নিম্নবর্গের কথা বলতে গিয়ে গ্রামশি বলেন, ‘নিম্নবর্গ হলো পরাধীন ও নিচু শ্রেণির মানুষ যাদের ওপর ক্ষমতাবানরা আধিপত্যবাদী প্রভাব বিস্তার করতে চায়।’ একসময় এই প্রভাব একটি বিশেষ চেইনের মধ্যে আবদ্ধ থাকলেও এই প্রভাব ছড়িয়ে আছে সর্বত্র। ক্ষমতার সম্পর্ক ও আধিপত্য সমাজভেদে যেমন আলাদা, স্থান-কাল-পাত্র ভেদেও তা আলাদা। ক্ষমতাগত আধিপত্যচর্চার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হচ্ছে— ১. কথা বলতে না দেওয়া; ২. অবহেলা বা তাচ্ছিল্য। এ সবের মধ্য দিয়ে নিম্নবর্গের অবস্থান বা পদমর্যাদা সামাজিকভাবে যে নিচে, সেটি বুঝিয়ে দেওয়া হয়। হাজার বছরের ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতি ও ঔপনিবেশিক ক্ষমতা চর্চার প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যেতে যেতে আমাদের মস্তিষ্কের ভেতর এই চেতনা এখন অবচেতনেই কাজ করে যাচ্ছে।
‘অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার-১৪২৮’ প্রদান অনুষ্ঠানে এসে দেখলাম ভিন্ন এক চিত্র। অনন্যা কর্তৃপক্ষ যে আমাকে অনন্যা সাহিত্য পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেছেন এটি আমি জানতে পেরেছিলাম প্রায় মাস তিনেক আগে। সেই তখন থেকেই আমি এই অনুষ্ঠানটির জন্য অপেক্ষা করে ছিলাম। অনন্যা এমন এক স্বপ্ন যে স্বপ্ন দেখার দুঃসাহস আমি কখনো করিনি; কারণ, বিগত ২৭ বছর যাবৎ অনন্যা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন দেশবরেণ্য সাহিত্যিক ও কিংবদন্তিতুল্য নারীরা। সেখানে আমি তাঁদের পাশে দাঁড়াবার যোগ্যতা আজো অর্জন করে উঠতে পারিনি। তবু অনন্যা সম্পাদক তাসমিমা হোসেন আপা আমাকে মনোনীত করেছেন এই পুরস্কারের জন্য, এটা আমাকে এতটাই বিস্মিত করেছে যে আমি একেবারেই বাকরুদ্ধ হয়ে যাই। একটি মেয়ে যে ১৫ বছর আগে আত্মহননের চেষ্টার মধ্য দিয়ে জীবনকে অস্বীকার করতে চেয়েছিল—সে আজ ঠিক ১৫ বছর পর এমন একটি পুরস্কার পেল, যা দেওয়া হয় একজন লেখকের সার্বিক কাজকে বিবেচনা করে। আমি আসলে এতটা প্রত্যাশা করিনি।
পুরস্কারের দিন যখন আমার দেশীয় সংস্কৃতিতে তাসমিমা হোসেন আপার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করছিলাম—আপা বললেন, ‘এই মেয়ে, তুমি যখন এভাবে প্রণাম করো তখন তো আমি আর বসে থাকতে পারি না! আমাকে তো উঠে দাঁড়াতেই হয়।’ আপা আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে আমাকে বুকে টেনে নিলেন, মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করলেন। নিমেষেই আমার মায়ের মুখটা মনে পড়ে গেল!
