ক্রিকেট মাঠে বরাবর নায়োকিচত ছিলেন ইমরান খান। অনেকে ভেবেছিলেন, রাজনীতিতেও তিনি নায়কের মতো আসবেন, দেখবেন এবং জয় করবেন। পাকিস্তানের রাজনীতির বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ২২ গজের সফল অধিনায়ক নিজেও বুঝতে পারেননি রাজনীতির মঞ্চের খেলাটা অন্য রকম। সেটা বুঝতে বুঝতেই প্রায় দেড় দশক কাটিয়ে ফেলেন ইমরান খান। ধাক্কা খেতে হয়েছে বারবার। ষড়যন্ত্র, সন্ত্রাস, মৌলবাদসহ নানা রোগে ভরা রাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে যে মেপে মেপে পা ফেলা উচিত, সেটাই নাকি মানতে চাননি এই ক্রিকেট তারকা। তিনি সবসময় দেশে দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের কথা বলেছেন।
গণতান্ত্রিক সরকারে সেনাবাহিনী, আইএসআইর প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। অনেকের সমর্থন পেলেও সেটা মোট জনসংখ্যার চেয়ে অনেক কম যার জন্য ইমরান খানকে বারবার হোঁচট খেতে হয়েছে। ১৯৯২ সালে ক্রিকেট বিশ্বকাপ জয় করে ক্রিকেট দলের ক্যাপ্টেন হিসেবে রেকর্ড করেছেন। ঠিক তেমনি দেশে সরকারের ক্যাপ্টেন হওয়ার পরও তিনি রেকর্ড গড়েছেন। ইমরানই প্রথম প্রধানমন্ত্রী যিনি দেশটিতে নানা নাটকীয়তার পর বিরোধীদের অনাস্হা ভোটেই হেরে বিদায় নিতে বাধ্য হলেন।
কেউ ১৩ তো কেউ ৫৭ দিন
সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ পাঁচ বছর। কাগজের বইয়ে এমন আইন থাকলেও ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর থেকে কোনো প্রধানমন্ত্রীই পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। ইমরান খানও পারলেন না। অক্ষুণ্ন থাকল ইতিহাসের ধারা। পাকিস্তান মুসলিম লিগের নেতাদের দুর্নীতির উদাহরণ টেনে এবং দেশের জনগণকে ‘নতুন পাকিস্তান’ গড়ার স্বপ্ন দেখিয়ে ২০১৮ সালের ২৫ জুলাইয়ের নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় আসে ইমরান নেতৃত্বাধীন তেহরিক-ই-ইনসাফ। ২২তম প্রধানমন্ত্রী হন ইমরান। ১৮ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। চার বছর পূর্ণ হওয়ার অনেকটা আগেই বিদায় নিলেন।
১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট অর্থাত্ পাকিস্তানের স্বাধীনতার দিন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার নেন লিয়াকত আলী খান। ১৯৫১ সালের ১৬ অক্টোবর এক জনসভায় বক্তৃতা দেওয়ার সময় আততায়ীর গুলিতে প্রাণ হারান তিনি। মোট চার বছর ৬৩ দিন তিনি ক্ষমতায় ছিলেন। এরপর পাকিস্তানের মসনদে বসেন খাজা নাজিমুদ্দিন। তিনি ১৯৫১ সালের ১৭ অক্টোবর থেকে ১৯৫৩ সালের ১৭ আগস্ট পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর পদে বহাল ছিলেন। তার সময়ে বাংলা ভাষা আন্দোলন নিয়ে লাহোর ও পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমানে বাংলাদেশ) একাধিক সহিংস ঘটনা ঘটে। পরিস্হিতি সামলাতে ব্যর্থ হওয়ায় গর্ভনর জেনারেল মালিক গোলাম নিজের বিশেষ ক্ষমতা ব্যবহার করে নাজিমুদ্দিনকে ক্ষমতাচু্যত করেন। নাজিমুদ্দিন এক বছর ১৮২ দিন ক্ষমতায় ছিলেন।
