বশীল থাকা মূল কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। অথচ পরীক্ষার আগের রাত ছাড়া আমাদের পড়ালেখায় কিছুতেই রুচি আসে না। ফলাফল এই যে আমরা শিক্ষাঙ্গনে কাঙ্ক্ষিত ফল লাভ করতে পারি না, এই ক্রমাগত না পারা আমাদের পড়াশুনার প্রতি বিতৃষ্ণা জন্ম দেয়, অনিহা থেকে কমে যায় ভালোবাসা অতঃপর ‘কোনো রকম চলুক’ এই লক্ষ্য নিয়ে শিক্ষাঙ্গনে কোনো রকম ঝুলে থাকাটাই হয় মুখ্য। যে শিক্ষার্থীর পড়াশুনায় অনিহা তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে অর্জিত জ্ঞান নিজ জীবন গঠন ও চাকরির বাজারে কতটা অবদান রাখবে সে আর বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রকৃতিগতভাবেই জীবনের পথ বন্ধুর, যার লক্ষ্য স্থির নয় তার পথটুকু আরো জটিল হয়ে যাবে এটাই কঠিন বাস্তব। চাকরির বয়স আছে ভাবতে ভাবতে যখন শেষ সময়ে এসে দেয়ালে পিঠ আটকে যায় তা থেকে ঘুরে দাঁড়াবার সাহস খুব কম মানুষের থাকে। সময় চলে যায়, সুযোগ হারায় আর পড়ে থাকে কাড়িকাড়ি আফসোস।

জীবনে ‘ব্যাক গিয়ার’ বলে কিছু নেই, এ বাস্তবতা সম্পর্কে যত দ্রুত সম্ভব মেনে নিয়ে প্রতিটি সময়ের যথাযথ পরিবেশে পরিচর্যা করা ও সময়ের প্রতি যত্নশীল হবার বিকল্প নেই। মনে রাখা প্রয়োজন যে, স্রষ্টার অগণিত সৃষ্টির মধ্যে মানুষ জাতিকে দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও সর্বোচ্চ সম্মানিত করেছেন। সে সম্মান ধরে রাখার জন্য সময়ের কাজ সময়ে করা, সময়ের প্রতি অধিক যত্নশীল হওয়া এবং সময় সংক্ষিপ্ততা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে সময়ের প্রতি যত্নশীল, সময় তাকে সুযোগ করে দেয়, প্রয়োজন শুধু বিচক্ষণতার সঙ্গে এ সংক্ষিপ্ত নিয়ামকের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা। সময় গেলে সাধন পূর্ণ হবে না, অর্জিত হবে না লক্ষ্য, প্রাপ্তিগুলো থাকবে তৃপ্তিহীন, জীবনের যথার্থ মানে খুঁজে না পেয়ে কাজ করবে হতাশা যা বুদ্ধিমান মানুষের কাছে কোনোক্রমেই আশা করা যায় না। সময়ের মূল্য শুধু সময়েই বোঝা যায়, তাই প্রতিটি মুহূর্তের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে জীবনের স্বপ্নগুলো সফলতায় রূপ নেবার প্রত্যাশায় পরিচালিত হোক আমাদের জীবন।

n লেখক:শিক্ষার্থী, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়