প্রতিটি পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে আমি আমার মাকে মিস করি। ভীষণ মন খারাপ নিয়ে অনুষ্ঠানে অংশ নিই। তাসমিমা আপার স্পর্শে গভীরভাবে যেন মাকে উপলব্ধি করলাম। এমন একটি স্নেহশীতল হৃদয়ের পরশ আমি যখন খুব মিস করছিলাম তাসমিমা আপা তা নিমেষেই মিটিয়ে দিলেন! এছাড়া আকিমুন রহমান আপা, ঝর্না রহমান আপা, সোনালী আপাসহ প্রত্যেকেই আমাকে তাদের স্নেহের পরশ দিয়েছেন, আশীর্বাদ করেছেন। কাজেই এই অনুষ্ঠানটি আমার জীবনের সেরা উপহার। পুরস্কারের সঙ্গে যখন ভালোবাসা যুক্ত হয়, আন্তরিকতা যুক্ত হয়, তখন তা সত্যিকার অর্থেই অনন্য হয়ে ওঠে।
পুরস্কারের রাতে যখন বাসায় ফিরলাম আমাকে এক পাঠক ফোন করেছেন। তিনি বাগেরহাটের একজন নারী। তিনি বললেন—‘আপনি কি মনে করেন নারীরা জীবনের অর্থ বোঝে না? আপনি কয়েকটি পুরস্কার পেয়ে জীবনের অর্থ বুঝে গেছেন?’ কী হয়েছে বলতেই তিনি আমার পুরস্কারের একটি প্রকাশিত নিউজের কথা বললেন। আমি বললাম, এটি আমি বলিনি।
আমি ফোন রেখে চেক করলাম। কয়েকটি পত্রিকা সত্যিই ভুল করেছে। আমি যা বলিনি তা-ই আমার মুখে বসিয়ে দিয়ে নিউজ করা হয়েছে। এটা দুঃখজনক। যেমন অধিকাংশ পত্রিকা নিউজ করেছে এভাবে—যেমন আমি বলেছিলাম, ‘এই বিস্ময়ের ঘোর আমার কাটছে না!’ অথচ বলা হলো, ‘এই বিষয়ে ঘোর আমার কাটছে না।’ আবার বলা হলো, ‘যে সকল নারী জীবনের অর্থ বোঝেন না, তাঁদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, জীবনে প্রয়োজনের জন্য বাঁচুন।’ অথচ আমি বলেছি, ‘বিশেষত সেইসব নারী যাঁরা জীবনকে অর্থহীন মনে করেন, আমি তাঁদের বলতে চাই—জীবনকে প্রয়োজনীয় করে তুলবার বদলে আসুন প্রয়োজনীয় জীবনের পথ হাঁটি, হাঁটতে শিখি।’
আমি প্রয়োজনীয় জীবনের কথা বলেছি। একটি ফুল তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ভুলে নিজেকে অন্যরকম করে তুলতে চেষ্টা করে না, অন্যকে খুশি করার জন্য অন্যের প্রয়োজনকে সে আমলে নেয় না। সে নিজের সৌরভ ও সৌন্দর্যটুকু ছড়িয়ে দিয়ে প্রয়োজনীয় জীবনের পথে যেমন করে হাঁটতে চায় আমি সেই রকম হাঁটার কথা বলেছি। অথচ অধিকাংশ নিউজে আমার মুখে শোভা পাচ্ছে—জীবনকে পণ্য করে তোলার এই বিজ্ঞাপন ‘জীবনে প্রয়োজনে বাঁচুন’!! সবাই যে ভুল নিউজ করেছে, তা নয়, কোনো কোনো নিউজপোর্টাল আমার বক্তব্য সংক্ষিপ্ত করলেও তাতে অর্থের হেরফের হয়নি। যাঁরা চমৎকার করে নিউজ করেছেন তাঁদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি। যাঁরা ভুল করেছেন, আশা করি এটা ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল করেননি। তাঁদের আরো সচেতন হওয়া উচিত।
একসময় যেমন গ্রামের নিম্নবর্গের শিক্ষা ছিল গ্রামের ভূস্বামীর করুণার ওপর নির্ভরশীল, ঠিক তেমনিভাবে অনেকে মনে করেন, কোনো কোনো সাহিত্য পুরস্কারদাতার (অবশ্যই সকলে নন) করুণার ওপর যেন নির্ভরশীল সাহিত্যচর্চার স্বীকৃতি! আহা হেজিমনি! সেখানে ‘পাক্ষিক অনন্যা’ কর্তৃপক্ষ সেই আধিপত্যবাদী সংস্কৃতির চর্চা যে করেন না—তার প্রমাণ হলো—তাঁরা আমার মতো একজন তরুণকে সার্বিক সাহিত্যকর্মের মূল্যায়ন করে পুরস্কৃত করেছেন। ঐতিহ্য ভেঙে বয়স নয়, কাজকে বিবেচনায় নিয়েছেন, প্রায় ২৭ মিনিটের একটি ডকুমেন্টারি তৈরি করেছেন আমার ওপর! আমার কাজ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এই বিষয়গুলো আমার ভেতরে এক ধরনের প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। আর তাই আমি বলেছি, অকপটে বলেছি—অনন্যা কর্তৃপক্ষ যে আলো আমার কাজের ওপর ফেলেছেন, যে আস্থায় আমার হাতে পদক তুলে দিয়েছেন—আমি চেষ্টা করব সেই আলো জ্বেলে রাখার, চেষ্টা করব সেই আস্থা অটুট রাখার। এ আমার প্রাণের নিবেদন ছিল। এখনো আমি বলতে চাই, কারো সঙ্গে প্রতিযোগিতা বা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নয়, বরং নিজের কাজের প্রতি গভীর ভালোবাসায় আর একবার আমি নিজেকে উৎসর্গ করলাম। আধিপত্য ও অধীনতার মানসিক যাতনাকে ছিন্ন করার নতুন সাহস পেলাম পাক্ষিক অনন্যার কাছে। এ আনন্দ অতুলনীয়।

‘অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার’ পেলেন রঞ্জনা বিশ্বাস
আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলা সাহিত্য চর্চা
হেনরিক ইবসেন: স্রোতের বিপরীতে চলা দুঃসাহসী নাট্যকার