গাড়ি দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিকৃবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মতিয়ার রহমান হাওলাদার ও ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই বিষয়ে উপাচার্য ও সংশ্লিষ্ট দুই শিক্ষক পরস্পরের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
জানা গেছে, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মো. বদরুল ইসলাম শোয়েব ময়মনসিংহ যাওয়ার জন্য ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা দফতরের একটি গাড়ি বরাদ্দ চেয়ে পরিবহন শাখার পরিচালক অধ্যাপক ড. সুমন পাল বরাবর চিঠি দেন। নিয়ম অনুযায়ী ৫০ কিলোমিটার দূরত্বের বেশি গাড়ি যেতে হলে উপাচার্যের অনুমতি প্রয়োজন হয়। ঘটনার দিন উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান না করায় লিখিত অনুমতি না পেয়ে পিএস টু ভিসির মাধ্যমে মৌখিক অনুমতিতে ওই গাড়ি নিয়ে রেজিস্ট্রার ময়মনসিংহে যান। কিন্তু শুক্রবার (১ এপ্রিল) ফেরার পথে দুর্ঘটনার শিকার হয় গাড়িটি। এতে রেজিস্ট্রার ও চালক সুস্থ থাকলেও গাড়ির ক্ষতি হয়। বিষয়টি নিয়ে পরবর্তী সময়ে রবিবার (৩ মার্চ) রাতে অধ্যাপক ড. মো. মোস্তফা সামছুজ্জামান ও অধ্যাপক ড. সুমন পালের সঙ্গে ফোনালাপের সময় উপাচার্য উত্তেজিত হয়ে পড়েন। পরে বিষয়টি নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
অধ্যাপক ড. মো. মোস্তফা সামছুজ্জামান বলেন, গাড়ি দুর্ঘটনার বিষয়ে জানতে চেয়ে উপাচার্য আমাকে গালি দিয়েছেন। তিনি আমাকে বলেছেন, ‘তোর বাবার গাড়ি নাকি? তুই কেন গাড়ি রেজিস্ট্রারকে দিয়েছিস? ১০ মিনিটের মধ্যে গাড়ি বাংলোতে নিয়ে আসবি। তুই গাড়ি গ্যারেজে পাঠিয়েছিস কেন!’ এটা কি ধরনের ব্যবহার হতে পারে? আমি অযোগ্য হয়ে থাকলে তিনিও অযোগ্য। তিনিই জেনে বুঝে এই পদে আমাকে নিয়োগ দিয়েছেন। আমি বিষয়টিতে খুবই মর্মাহত। আমাদের যদি কোনো পদ্ধতিগত ভুল হয়ে থাকে, তিনি সেটা ডেকে বলতে পারতেন বা চিঠি দিতে পারতেন। তিনি তা না করে গালি দিয়েছেন।’
অন্যদিকে অধ্যাপক ড. সুমন পাল বলেন, ‘উপাচার্য আমাদের যে ভাষায় গালি দিয়েছেন, তা গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা গণতান্ত্রিক শিক্ষক পরিষদ ও শিক্ষক সমিতিকে জানিয়েছি।’
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মতিয়ার রহমান হাওলাদারের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘আমি তাদের সঙ্গে কোনো খারাপ ব্যবহার করিনি। তবে তাদের সঙ্গে একটু রাগ করেছি। গাড়ি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। এই ব্যাপারটা তারা আমার কাছে গোপন করেছেন। প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাকে জানানো উচিত ছিল। তারা কেউ আমাকে গাড়ি দুর্ঘটনার কথা জানাননি। ৩ দিন পর আমি অন্য একজনের কাছ থেকে এ বিষয়ে শুনেছি। সেই গাড়ি সরানোর জন্য ওয়ার্কশপে দেওয়া হয়েছে আমাকে না জানিয়ে। গাড়ি রেজিস্ট্রার নিয়ে গিয়েছেন রিকুইজিশন করে সে বিষয়ে আমার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু গাড়ি দুর্ঘটনার পরও আমাকে কেন জানানো হয়নি, সে ব্যাপার নিয়ে আমার আপত্তি। নিয়মানুযায়ী দুর্ঘটনার কথা জানাতে হবে। সেই গাড়ি কোথায়, কিভাবে মেরামত করা হবে, তার জন্যও উপাচার্যের অনুমতি লাগবে। আমি অন্যলোকের কাছে জানতে পেরে, যখন তাদের ফোন করেছি তখনো তারা ‘কাঁচুমাচু’ করেছেন।’’
উপাচার্য আরও বলেন, ‘প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে মহামান্য রাষ্ট্রপতি আমাকে দায়িত্ব দিয়েছেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের দেখভাল করার জন্য। সরকারি সম্পত্তি দেখার দায়িত্বও আমার ওপর দেওয়া হয়েছে। এত দামি গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়েছে সেটা আমাকে জানাবেও না। আবার তাদের কিছু বলাও যাবে না; এটা হতে পারে না।’ তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সঙ্গত কারণে গ্যারেজে গাড়ি না পেয়ে গাড়ি দেখার জন্য লোক পাঠাতে বলি তাদের। এ বিষয় নিয়ে আন্দোলনের কিছু নেই।’
গাড়ি দুর্ঘটনার কথা উপাচার্যকে জানিয়েছেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে পরিবহন শাখার পরিচালক অধ্যাপক ড. সুমন পাল বলেন, ‘দুর্ঘটনার বিষয়ে তাকে জানানো হয়নি। আমি যখন জেনেছি, গাড়ি দুর্ঘটনা ঘটেছে, গাড়ি গ্যারেজে নেওয়ার কথা বলেছি। আমি গিয়ে দেখেছি, তেমন বড় কোনো ক্ষতি হয়নি। সেক্ষেত্রে আমি ভেবেছি, যখন প্রয়োজন হবে, তখন জানাবো উপাচার্যকে।’
এদিকে, বিষয়টিকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার (৫ এপ্রিল) সকাল ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভবন সংলগ্ন রাস্তায় গণতান্ত্রিক শিক্ষক পরিষদের (গশিপ) ব্যানারে মানববন্ধন করেন শিক্ষকরা। মানববন্ধন শেষে পরবর্তী কর্মসূচি নির্ধারণের জন্য জরুরি সভায় অংশ নেন তারা।
গণতান্ত্রিক শিক্ষক পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসাইন বলেন, ‘অধ্যাপক ড. মো. মোস্তফা সামছুজ্জামান ও অধ্যাপক ড. সুমন পালকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ি সংক্রান্ত একটি বিষয়ে উত্তেজিত হয়ে অশালীন ব্যবহার করেছেন উপাচার্য। এতে আমরা শিক্ষকরা লজ্জিত ও বিব্রতবোধ করছি। এ ঘটনার প্রতিবাদে মানববন্ধন করছি।’
গণতান্ত্রিক শিক্ষক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মো. মোশাররফ হোসাইন সরকার বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই জন শিক্ষকের সঙ্গে উপাচার্য যে আচরণ করেছেন, সেটা মোটেও শোভনীয় নয়। দুই শিক্ষককে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে ফোন কেটে দিয়েছেন। এ বিষয়ে ৪ মার্চ উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু দেখা করা সম্ভব হয়নি। গণতান্ত্রিক শিক্ষক পরিষদের সভায় অনেকে উপাচার্যের পদত্যাগ দাবি করেছেন। অনেকে উপাচার্যকে এ বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করারও পরামর্শ দিয়েছেন। তবে আমরা উপাচার্যের এমন আচরণের প্রতিবাদে মানববন্ধন করছি। আর যে দুইজন শিক্ষকের সঙ্গে খারাপ আচরণ করা হয়েছে, তারা জানিয়েছেন উপাচার্যের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী নেই তাদের। আমরা এখন বিষয়টির সুন্দর সমাধান চাই।’
ড. মোশাররফ হোসাইন সরকার আরও জানান, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক পদগুলো থেকে শিক্ষকরা পদত্যাগ করার সিদ্ধান্তও নিয়েছেন। এখনো রেজিস্ট্রার বরাবর জমা না দিলেও ইতোমধ্যে অনেক শিক্ষক পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করেছেন।’

সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত অজয়ের পরিবারকে পাঁচ লাখ টাকা দিলো নোবিপ্রবি
হাবিপ্রবিতে নেপালি শিক্ষার্থীর গায়ে হলুদ