বৈষম্যের শিকার শরণার্থীরা!

আপডেট : ২৮ মার্চ ২০২২, ০১:৩৪

সিরিয়ার শরণার্থী আহমাদ আল হারিরি বছর দশেক আগে দেশ ছাড়েন। দেশটিতে গৃহযুদ্ধ শুরুর প্রায় প্রথম দিকে তিনি নিরাপদ জীবনের সন্ধানে বিদেশে পাড়ি জমান। সিরিয়া থেকে ইউরোপে যেতে পারলেও নিরাপদ একটি আশ্রয় এখনো তার কাছে অধরাই থেকে গেছে। লাখ লাখ শরণার্থীর মতো তিন সন্তানের পিতা হারিরিও বিষয়টি স্বাভাবিকভবেই মেনে নিয়েছিলেন। ইউক্রেনে রুশ হামলা শুরুর পর বিষয়টি নিয়ে তিনি নতুনভাবে ভাবতে শুরু করেছেন।

‘আমরা দিনের পর দিন ঘুরে বেড়িয়েছি, এখনো আছি একটি তাঁবুর মধ্যে। শীতে বরফ থেকে আত্মরক্ষার কোনো ব্যবস্হা নাই, বৈরী আবহাওয়ায় অনেক শরণার্থী মারা গেছে, তাদের দেখার কেউ নাই। অথচ ইউক্রেনের শারণার্থীদের সবাই সাদরে গ্রহণ করছে’ ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী সিডন শহরের এক শরণার্থী শিবির থেকে রয়টার্সকে হারিরি একথা বলেন।

ওই শিবিরে ২৫টি শরণার্থী পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। সিরিয়ায় আসাদ পরিবারের পাঁচ দশকের শাসন অবসানের লক্ষ্যে চলা গৃহযুদ্ধে এ পর্যন্ত ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ বাস্ত্তচু্যত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি বাস্ত্তচু্যত লোকের ঢল নেমেছিল ২০১৫ সালে। ঐ বছর ইউরোপে প্রায় ১০ লাখ শরণার্থীর আশ্রয় নেয়। তবে ঐ শরণার্থীদের যাত্রাপথ মোটেই মসৃণ ছিল না। ইউরোপে ঢুকতে তাদের পদে পদে বাধার সম্মুখীন হতে হয়। সেই অবস্হার সঙ্গে ইউক্রেন শরণার্থীদের অবস্হা একেবারের বিপরীত। সিরীয় ও অন্যান্য আরব শরণার্থীরা একে মিলিয়ে দেখছে নিজেদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে।

ইউক্রেনে রাশিয়া যুদ্ধ শুরু করার পর মার্চের চতুর্থ সপ্তাহ পর্যন্ত আইএমওর হিসাব অনুযায়ী সাড়ে ৬ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছাড়া হয়েছে। ইইউ আশঙ্কা করছে আরো লাখ লাখ দেশান্তরি হবে। তাদের জন্য দরজা খুলে দেওয়াসহ, সাময়িক রেসিডেন্স ও কর্ম সংস্হানের জন্য ইইউ কাজ শুরু করেছে। দৃশ্যটি সিরীয় শরণার্থীদের সঙ্গে তাদের ব্যবহারের পুরোটা না হলেও অনেকটাই বিপরীত।

২০২১ সালে সিরীয় গৃহযুদ্ধের ১০ বছরের মাথায় দেখা যায় যে, ১০ লাখ সিরীয় শরণার্থীকে ইইউ দেশগুলো গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে জার্মানিতেই অর্ধেকের বেশি শরণার্থীর ঠায় হয়। বেশির ভাগ আসে ২০১৫-১৬ সালে। ১৬ সালে শরণার্থী আটকাতে তুরস্কের সঙ্গে ইইউর একটি চুক্তি হয়। তুরস্কে প্রায় ৪ লাখ সিরীয়কে আশ্রয় দিয়েছে।

বর্তমান পরিস্হিতি সম্পর্কে বুলগেরিয়ার প্রধানমন্ত্রী কিরিল পেটকভ বলেছেন, ‘আজ আমরা এমন শরণার্থীদের মুখোমুখি হচ্ছি যা আগে কখনো হয়নি। এরা বুদ্ধিমান, শিক্ষিত ও উচ্চ দক্ষতা সম্পন্ন। এরা ইউরোপীয়, এদের বিমানবন্দরে বোমা বর্ষণ করা হচ্ছে, এদের জীবন হুমকির মুখে।’

তিনি বলেন, ইউক্রেন ছেড়ে আসা যে কাউকে বুলগেরিয়া আশ্রয় দেবে। উল্লেখ্য, ইউক্রেনে প্রায় আড়াই লাখ জাতিগত বুলগেরীয় আছে। গত বছর ৩ হাজার ৮০০ সিরীয় বুলগেরিয়ায় আশ্রয় চেয়েছিল। এদের মধ্যে অর্ধেককে শরণার্থী অথবা মানবিক বিবেচনায় আশ্রয় দেওয়া হয়।

সিরীয়রা জানিয়েছে, তাদের বেশির ভাগকে শুধু ইউরোপের অন্যকোনো দেশে যাওয়ার শর্তে বুলগেরিয়া অতিক্রমের অনুমতি দেওয়া হয়।

পোল্যান্ড সরকার গত বছর মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা থেকে আসা একদল শরণার্থীকে সেদেশে ঢুকতে না দিয়ে সমালোচনার মুখে পড়ে। বেলারুশ সীমা অতিক্রম করে তারা পোল্যান্ডে গিয়েছিল। এবার ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর বেলারুশ পার হয়ে আসা ইউক্রেনীয় শরণার্থীদের পোল্যান্ড অভ্যর্থনা জানিয়েছে। একই রকম দৃশ্য দেখা গেছে হাঙ্গেরিতেও।

তারাও একইভাবে ইউক্রেন থেকে আসা লোকজনকে খুশিমনে গ্রহণ করেছে। হাঙ্গেরির পররাষ্ট্রমন্ত্রী পিটার জিজারতো সম্প্রতি জেনেভায় তার দেশের দ্বিমুখী নীতির কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, ইউক্রেনে প্রচুর জাতিগত হাঙ্গেরিয়ান আছে। তাই তারা তাদের গ্রহণ করেছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ইউক্রেনের মানবিক সংকটকে ইউরোপীয়রা ইরাক, লিবিয়া বা সিরিয়ার থেকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখছে। কারণ তারা ইউক্রেনীয়দের সঙ্গে সহজেই একাত্মতা বোধ করতে পারে। তাদের সমস্যাকে তারা নিজেদের সমস্যা মনে করে। ইউক্রেনীয়দের তারা তুলনামূলক সভ্য, তুলনামূলক ইউরোপীয় বিবেচনা করতে পারে।

প্যারিস ভিত্তিক গবেষণা সংস্হা আরব রিফর্ম ইনিশিয়েটিভের নির্বাহী পরিচালক নাদিম হুরি বলেন, ‘শরণার্থীদের প্রতি বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি যা মিডিয়াতেও প্রচার করা হচ্ছে এটি তাদের দুর্দশার বাস্তবতার প্রতিফলন করে না।’

তিনি মনে করেন, এটি এক রকম ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ড’। তবে এর জন্য যে কেবল ইউরোপীয়রাই দায়ী তাই নয়, কোনো কোনো সিরীয় শরণার্থীর ধারণা, ইউরোপের দেশগুলো তাদের যেভাবে আশ্রয় দিয়েছে অনেক আরব দেশই তাদের সেভাবে গ্রহণ করেনি।

ইত্তেফাক/টিআর