ভারতে ‘পার্ট টাইম’ রাজনীতির দিন শেষ!

আপডেট : ০২ জুন ২০১৯, ২১:৫৩

তালেব রানা

 

নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো সরকার গড়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তার সরকার প্রথম ১০০ দিনে ভারতের অর্থনীতিতে ব্যাপক সংস্কার আনার ঘোষণা দিয়েছে। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে পুরোদমে কাজ শুরু করেছে এনডিএ-২ সরকার। প্রায় তিন দশক পর ২০১৪ সালে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট। নরেন্দ্র মোদির একক ক্যারিশমায় ওই নির্বাচনে জয় দেখেছিল বিজেপি। ঠিক পাঁচ বছর পর এবারের লোকসভা নির্বাচনে মনে করা হয়েছিল- সেই মোদি জোয়ার আর নেই। গতবারের চেয়ে আসন কমবে বিজেপি ও তার জোটের। অন্তত নির্বাচনের আগে জরিপগুলো সেই কথায় বলছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব জরিপের ফলকে ভুল প্রমাণ করে গতবারের চেয়ে বেশি আসনে জয়লাভ করেছে মোদির বিজেপি।

৫৪৩ আসনের লোকসভায় সরকার গড়তে প্রয়োজন ২৭২ আসনের। তবে এবার তামিল নাড়ুর ভোলোর আসনে ভোটগ্রহণ বন্ধ রেখেছে নির্বাচন কমিশন। ৫৪২ আসনের নির্বাচনে বিজেপি পেয়েছে ৩০৩টি আসন। গতবার তারা পেয়েছিল ২৮২টি আসন। ২০১৪ সালে ভরাডুবি হয়েছিল বিরোধী দল কংগ্রেসের। ওই নির্বাচনে তারা পেয়েছিল ৪৪টি আসন। স্বাধীন ভারতে কংগ্রেসের মতো দলের জন্য এই ফল ছিল অকল্পনীয়। ধারণা করা হয়েছিল, এবারের নির্বাচনে ঘুরে দাঁড়াবে কংগ্রেস। গান্ধী পরিবারের তিন সদস্য এবারের নির্বাচনে দাপিয়ে বেরিয়েছেন রাজনীতির মাঠে। কিন্তু তাতে খুব একটা লাভ হয়নি। গতবারের চেয়ে মাত্র আটটি আসন বেড়েছে কংগ্রেসের। এই ফলের কারণে কংগ্রেসের রাজনীতিতে গান্ধী পরিবারের ভবিষ্যত নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

গান্ধী পরিবারের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত উত্তর প্রদেশের আমেথি আসনে এবার বিজেপি নেত্রী স্মৃতি ইরানির কাছে হেরেছেন কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী। যদিও কেরালার ওয়েনাদ আসনে জিতেছেন রাহুল। নির্বাচনে ব্যর্থতার দায় নিয়ে কংগ্রেসের সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগের ব্যাপারে এখনো অনড় অবস্থানে রয়েছেন তিনি। রাহুল চান কংগ্রেসের নেতা হোক গান্ধী পরিবারের বাইরের কেউ। নির্বাচনে এই জয়-পরাজয় ফলাফলের গতি-প্রকৃতি নিয়ে ভারতে চলছে ব্যাপক বিশ্লেষণ ও আলোচনা। বিভিন্ন বিশ্লেষকের মতে, গরিববান্ধব কর্মসূচির মাধ্যমে জনগণের সঙ্গে ভালোভাবে সম্পৃক্ত হতে পেরেছেন নরেন্দ্র মোদি। অথচ গরিবদের জন্য বার্ষিক ৭২ হাজার রূপি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েও ভোটারদের আকৃষ্ট করতে পারেনি কংগ্রেস এবং রাহুল গান্ধী। এবারের নির্বাচনে বিরোধীরা একটি বিষয়ে জোর দিয়েছে- তা হলো নরেন্দ্র মোদি থেকে মুক্তি। তাদের এই অবস্থান মোদিকে বেশি শক্তিশালী করেছে। কারণ বিরোধীরা মোদিকে ক্ষমতা থেকে সরানোর প্রেক্ষিতে ইতিবাচক কোনো লক্ষ্য তুলে ধরতে পারেনি। আবার মোদির কোনো বিকল্পকে সামনে আনতে পারেনি। মোদির হিন্দুত্ব জাতীয়তাবাদও তার জয়ের অন্যতম একটি কারণ। তবে জয়ের কারণ যেটাই হোক না কেন, একটি বিষয় নিশ্চিত যে ভারতের রাজনীতিতে মৌলিকভাবে একটি পরিবর্তন এসেছে। আর এই ধারায় পার্ট টাইম রাজনীতিকদের দিন শেষ হয়ে গেছে! হিন্দুস্তান টাইমসের এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, জাগ্রত অবস্থায় নরেন্দ্র মোদির প্রতিটি মিনিটই কাটে রাজনীতি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে। যেমনভাবে কাজ করেন বিজেপি সভাপতি অমিত শাহও। বাস্তবতা হলো, নরেন্দ্র মোদি একজন ব্যাচেলর এবং তার কোনো সন্তানাদি নেই। যে কারণে প্রতিটি মুহূর্তে তিনি ডুবে থাকেন রাজনীতির মধ্যে। তিনি রাজনীতি আর জনগণের জন্য এক নিবেদিত প্রাণ মানুষ। নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহের এই বৈশিষ্ট্যই এবারের লোকসভা নির্বাচনে সাফল্যের অন্যতম চাবি-কাঠি। মোদি-শাহের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুধু নির্বাচন কেন্দ্রীক নয়। তারা রাজনীতির সাগরে এমনভাবে সাঁতার কেটে চলেছেন যে শ্বাস নেওয়ার জন্য বিরতিও নিচ্ছেন না। 

অন্যদিকে ভারতে পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির ক্ষেত্রে মানুষের চিন্তা-ভাবনায় পরিবর্তন এসেছে। এক জরিপে দেখা গেছে, ভারতের ৩০ শতাংশ রাজনীতিক এসেছেন রাজনৈতিক পরিবার থেকে। এর মধ্যে কংগ্রেসে রয়েছে ৩১ শতাংশ এবং বিজেপিতে ২২ শতাংশ। আমেথিতে রাহুলের পরাজয় অন্তত সেই ইঙ্গিতই দেয়। এটা সত্য যে সেখানে গান্ধীদের চেয়ে স্মৃতি ইরানি অনেক বেশি সক্রিয় ছিলেন এবং অনেক বেশি মানুষের কাছে তিনি পৌঁছেছেন। তাই ভারতের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে গান্ধীদেরও নতুন ধাঁচের এই রাজনীতিতে সংযুক্ত হওয়া জরুরি। তাদের জন্য সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হতে পারেন, সাবেক কংগ্রেস নেতা ওয়াইএস জগমোহন রেড্ডি। যিনি অন্ধ্রে এবার বিপুল ব্যবধানে জয়ী হয়ে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। তিনি পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির লেবাস খুলে রাস্তায় সময় দিয়েছেন মানুষের মন জয়ে।