রাশিয়া এবং ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধের প্রায় ছয় সপ্তাহ পর আমি ভাবতে শুরু করেছি যে, এই সংঘাতটি আমাদের প্রথম সত্যিকারের বৈশ্বিক যুদ্ধ শুধু নয়— প্রথম বিশ্বযুদ্ধ বা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চেয়ে অনেক বেশি। এই যুদ্ধে, এই পৃথিবীর প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে—তা তারা যেখানেই বা যে দেশেই বসবাস করুক না কেন।
এই যুদ্ধের সূত্রপাত হয়েছে— কারা মূলত ইউক্রেনকে নিয়ন্ত্রণ করবে— তার রেষারেষিতে। এটি আজ বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী দুটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে ‘বড় যুদ্ধে’ পরিণত হয়েছে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মুক্ত-বাজার, আইনের শাসন, গণতন্ত্র বনাম কর্তৃত্ববাদী ক্লেপটোক্রেসি (ক্লেপটোক্রেসি হলো এমন একটি সরকার— যার দুর্নীতিবাজ নেতারা রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে জনগণের সম্পদ এবং তাদের শাসন করা ভূমি, সাধারণত বৃহত্তর জনসংখ্যার অর্থের অপব্যবহার করে)।
এই অভিমত ব্যক্ত করেছেন রাশিয়ান অর্থনীতির সুইডিশ বিশেষজ্ঞ অ্যান্ডার্স আসলুন্ড। যদিও এই যুদ্ধ কবে শেষ হবে বোঝা যাচ্ছে না এবং ভ্লাদিমির পুতিন সম্ভবত এখান থেকে বের হয়ে আসার উপায় খুঁজছেন। যদি তিনি তা না খুঁজে পান, তবে এটি গণতান্ত্রিক এবং অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে দ্বন্দ্বের পঙ্কিল অবস্হা তৈরি করবে। এটা মনে রাখতে হবে যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ফ্যাসিবাদের অবসান ঘটিয়েছিল এবং স্নায়ুযুদ্ধ গোঁড়া কমিউনিজমের অবসান ঘটিয়েছিল, এমনকি চীনেও অবশেষে। সুতরাং, কিওভ, মারিউপোল এবং ডোনবাস অঞ্চলের রাস্তায় যা ঘটছে তা ভবিষ্যতের রাজনৈতিক ব্যবস্হাকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
প্রকৃতপক্ষে, অতীতের বিশ্বযুদ্ধের সময় বিশ্বের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ ঔপনিবেশিক পরিবেশে ছিল এবং তাদের কাছে প্রযুক্তি থাকলেও স্বাধীন মতামত প্রকাশের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা ছিল না। যারা যুদ্ধ অঞ্চলের বাইরে বসবাস করছিলেন তাদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন অত্যন্ত দরিদ্র কৃষক— যারা প্রথম দুটি বিশ্বযুদ্ধের দ্বারা এতটা ক্ষতিগ্রস্ত হননি।
এখন, স্মার্টফোনসহ যে কেউ ইউক্রেনে কী ঘটছে তা দেখতে পারে— লাইভ এবং রঙিন— এবং সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী তা ছড়িয়ে দিতে পারে। আমাদের ঔপনিবেশিক-উত্তর বিশ্বে কার্যত প্রতিটি দেশের সরকারগুলি ইউক্রেনের এক বা অন্য পক্ষের নিন্দা বা অজুহাত দেওয়ার জন্য জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মাধ্যমে ভোট দিতে পারে।
