ক্রিকেট মাঠে ইমরান খান ছিলেন একজন উদ্দীপ্ত ক্যাপ্টেন এবং নেতা। যিনি তার অসাধারণ দক্ষতা দিয়ে প্রতিভাধর খেলোয়ারদের একত্রিত করেছিলেন। ১৯৯২ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে পরাজিত করার জন্য বড় প্রতিকূলতা অতিক্রম করেছিলেন তিনি। এসব যোগ্যতার ওপর ভর করে ২০১৮ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রী হন। সেসময় তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আকাঙ্ক্ষিত কর্মী, কট্টর ইসলামপম্হী ও দেশের প্রভাবশালী সামরিক বাহিনীকে একত্রিত করেছিলেন তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে সরিয়ে দিতে।
ক্ষমতায় আসার পর ইমরান খান বিরোধীদের সঙ্গে আপোষের ব্যাপারে বলা চলে অনমনীয় ও অনাগ্রহী ছিলেন। কিন্তু প্রায় চার বছর পর সেই বিরোধীরা তাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চলেছে। যদিও ইমরান খান কোনো প্রমাণ ছাড়াই অভিযোগ তুলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের ষড়যন্ত্রে তাকে উৎখাত করছে বিরোধীরা।
নিজের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সেনাবাহিনীর আপত্তির মুখেই বলা চলে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে আলিঙ্গন করেছিলেন। ঠিক সেসময় যখন প্রতিবেশী দেশ ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরু করেছে রাশিয়া। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি সাংবাদিকদের ইমরান খান বলেছিলেন, আমি এমন সময় এসেছি যখন পরিস্থিতি অনেক বেশি উত্তেজনাকর!
রেডিও পাকিস্তানের সাবেক মহাপরিচালক ও বর্ষীয়ান রাজনৈতিক ভাষ্যকর মুর্তজা সোলাঙ্গি’র মতে, বাইডেন ক্ষমতায় আসার তেমন একটা পাত্তা পাননি ইমরান খানকে। বাইডেনের অবজ্ঞায় এক প্রকার ক্ষুব্ধ হয়ে এই সংকটকে একটি সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন ইমরান খান। অথচ ১৯৯৯ সালে ইসলামাবাদের জাতিসংঘ কার্যালয়ে ইমরান খান চিঠি দিয়ে চেচেনদের ওপর রুশ হামলা ও সহিংসতার নিন্দা জানিয়েছিলেন। তার কর্মীরা রাশিয়া মুর্দাবাদ বলে শ্লোগান দিয়েছিল।
ইমরান খান এমন একজন মানুষ যিনি ওসামা বিন লাদেনকে খুনি বলেছেন আবার উইঘুর মুসলিমদের ওপর বেইজিং’য়ের আচরণের প্রশংসা করেছেন। বিভিন্ন সময় তাকে প্রয়োজন অনুযায়ী অবস্থান নিতে দেখা গেছে। কিন্তু পুতিনকে আলিঙ্গন করে, ক্রিকেট থেকে রাজনীতিবিদ হওয়া ইমরান খান চূড়ান্তভাবে নিজের ভাগ্যকে ফাঁদে ফেলেছেন। বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক টাইম ম্যাগাজিনের এক নিবন্ধে এ কথা বলা হয়েছে।
মস্কো সফর শেষ করে ফেরার পরপরই ইমরান খান তার রাজনৈতিক জীবনের লড়াইয়ের মুখে পড়েন। যখন তার দলেরই কয়েকজন আইনপ্রণেতা পক্ষ ত্যাগের ঘোষণা দেন। বিরোধীরা তার বিরুদ্ধে জাতীয় পরিষদে অনাস্থা প্রস্তাব পেশ করে। তার দল কোনো রকমে অনাস্থা ভোট আটকে দিয়েছিল। জাতীয় পরিষদ ভেঙ্গে আগাম নির্বাচনের ঘোষণাও এসেছিল। কিন্তু বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট এক রায়ে বলেছে, অনাস্থা প্রস্তাবটি খারিজ করে জাতীয় পরিষদের ডেপুটি স্পিকার কাসিম