১৯৫৩ সালের ১৭ এপ্রিল থেকে মোট দুবছর ১১৭ দিন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শাসন করেন মোহাম্মদ আলী বোগরা। আঞ্চলিক বৈষম্য নিয়ে তত্কালীন গভর্নর-জেনারেল ইসকান্দার মির্জার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বোগরার সমস্যা শুরু হলে বোগরাকে একপ্রকার পদত্যাগে বাধ্য করেন ইসকান্দার। চতুর্থ প্রধানমন্ত্রী চৌধুরী মোহাম্মদ আলী ১৯৫৫ সাল থেকে শুরু করে এক বছরের কিছু বেশি সময় পরই দলবিরোধী কাজকর্মের জন্য প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে অপসারিত হন। পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। তিনি ১৯৫৬ থেকে শুরু করে এক বছর ৩৫ দিন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে গভর্নর জেনারেল ইসকান্দার মির্জার অনৈতিক চাপের মুখে ‘গণতন্ত্রের মানসপুত্র’ হিসেবে খ্যাত সোহরাওয়ার্দীও ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন।
ষষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী হন ইব্রাহিম ইসমাইল চুন্দিরগার। মাত্র দুমাস পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন চুন্দিরগার। এরপর আসেন ফিরোজ খান নুন। তার শাসনকালের সময় ছিল ২৯৫ দিন। সম্পূর্ণ ক্ষমতা দখলের ইচ্ছায় ফিরোজ বাধ সাধতে পারেন, এই ভয়ে তাকেও গদিচু্যত করেন ইসকান্দার মির্জা। অষ্টম প্রধানমন্ত্রী নুরুল আমিনই স্বল্পমেয়াদী প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। মাত্র ১৩ দিনের জন্য ক্ষমতায় ছিলেন। পাকিস্তানের দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট আইয়ূব খানের সঙ্গে মনোমালিন্য হওয়ায় নিজের পদ ছাড়েন। তিনি পাকিস্তানের শেষ বাঙালি নেতা হিসেবেও পরিচিত।
ক্ষমতায় আসেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। ১৯৭৩ সাল থেকে শুরু করে তিনি তিন বছর ৩২৫ দিন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৭৭ সালের ৫ জুলাই জেনারেল মোহাম্মদ জিয়াউল হকের নেতৃত্বে সামরিক বাহিনী ভুট্টোকে ক্ষমতাচু্যত করে। এরপর মোহাম্মদ খান জুনেজো তিন বছরের কিছু বেশি সময় মসনদে ছিলেন। তাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অযোগ্য এবং অর্থনৈতিক দুরাবস্হার জন্য দায়ী করে পদ থেকে সরিয়ে প্রেসিডেন্ট পদে বসেন জেনারেল জিয়াউল হক।
পাকিস্তানের একাদশ এবং প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় আসেন জুলফিকারের মেয়ে বেনজির ভুট্টো। তিনি প্রায় দুবছর ক্ষমতায় ছিলেন। বেনজিরের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও স্বজনপোষণের অভিযোগ এনে ১৯৯০ সালে প্রেসিডেন্ট ইসহাক তাকে বরখাস্ত করেন। ১৯৯০ সালে দ্বাদশ প্রধানমন্ত্রী হন নওয়াজ শরিফ। ১৯৯৩ সালে প্রেসিডেন্ট ইসহাক পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার পর তিনি গদিচু্যত হন। ত্রয়োদশ এবং চতুর্দশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আবারও শাসনের ভার পান বেনজির এবং নওয়াজ। ১৯৯৬ সাল থেকে বেনজির ৩ বছর ১৭ দিন ক্ষমতায় ছিলেন। নওয়াজের দ্বিতীয়বারের শাসনকাল চলে দুবছর ২৩৭ দিন। এরপর ১৯৯৯ সালে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর অভু্যত্থানে তার শাসনকালের অবসান ঘটে। এরপর ক্ষমতায় আসেন মীর জাফারুল্লাহ খান জামিলি। প্রায় দুবছরের শাসনকালের পর হঠাত্ই নিজের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এর আগে জামিলি প্রায় তিন ঘণ্টা তত্কালীন সেনাপ্রধান পারভেজ মোশারফের সঙ্গে বৈঠক করেন।