এই পৃথিবীর ৩ বিলিয়ন থেকে ৪ বিলিয়ন লোকের মধ্যে প্রায় অর্ধেকের হাতে আজ একটি স্মার্টফোন রয়েছে, এবং যদিও ইন্টারনেট সেন্সরশিপ একটি বাস্তব সমস্যা, কোনো কোনো দেশে, তার পরও একটি স্মার্টফোন এবং একটি ক্রেডিট কার্ডসহ যে কেউ ইউক্রেনের অপরিচিত ব্যক্তিদের এয়ারবিনবির মাধ্যমে তাদের বাড়িতে একটি রাত থাকার ব্যবস্হা করতে পারেন। রাশিয়ান অলিগার্চ এবং তাদের ইয়টগুলিকে ট্র্যাক করতে যে কোনো জায়গায় অল্প বয়সি ছেলেমেয়েরা টুইটারে অ্যাপ তৈরি করতে পারে। এবং এনক্রিপ্ট করা তাত্ক্ষণিক বার্তাপ্রেরণ অ্যাপ টেলিগ্রাম দ্বারা ছড়িয়ে দিতে পারে।
ইতিমধ্যে, ইউক্রেনের সরকার তহবিলের একটি সম্পূর্ণ নতুন উত্স থেকে অর্থসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পেরেছে— অনুদানের জন্য সোশ্যাল মিডিয়াতে আবেদন করার পরে বিশ্ব জুড়ে ব্যক্তিদের কাছ থেকে ৭০ মিলিয়ন ডলারেও বেশি মূল্যের ক্রিপটোকারেন্সি সংগ্রহ করেছে। এবং টেসলা ধনকুবের এলন মাস্ক ইউক্রেনে তার স্পেসএক্স কোম্পানির স্যাটেলাইট ব্রডব্যান্ড পরিষেবা সক্রিয় করেছেন উচ্চগতির ইন্টারনেট সরবরাহ করার জন্য।
বাণিজ্যিক ইউএস-ভিত্তিক স্যাটেলাইট কোম্পানিগুলি, যেমন ম্যাক্সার টেকনোলজিস, যে কাউকে মহাকাশ থেকে দেখতে সক্ষম করেছে মারিউপোলের একটি সুপার মার্কেটের বাইরে খাবারের জন্য সারিবদ্ধ শতশত বিষণ্ন মানুষের ছবি— যদিও রাশিয়ানরা শহরটিকে ঘিরে রেখেছে এবং যে কোনো সাংবাদিকের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে। তারপরে সাইবার যোদ্ধারা যে কোনো জায়গা থেকে লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে এবং পড়ছেও। সিএনবিসি রিপোর্ট করেছে— “অ্যানোনিমাস’ নামে একটি জনপ্রিয় টুইটার অ্যাকাউন্ট ঘোষণা করেছে যে নেপথ্য অ্যাক্টিভিস্ট গ্রুপ রাশিয়ার বিরুদ্ধে ‘সাইবার যুদ্ধ’ চালাচ্ছে।” অ্যাকাউন্ট ৭.৯ মিলিয়নেরও বেশি বিশ্বব্যাপী অনুসারী রয়েছে— রাশিয়ার পুরো সেনাবাহিনীর প্রায় আট গুণ বেশি (যার মধ্যে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের পর থেকে প্রায় ৫ লক্ষ নতুন বেনামি অনুসারী রয়েছে)।
প্রথম বা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এই ধরনের বেসরকারি, অতি-ক্ষমতাপ্রাপ্ত, বৈশ্বিক খেলোয়াড় এবং প্ল্যাটফর্ম উপস্থিত ছিল না। রাশিয়া এবং ইউক্রেন হলো কৃষি সরবরাহ চেইনে গম এবং সারের প্রধান সরবরাহকারী—যা এখন বিশ্বকে খাওয়ায় এবং এই যুদ্ধে তা ব্যাহত হচ্ছে। ইউরোপের মাত্র দুটি দেশের মধ্যে যুদ্ধ মিশরীয়, ব্রাজিলিয়ান, ভারতীয় এবং আফ্রিকানদের জন্য খাবারের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এবং যেহেতু রাশিয়া প্রাকৃতিক গ্যাস, অপরিশোধিত তেল এবং কৃষকদের দ্বারা তাদের ট্রাক্টরে ব্যবহৃত ডিজেল জ্বালানির বিশ্বের বৃহত্তম রপ্তানিকারকদের মধ্যে একটি, রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর নিষেধাজ্ঞাগুলি এর রপ্তানিকে কমিয়ে দিচ্ছে, যার ফলে মিনিয়াপোলিস থেকে মেক্সিকো থেকে মুম্বাই পর্যন্ত পেট্রোলের দাম বেড়েছে। এবং সুদূর আর্জেন্টিনার কৃষকরাও তাদের ডিজেল-চালিত ট্রাক্টর ব্যবহার বা জীবাশ্ম-জ্বালানি-সমৃদ্ধ সার ব্যবহার কমাতে বাধ্য হয়েছে। এটি আর্জেন্টিনার কৃষি রপ্তানিকে বিপন্ন করছে এবং বিশ্বে খাদ্যের মূল্য বৃদ্ধিতে বোঝার ওপর শাকের আঁটি যোগ করছে।