সুরি সাংবিধান বিরুদ্ধ কাজ করেছেন। আদালত জাতীয় পরিষদ ও সরকার পুনর্বহাল করেছে। আগামীকাল শনিবার পার্লামেন্টে ইমরান খানের বিরুদ্ধে অনাস্থা ভোট আয়োজনের নির্দেশ দিয়েছে আদালত। অনাস্থা ভোটে বলা চলে- নিশ্চিতভাবে পরাজিত হচ্ছেন ইমরান খান। তিনি পরাজিত হলে বিরোধী আইনপ্রণেতাদের সমর্থনে নতুন কেউ প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হতে পারেন। নতুন প্রধানমন্ত্রী ২০২৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকতে পারবেন।
ইমরান খান যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ করে গেলেও দেশটির ক্ষমতাশালী সেনাবাহিনী ওয়াশিংটনের সঙ্গে সুসম্পর্ক ধরে রাখতে অনেক বেশি আগ্রহী। যখন ইমরান খান রুশ আগ্রাসনের নিন্দা জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, তখন সেনা প্রধান কামার জাভেদ বাজওয়া বলেছেন, ইউক্রেনে রুশ নৃশংসতা ক্ষমা করা যায় না।
ইমরান খানের সঙ্গে সামরিক বাহিনীর সম্পর্ক ক্রমশই খারাপ হয়েছে। গত বছর ইমরান খান সেনা প্রধানের পছন্দ মতো সামরিক নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার নতুন প্রধানের নিয়োগপত্রে সই করতে অস্বীকৃতি জানান। তখন থেকেই বিরোধীরা ইমরানের দুর্বলতা আঁচ করতে পারে। যার ফলশ্রুতিতেই ইমরানের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব।
পাকিস্তানের ইতিহাসে কোনো প্রধানমন্ত্রী তার মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। তাই ইমরান তার মেয়াদে ব্যর্থ হয়েছেন সেটা বলা অনুচিত হবে। তবে এটি নিশ্চিত যে, চার বছর আগে যেভাবে ইমরান খান ক্ষমতায় এসেছিলেন আগামীতে নির্বাচনে সেভাবে জিতে আসা তার জন্য কঠিন। গত নির্বাচনে তার প্রতি সেনাবাহিনীর পূর্ণ সমর্থন ছিলো। ইমরান খান ওই নির্বাচনকে স্বচ্ছ ও অবাধ দাবি করলেও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ এনে বিরোধীদলগুলো ফল বর্জন করেছিলো।
উড্রো উইলসন সেন্টারের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক জ্যেষ্ঠ সহযোগী মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, উন্নয়নশীল বিশ্বের নেতা হিসেবে নিজের অবস্থান তুলে ধরতে অনেকটাই সফল হয়েছিলেন ইমরান খান। ভারত যখন পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করেছে, তখন ইমরান খান বিশ্বের সঙ্গে পাকিস্তানকে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। তবে, পুতিনের সঙ্গে সখ্যতা বাড়ানোর ব্যাপারে ইমরানের উপলব্ধি ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
কুগেলম্যানের মতে, সামরিক সমর্থন ছাড়াই নির্বাচনে জয়লাভ করা ইমরান খানের জন্য ১৯৯২ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপ জয়ের চেয়েও বড় কীর্তি হবে। ইমরান খান ধারাবাহিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছেন। ইতিমধ্যে কর্মীদের রাস্তায় নামাতে সক্ষম হয়েছেন। পাকিস্তানে, (যুক্তরাষ্ট্র-বিরোধী) মনোভাব খুব ভাল কাজ করে। বিশেষ করে তরুণ রক্ষণশীল, মধ্যবিত্ত ভোটারদের মধ্যে এর প্রভাব রয়েছে। এবং আমি নিশ্চিত যে, তিনি সেই চেষ্টা চালিয়ে যাবেন।