ষষ্ঠদশ প্রধানমন্ত্রী হন চৌধুরী সুজাত হোসেন। তার শাসনের সময়কাল ছিল মাত্র ৫৭ দিন। তিনি নিজেই শওকত আজিজকে পদ ছেড়ে দেন। মোশারফের ডান হাত হিসেবে পরিচিত শওকত তিন বছর ক্ষমতায় থাকার পর নিজে থেকেই সরে যান। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় আসেন ইউসুফ রাজা গিলানি। ২০০৮ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত তিনি মোট চার বছর ৮৬ দিন ক্ষমতায় ছিলেন। দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রধানমন্ত্রী পদে গিলানিই সবচেয়ে বেশি দিন বহাল ছিলেন। একাধিক দুর্নীতির মামলায় যুক্ত থাকার অভিযোগে সুপ্রিম কোর্ট তার প্রধানমন্ত্রী পদ খারিজ করে।
১৯তম প্রধানমন্ত্রী হন রাজা পারভেজ আশরা।| তিনি ২৭৫ দিন ক্ষমতায় ছিলেন। সুপ্রিম কোর্ট তাকে ক্ষমতাচু্যত করে। ২০১৩ সালে ফের ক্ষমতায় ফেরেন নওয়াজ শরিফ। তৃতীয়বারে চার বছরের ৫৩ দিনের জন্য ক্ষমতায় ফেরেন তিনি। তবে ২০১৭ সালে পানামা পেপার দুর্নীতিতে যুক্ত থাকার অভিযোগে তাকে ক্ষমতাচু্যত করে সুপ্রিম কোর্ট। ৩০৩ দিনের জন্য ২১তম প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন শাহীদ খাকান আব্বাসি। তবে ২০১৮ সালে নির্বাচনের মুখে তাকে প্রধানমন্ত্রী পদ ছাড়তে হয়। নির্বাচনে জিতে প্রধানমন্ত্রীর পদে বসেন ইমরান খান।
বিবিসি জানায়, পাকিস্তানের ২২তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইমরান খান ক্ষমতায় এসেছিলেন ২০১৮ সালের জুলাইয়ে নির্বাচনের মাধ্যমে। অক্টোবরে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। তখনও দেশটির সেনাবাহিনীর ভূমিকা তার বিজয়ের পথ তৈরি করে দিয়েছে এমন কথাই প্রচলিত ছিল। ইমরান খান ব্যাপক দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই আর অর্থনৈতিক স্হিতিশীলতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো অর্থনৈতিক সংকটের কারণেই ধীরে ধীরে বিপাকে পড়তে শুরু করে তার সরকার।
ক্ষমতায় আসার পরই যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানে ৩০ কোটি ডলারের সহায়তা আটকে দেয়। দেশটিতে মুদ্রাস্ফীতিও দুই ডিজিটে পৌঁছায়। জিনিসপত্রের দামও বাড়তে শুরু করে হুহু করে। একপর্যায়ে গোয়েন্দা সংস্হা আইএসআইয়ের প্রধান নিয়োগ নিয়ে সেনাবাহিনীর সঙ্গেও দ্বন্দ্বের জড়ান তিনি। আবার রাশিয়া যখন ইউক্রেনে হামলা শুরু করে, তখন তার মস্কো সফরও পশ্চিমা বিশ্ব বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ভালোভাবে নেয়নি। এর মধ্যেই তার ক্ষমতাসীন জোটের বড় অংশ এমকিউএম তাকে ছেড়ে বিরোধী জোটে যোগ দিলে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন হারায় তার সরকার।
এ ঘটনার কয়েক দিন আগে থেকেই ইমরান খান বিরোধী দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছিলেন, এরা বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তিনি আরো অভিযোগ করেছিলেন, ষড়যন্ত্রের পেছনে আছে যুক্তরাষ্ট্র। কারণ, তিনি রাশিয়া এবং চীনের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। এ জন্যই তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র গতকালও বলেছে এসব অভিযোগের ভিত্তি নেই।

প্রধানমন্ত্রী পদে কোরেশি ও শাহবাজ শরিফের মনোনয়নপত্র জমা
আবার মুক্তির সংগ্রাম শুরু: ইমরান খান