এই যুদ্ধে আরো একটি অপ্রত্যাশিত আর্থিক বিশ্বায়নের বিষয় রয়েছে—পুতিন রাশিয়ার সমস্ত জ্বালানি এবং খনিজ রপ্তানি থেকে অর্জিত সোনা, বিদেশি সরকারি বন্ড এবং বৈদেশিক মুদ্রা ৬০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি সঞ্চয় করেছেন। কিন্তু পুতিন স্পষ্টতই ভুলে গিয়েছিলেন যে তার সরকার এটির বেশির ভাগই পশ্চিমা দেশ এবং চীনের ব্যাংকগুলিতে জমা করেছিল। আটলান্টিক কাউন্সিল জিওইকোনমি সেন্টারের মতে, রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার সম্পদ শতকরা হিসাবে মজুত করা শীর্ষ ছয়টি দেশ হলো : চীন, ১৭.৭ শতাংশ; ফ্রান্স, ১৫.৬ শতাংশ; জাপান, ১২.৮ শতাংশ; জার্মানি, ১২.২ শতাংশ; মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ৮.৫ শতাংশ; এবং ব্রিটেন, ৫.৮ শতাংশ। এছাড়াও, ব্যাংক অফ ইন্টারন্যাশনাল সেটেলমেন্ট এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের রয়েছে ৬.৪ শতাংশ।
আটলান্টিক কাউন্সিলের ট্রাকারের তথ্যানুযায়ী, চীন ব্যতীত এই দেশগুলির প্রত্যেকটি এখন রাশিয়ান রিজার্ভগুলিকে ফ্রিজ করেছে— তাই প্রায় ৩৩০ বিলিয়ন ডলার পুতিনের কাছে অ্যাক্সেসযোগ্য নয়। তবে রাশিয়ান রাষ্ট্র তার বিধ্বস্ত অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্য কেবল সেই মজুতগুলিকে ব্যবহার করতে পারবে না, রাশিয়ান সেনাবাহিনী দ্বারা ধ্বংস করা ইউক্রেনের বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং, রাস্তা এবং সরকারি কাঠামো পুনর্নির্মাণের জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য এই অর্থ ব্যবহার করার জন্য একটি বিশাল বৈশ্বিক চাপ দেওয়া হবে। এজন্য পুতিনের কাছে বার্তা আছে :‘আমাদের সঙ্গে ব্যাংকিংয়ের জন্য ধন্যবাদ। ক্ষতিপূরণের জন্য আপনার সঞ্চয় বাজেয়াপ্ত করা আইনত কঠিন হবে, তবে আপনি আপনার আইনজীবীদের প্রস্তুত করা ভালো।’
এই সমস্ত কারণে, সারা বিশ্বের সেই সমস্ত নেতারা যারা পুতিন-অনুপ্রাণিত কর্তৃত্ববাদী পুঁজিবাদ বা ক্লেপটোক্রেসির কোনো সংস্করণ বা অন্য কোনো সংস্করণের দিকে এগিয়ে গেছে—তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। আমরা তুরস্ক, মিয়ানমার, চীন, উত্তর কোরিয়া, পেরু, ব্রাজিল, ফিলিপাইন, হাঙ্গেরি এবং বেশ কয়েকটি আরব রাষ্ট্রের কথা বলছি। পুতিন অবশ্যই আশা করেছিলেন যে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ আমেরিকাকে এই ধরনের শক্তিশালী ক্লেপটোক্রেসির একটি সংস্করণ করবে এবং পুরো বিশ্বব্যাপী ভারসাম্যকে তার পথে নিয়ে যাবে।
কিন্তু তারপর এলো এই যুদ্ধ। কিয়েভ যদিও বলছে, ন্যাটোতে যোগদান করা নয় বরং ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদান করা ছিল তাদের আকাঙ্ক্ষা এবং এটি ঠিক করার জন্য নিজেকে তৈরি করার প্রক্রিয়ায় ছিল তারা। এটাই আসলে এই যুদ্ধের সূত্রপাত করেছে। পুতিন কখনই স্লাভিক ইউক্রেনকে ইইউতে একটি সফল মুক্ত-বাজার গণতন্ত্র হতে দেবেন না। এবং সে কারণেই তিনি ইউক্রেনকে মুছে ফেলার চেষ্টা করছেন।
কিন্তু দেখা যাচ্ছে, পুতিন কোন পৃথিবীতে বাস করছেন— তার কোনো ধারণাই ছিল না। তার নিজের সিস্টেমের দুর্বলতা সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না।
লেখক: পুলিত্জার জয়ী আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক
