ভারতে নরেন্দ্র মোদির জয়ের নির্বাচন লোকসভার আগে ইরান থেকে তেল আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাধা, শপথের আগের দিন রাশিয়া থেকে এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র কেনার বিষয়ে হুঁশিয়ারি এবং শপথের পরদিন ভারতের জিএসপি প্রত্যাহারের ঘোষণা। অথচ একদিন আগেই দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় নরেন্দ্র মোদিকে শুভেচ্ছা জানান তার ‘ব্রোম্যান্স’ হিসেবে পরিচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। একদিন আগের আর্থিক রিপোর্টে প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া এবং বেকারত্ব বৃদ্ধির পর জিএসপি ইস্যুতে চাপে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার। ২৪ জন মার্কিন কংগ্রেসম্যান ভারতের পক্ষে সুপারিশ করলেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসন সেগুলো মানেনি। আগামী বুধবার থেকেই ভারত যুক্তরাষ্ট্রে শুল্কমুক্ত পণ্য রপ্তানির সুবিধার তালিকা থেকে বাদ যাচ্ছে।
কেন এই পদক্ষেপ : যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় শুক্রবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই জানিয়েছেন, ৫ জুন থেকে ভারতকে দেওয়া অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা (জিএসপি) বাতিল করছে যুক্তরাষ্ট্র। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এতদিন ভারত এই বিশেষ মর্যাদা পেত। জিএসপি যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া সবচেয়ে পুরানো এবং বড় বাণিজ্য সুবিধা। এর মাধ্যমে উন্নয়শীল দেশগুলোকে বিনা শুল্কে ৩ হাজারের বেশি পণ্য মার্কিন বাজারে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। ১৯৭৪ সালের ইউএস ট্রেড অ্যাক্টের আওতায় ১৯৭৬ সালের পহেলা জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, আমরা যে ধরনের বাণিজ্যিক সুবিধা ভারতকে দিয়ে থাকি তার সমতুল্য ও গ্রহণযোগ্য কোনো কিছু দেওয়ার ব্যাপারে পাল্টা আশ্বাস পাইনি। আর ভারতের বাজারে মার্কিন পণ্যের ওপর চড়া শুল্ক আরোপ করা হয় বলেও তার অভিযোগ।
ট্রাম্প প্রশাসন চায়, ভারতের বাজারে মার্কিন কোম্পানির সহজে প্রবেশাধিকার, মেধাস্বত্ব্ব বজায় থাকা, চিকিত্সা এবং ইলেক্ট্রনিক্স পণ্যে নিম্নমানের শুল্ক, ভারতের বাজারে মার্কিন খামারজাত পণ্যের প্রবেশ এবং ভারত সম্প্রতি মার্কিন প্রযুক্তি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যে কঠোর নীতি গ্রহণ করেছে তা সহজ করা। যুক্তরাষ্ট্রের এক বাণিজ্য কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বেশি উদ্বেগ হার্লে-ডেভিডসন মোটরসাইকেল আমদানিতে ভারতের শুল্ক বৃদ্ধি করা। ভারতের ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফায়ার্সের ডিন শ্রীরাম চাউলিয়া বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন মনে করছে, মোদি যেহেতু নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়ে গেছেন, সেহেতু তিনি কিছু একটা করতে সক্ষম হবেন। আবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও আগামী নির্বাচনে সুবিধা নিতে শুল্ক নিয়ে খেলছেন। এছাড়া ইরান থেকে তেল ক্রয় এবং রাশিয়ার কাছ থেকে দূরপাল্লার ভূমি থেকে আকাশ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এস-৪০০ কিনতে বাধা দেওয়াও যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম উদ্দেশ্য।
