পাকিস্তান-চীন নতুন সীমান্ত চুক্তিতে ক্ষুব্ধ ভারত

আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯:৫৮

হিমালয়ের বিতর্কিত একটি অংশে সীমানা চূড়ান্ত করেছে পাকিস্তান ও চীন। তবে বেইজিং ও ইসলামাবাদের এই নতুন সীমান্ত চুক্তিতে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে নয়াদিল্লি। ভারতের দাবি, এ চুক্তির কোনো আইনি ভিত্তি নেই; কারণ সংশ্লিষ্ট অঞ্চলটি তাদের নিজেদের ভূখণ্ড।

গত সপ্তাহে পাকিস্তান ও চীন যৌথ সীমান্ত কমিশন গঠনের চুক্তিতে সই করেছে। পাকিস্তানের দাবি, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এর মাধ্যমে দুই দেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য ও যোগাযোগ আরও জোরদার হবে। কিন্তু ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে।

মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেছেন, “পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে কোনো সীমান্ত নেই। আমরা তথাকথিত যৌথ কমিশন প্রত্যাখ্যান করছি। এর কোনো আইনি ভিত্তি নেই।”

এই কমিশনের আওতায় রয়েছে বিতর্কিত শাকসগাম উপত্যকা। ১৯৬৩ সালে পাকিস্তান প্রায় ৫ হাজার ১৮০ বর্গকিলোমিটারের এ উপত্যকা চীনের কাছে হস্তান্তর করেছিল। ভারত এটিকে লাদাখের অংশ বলে দাবি করে। নয়াদিল্লির অবস্থান, শাকসগাম ছিল তৎকালীন জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের অংশ। পাকিস্তান অবৈধভাবে দখল করে চীনের কাছে দিয়েছে। ভারত কখনোই ১৯৬৩ সালের সেই চুক্তিকে স্বীকৃতি দেয়নি।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, অবৈধভাবে ও জোর করে দখল করে রাখা ভারতীয় ভূখণ্ড নিয়ে কোনো ধরনের চুক্তি সই করার আইনি এখতিয়ার পাকিস্তানের নেই।

পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, জম্মু ও কাশ্মীর এখনো বিতর্কিত ভূখণ্ড। তাই ১৯৬৩ সালের চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার ভারতের নেই।

দিল্লির শিব নাদার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জাবিন টি জ্যাকব বলেন, এ উদ্যোগ নতুন কিছু নয়। ১৯৬৩ সালের চুক্তিতেই যৌথ সীমান্ত কমিশনের কথা বলা হয়েছিল। এখন কেন এটি আবার চালু করা হলো, সেটাই প্রশ্ন।

তার মতে, চীনের সীমান্ত চিহ্নিত করার বৃহত্তর উদ্যোগ এবং সীমান্ত এলাকায় যোগাযোগ প্রাতিষ্ঠানিক করার চেষ্টা এর পেছনে থাকতে পারে। বিশেষ করে পাকিস্তানের অন্য সীমান্তে অস্থিরতা দেখা দিলে এ ধরনের পদক্ষেপ গুরুত্ব পায়। জ্যাকব আরও বলেন, ১৯৬৩ সালের চুক্তির ৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছিল, কাশ্মীর বিরোধের সমাধান হলে যে দেশ ওই ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নেবে, তার সঙ্গে চুক্তি নিয়ে আবার আলোচনা করতে হবে। এখন সেই শর্তকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত হুসেইন হাক্কানি বলেন, নতুন কমিশন একই সঙ্গে বাস্তবসম্মত ও রাজনৈতিক। এটি সীমান্ত সহযোগিতা বাড়ানো, অবৈধ পারাপার ঠেকানো এবং চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (সিপিইসি) সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো সুরক্ষার ব্যবস্থা। একই সঙ্গে ভারতকে বার্তা দেওয়া হয়েছে যে কাশ্মীর ইস্যুতে চীন এখনো পাকিস্তানের অবস্থানকেই সমর্থন করে।

হাক্কানি বলেন, চীন কখনোই কাশ্মীর বিষয়ে ভারতের অবস্থান মেনে নেয়নি। চীন গিলগিট-বালতিস্তানকে ভারতের নয়, পাকিস্তানের চোখ দিয়ে দেখে।

তিনি আরও বলেন, ভারত ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করে কাশ্মীরে অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন আনার পর পাকিস্তানও ১৯৬৩ সাল থেকে চালু থাকা ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে আপত্তি করেনি।

কূটনৈতিক বার্তা ও সময়

চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং সম্প্রতি ব্রিকস সম্মেলনে নয়াদিল্লি সফর করার পরপরই এ চুক্তির খবর প্রকাশ পায়। হাক্কানির মতে, এর মাধ্যমে পাকিস্তানকে কৌশলগত অংশীদারত্ব নিয়ে আশ্বস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভারতকে মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে, বহুপক্ষীয় যোগাযোগ বাড়লেও দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে চীনের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসেনি।

জাবিন জ্যাকব সতর্ক করে বলেন, এটিকে ভারতের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখায় (এলএসি) এর তাৎক্ষণিক কোনো প্রভাব নেই। বরং ভারত যেসব ব্যবস্থাকে বরাবরই প্রত্যাখ্যান করে এসেছে, সেগুলোকে ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার চেষ্টাই এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতের অবস্থান স্পষ্ট দিল্লি যেটিকে অবৈধ দখল বলে মনে করে, তাকে বৈধতা দেওয়ার কোনো চেষ্টাই গ্রহণযোগ্য নয়। এর ফলে ওই ভূখণ্ডের ওপর ভারতের সার্বভৌমত্বের দাবির কোনো পরিবর্তন হবে না।

ইত্তেফাক/এবিএস