মৌসুমের প্রথম ঢলের ধাক্কায় শনিবার দুপুরে সুনামগঞ্জ জেলার পাটলাই নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে তাহিরপুর উপজেলার নজরখালী বাঁধ ভেঙে য়ায়। এতে টাঙ্গুয়ার হাওরের প্রায় ৩ হাজার একর জমির বোরো ফসল নিমজ্জিত হয়েছে। তাহিরপুর ও ধর্মপাশা উপজেলার চারটি ইউনিয়নের কৃষকদের এই জমি ডুবে যাওয়ায় তারা বাক্হারা। হঠাৎ পানি বাড়তে থাকলে রবিবার থেকে তাহিরপুরের গোলাবাড়ী ও জয়পুর গ্রামের লোকজনের স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ মেরামতের কাজ শুক্রবার পর্যন্ত চলে। তারপরও রক্ষা হয়নি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের সিলেটস্থ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী প্রবীর কুমার গোস্বামী শনিবার সন্ধ্যায় উপদ্রুত এলাকা থেকে ইত্তেফাককে বলেন, যেহেতু টাঙ্গুয়া ‘ইসি’ (পরিবেশ সংকটাপন্ন) ভুক্ত এলাকা তাই সেখানে কোনো প্রকল্প নেওয়া হয়নি।
তিনি জানান, বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার দুদিনে চেরাপুঞ্জিতে ৫৪৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। এতে যাদুকাটাসহ তাহিরপুর ও ধর্মপাশার নদীগুলো অস্বাভাবিক গতিতে ফুলে উঠে ‘হাওর রক্ষা’ বাঁধে চাপ সৃষ্টি করে। তিনি বলেন, সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে যাদুকাটা নদীর বিপৎসীমা ৫ দশমিক ৫ সেন্টিমিটার। কিন্তু হঠাৎ ঢলে হাওর এলাকায় পানি ফুলে বিপজ্জনক মোড় নেয়।
আবহাওয়া বার্তায় বলা হয়েছে, আগামী দুদিন বৃষ্টি হবে না। তবে দুদিন পর আবার বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। বাঁধ ভেঙে যাওয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, একদিক থেকে বলা যায়, তা ভালো হয়েছে। নদীতে অত্যধিক পানি বের হয়ে যাচ্ছে। যেটি অন্য হাওরের জন্য উপকার হবে।
টাঙ্গুয়ার ওয়াচ টাওয়ারের উত্তর পাশের এই বাঁধটি ভেঙে যাওয়ার খবর পেয়ে তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. রায়হান কবীর, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকোশলী জহিরুল ইসলাম সরকার ও তাহিরপুর শাখার কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান সেলিম গতকাল এলাকা পরিদর্শন করে ইত্তেফাককে বলেন, পাহাড়ি ঢল নামলে সেই বাঁধটি ভেঙে যায়। বর্তমান অবস্থায় ঐ বাঁধ বন্ধ করলে হাওরের অন্যান্য বাঁধে চাপ বেড়ে বড় ক্ষতি হতে পারে। ঢলের অত্যধিক পানি সরানোরও বিকল্প ব্যবস্থা নেই। তাই এই পথেই পানি কিছু নামলে অন্যান্য বাঁধ রক্ষা পাবে।
টাঙ্গুয়ার হাওরপাড়ের গোলাবাড়ী গ্রামের খসরুল আলম বলেন, নদীর পানি এভাবে বাড়তে থাকলে যেকোনো সময় সমুদয় হাওর তলিয়ে যেতে পারে। এদিকে, নদীর পানি উপচে যে কোনো সময় লতিবপুর হাওরে পানি ঢুকার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই হাওরে পানি ঢুকতে শুরু করলে প্রায় ২০০ একর জমির ধান হুমকির মুখে পড়বে বলে জানিয়েছেন স্থনীয়রা।
কর্মকর্তা বলেন, লতিবপুর হাওরটিও পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতাভুক্ত নয়। তাই ঐ হাওরে কাজ করা আমাদের সম্ভব হয়নি। তবে কৃষকদের দাবির মুখে সম্প্রতি টাঙ্গুয়ার হাওরের তিনটি বাঁধ মেরামতের জন্য ৮ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
খালিয়াজুরীতে ঢলে বোরোর ব্যাপক ক্ষতি
খালিয়াজুরী (নেত্রকোনা) সংবাদদাতা জানান, নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলা সদরের কয়েকটি হাওরের প্রায় ৫০০ একর জমির বোরো ফসল ঢলের পানিতে তলিয়ে গেছে। এভাবে ঢলের পানি আসলে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এ উপজেলার ২১ হাজার হেক্টর জমির ফসলই তলিয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এদিকে, খালিয়াজুরী উপজেলা কৃষি বিভাগ বলছে, এখানে ইতিমধ্যে ক্ষতি হয়েছে মাত্র ১১৩ হেক্টর জমির ফসল।
৩০ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল সন্ধ্যার মধ্যে এসব জমি তলিয়েছে। খালিয়াজুরী সদর ইউনিয়নের কীর্তনখলা হাওর, চুনাই হাওর, বাদিয়ারচর হাওর, টাকটারের হাওর, মনিজান হাওর, লেবরিয়া হাওর, হেমনগর হাওর, চাকুয়া ইউনিয়নের গঙ্গবদও হাওর, নয়াখাল হাওর, গাজীপুর ইউনিয়নের বাগানী হাওর ও ডাকাতখালী হাওরের অধিকতর নিচু স্থান ও ফসল রক্ষা বাঁধের বাইরে আবাদ করা ঐসব জমির ফসল তলিয়ে গেছে।
খালিয়াজুরী সদরের কৃষক মনির হোসেন জানান, খালিয়াজুরীতে কমপক্ষে ৫০০ একর জমির ফসল তলিয়েছে। এর মধ্যে তার ক্ষতি হয়েছে প্রায় ২০ একর জমির ধান। খালিয়াজুরীর লক্ষ্মীপুর গ্রামের কৃষক আনোয়ার হোসেন, আব্দুর রউফ ও ফুল মিয়া জানান, ঢলের পানিতে তলিয়ে তাদের ১৫ একর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে।
খালিয়াজুরী কৃষি কর্মকর্তা মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ঢলের পানি প্রবাহ অব্যাহত রয়েছে। পানির এমন প্রবাহ থাকলে সপ্তাহখানের মধ্যেই ফসল রক্ষাবাঁধ উপচে খালিয়াজুরী উপজেলার সব বোরো ফসল তলিয়ে যাবে। এ উপজেলায় এবার ২১ হাজার ১২০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে বলে জানান ঐ কর্মকর্তা।