কতটা ক্ষতি হবে ভারতের : ভারতের বাণিজ্য সচিব গত মার্চেই জানিয়েছিলেন, ভারতের ওপর তেমন একটা প্রভাব ফেলবে না। কারণ জিএসপির আওতায় ভারত বছরে ১৯০ মিলিয়ন বা ১৯ কোটি ডলার মুনাফা করে। তবে জিএসপি ব্যবস্থাপনার সুবিধা যে কয়টি দেশ পেত, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সুবিধা হতো ভারতের। গত জানুয়ারিতে মার্কিন কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিসের তথ্যানুযায়ী, ২০১৭ সালে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জিএসপির আওতায় ৫ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের (৫৭০ কোটি ডলার) পণ্য রপ্তানি করে। এটা যুক্তরাষ্ট্রে ওই বছরের মোট রপ্তানির (৪৫ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার) ১২ ভাগ। ওই বছর ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ২২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, ২০১৮ সালে ভারত যুক্তরাষ্ট্রে মোট রপ্তানি করে ৮৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য ও সেবা। জিএসপির আওতায় রপ্তানি ছিল ৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন (৫৬০ কোটি ডলার) ডলার। জিএসপি প্রত্যাহার হওয়ায় সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে পোশাক, স্বর্ণ এবং গাড়ির যন্ত্রাংশে। ভারতের বিরোধী দল কংগ্রেস জানিয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর আমলে ১৯৭৫ সালের ২৪ নভেম্বর ভারতকে জিএসপি সুবিধার আওতায় আনে যুক্তরাষ্ট্র। দলটি জানায়, জিএসপি বাতিল হওয়ায় ভারত বছরে ২৮ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির সম্মুখীন হবে এবং দেশে বেকারত্ব বাড়বে।
বাদ যাবে না আমেরিকাও : জাতীয়তাবাদের স্লোগান তুলে জয়ী হওয়া মোদি চাপে আছেন। স্টিল ও অ্যালুমিনিয়াম আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক বাড়ানোয় ভারতের বড় ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। আবার মা ও শিশুদের প্রয়োজনীয় পণ্য উত্পাদনকারী কোম্পানিগুলো অভিযোগ করছে, তারা মার্কিন কোম্পানি আমাজনের কাছে ক্রেতা হারাচ্ছেন। ভারতের ইন্টারনেট ও টেলিকমিউনিকেশন জায়ান্ট রিলায়েন্স জিও গুগল, ফেসবুক এবং ইউটিউবের ক্ষমতা খর্ব করতে সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছে। কারণ এদের কাছে ব্যবসায় মার খাচ্ছে কোম্পানিটি। লন্ডনের কিংস কলেজের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক হর্ষ ভি প্যান্ট বলেন, শুল্ক ইস্যুতে চীন এবং মেক্সিকোর পর ট্রাম্প প্রশাসন ভারতকে আঘাত করল। এর মাধ্যমে তিনি নির্বাচনী প্রচারণার দিকেই চলে গেলেন। তিনি ‘ফাস্ট আমেরিকা নীতি’কে কার্যকর করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের কোয়ালিশন ফর জিএসপি এর নির্বাহী পরিচালক ড্যান অ্যান্থনি বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের ফলে মার্কিন ব্যবসায়ীদের বছরে ৩০০ মিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত শুল্ক দিতে হবে। জিএসপি সুবিধা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষুদ্র ব্যবসা নতুন করের মুখে পড়বে। এতে চাকরি হারাবেন অনেকে, বিনিয়োগ বাতিল হবে এবং ক্রেতাদের অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হবে। অ্যান্থনির মতে, মার্কিন আমদানিকারকদেরও অতিরিক্ত অর্থ খরচ করতে হবে এবং মার্কিন ব্যবসায়ীদের ভারতের বাজারে প্রবেশাধিকার কঠিন হবে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ভারত কিছু পণ্য আমদানিতে শুল্ক বাড়িয়েছে। আমেরিকার বাদাম, আপেল এবং কিছু ধাতব পদার্থে শুল্ক বাড়ানোর হুমকি দিয়েছে। ইতোমধ্যে ২০টি মার্কিন পণ্যের তালিকা তৈরি করেছে নয়াদিল্লি। দেশটি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের পদক্ষেপে যেসব দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
