কোনো কোনো জাতির কাছে ভাষাটাই তার সবচাইতে বড় পরিচয়। সেই কবে কবি রামনিধি গুপ্ত বলে গেছেন—‘নানান দেশের নানা ভাষা, বিনে স্বদেশী ভাষা, পুরে কি আশা?’ পাকিস্তান জন্মের পরপরই বাঙালি এর প্রমাণ পেয়েছিল। সেসময় পূর্ব বাংলার বহুল ব্যবহূত মানিঅর্ডার ফরমটা বাংলায় নয়, শুধু উর্দুতে লেখা ছিল। এরপর উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করা হলে তার পরিপ্রেক্ষিতে এলো বায়ান্ন এবং অবশেষে একাত্তর।
বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে পুনরায় ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার। কিন্তু হঠাত্ জুনের প্রথম দিন থেকে দক্ষিণ ভারতের সোশ্যাল মিডিয়া গরম হয়ে উঠেছে। বিষয়টি সেই ভাষা। ‘স্টপহিন্দিইম্পোজিশন’ হ্যাশট্যাগটি ছড়িয়ে পড়েছে দক্ষিণের সাধারণ মানুষের ভেতরে। তার কারণ হলো—পয়লা জুন প্রকাশ করা হয়েছে ভারতের জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১৯-এর খসড়া। নয়া শিক্ষানীতির প্রস্তাবিত খসড়ায় বলা হয়েছে, অ-হিন্দিভাষী রাজ্যগুলোতে তিনটি ভাষা বাধ্যতামূলক করা হবে। ভাষা তিনটি হলো—আঞ্চলিক ভাষা, ইংরেজি ও হিন্দি। দক্ষিণ ভারতে এই তৃতীয় ভাষাটি বাধ্যতামূলক করা নিয়েই আপত্তি। বলা যায়, হিন্দি জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন তামিলনাড়ুর প্রায় সব দলের রাজনীতিকরা।
ভাষাবিজ্ঞানীরা অবশ্য মনে করেন, একাধিক ভাষা রপ্ত করতে পারাটা খারাপ কিছু নয়। বরং এতে মানুষের বুদ্ধির বিকাশ ত্বরান্বিত হয়। কিন্তু দক্ষিণ ভারতের কাছে নিজস্ব ভাষাপ্রীতি অত্যন্ত তীব্র। এর উদাহরণ ইতিহাসে ছড়িয়ে আছে। এমনিতেই ভারত বহু ভাষার দেশ। ভারতে কতগুলো ভাষা আছে—এমন সাধারণ প্রশ্ন আমজনতাকে জিগ্যেস করলে সঠিক উত্তর পাওয়া খুব কঠিন। ভারতের রুপির নোটের দিকে নজর দিলে দেখা যাবে যে, সেখানে হিন্দি ও ইংরেজি ছাড়াও ভারতীয় আরো ১৫টি ভাষায় টাকার অঙ্কের পরিমাণ লেখা আছে। তাহলে কি ভারতে ভাষার সংখ্যা ১৭? না, ভারতের মাইসোরের দ্য সেন্ট্রাল ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজ সংস্থাটি জানাচ্ছে যে, ভারতে মোট ১ হাজার ৬৩৫টি পরিচিত মাতৃভাষা ও ২৩৪টি অপরিচিত মাতৃভাষা এবং ২২টি প্রধান ভাষা রয়েছে। আর ভারতে মোট জনপ্রিয় ভাষা রয়েছে ১২২টি। এর বাইরে আরো ৪২টি ভাষা রয়েছে, যেগুলো ১০ হাজারেরও কম মানুষ ব্যবহার করেন। আর কিছু কিছু ভাষা ব্যবহার করেন হাতে গোনা কিছু মানুষ। এইরকম ২৪টি ভাষা বিলুপ্তির পথে পা বাড়িয়েছে। আর ভারতের বাইরে আমরা যদি পৃথিবীর দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাব—সারা বিশ্বে ভাষা আছে প্রায় ৭ হাজার! এসব ভাষার কিছু কিছু প্রতি বছরই বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। অনেক ভাষায় হয়তো কথা বলেই গুটিকয়েক মানুষ। যেমন ধরা যেতে পারে পাপুয়া নিউগিনির কথা। সেখানে জনসংখ্যা ৪০ লাখেরও কম, অথচ আলাদা আলাদা ভাষা রয়েছে ৮৩২টি!
আমরা দক্ষিণ ভারতের হিন্দিভীতি নিয়ে কথা বলছিলাম। দাক্ষিণাত্যের বিশাল অংশে নানা ভাষা আছে। যেমন—তামিল, মালায়লাম, তেলেগু, কন্নড়সহ পাঁচ থেকে ছয়টি অতি পুরোনো ভাষা বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা এবং শিক্ষার ভাষা হিসেবে চালু রয়েছে। এর সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটিশ শাসনের কারণে ও ভারতের সর্বদক্ষিণের ওই অঞ্চলে বহুকাল ধরে ইংরেজি ভাষা তার নিজের জায়গা করে নিয়েছিল। ব্রিটিশ ভারতে মাদ্রাজে ১৯৩৭ সালে রাজা আচারিয়ার সরকার হিন্দিকে মাদ্রাজের শিক্ষার ভাষা হিসেবে চালু করতে মাদ্রাজ পার্লামেন্টে আইন করার চেষ্টা করেছিল। যদিও তারা জানতেন, ওই অঞ্চলের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ তামিল ভাষাভাষী। তামিল ভাষা ভারতীয় ভাষার মধ্যে অন্যতম পুরাতন। খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০ সাল থেকে আদি তামিল ভাষার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। রাজা আচারিয়ার মাদ্রাজ সরকারের ওই সিদ্ধান্তে গর্জে উঠেছিল তত্কালীন দক্ষিণ ভারত। অনেক ভাষাগবেষক ওই অবস্থার সঙ্গে আমাদের বায়ান্নর ভাষার আন্দোলনের পূর্বরূপ বলে তুলনা করে থাকেন। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় দক্ষিণ ভারতে ১৯৩৭ থেকে ১৯৩৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার মানুষ কারাবন্দি হয়েছিলেন। অবশেষে ব্রিটিশ ভারতের গভর্নর জেনারেল ১৯৩৯ সালের নভেম্বর মাসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঘোষণা করলে কংগ্রেস সেই যুদ্ধে অংশ নিতে এবং ভারতবাসীর বিনা অনুমতিতে যুদ্ধের ঘোষণায় কংগ্রেস তার আট প্রদেশের ক্ষমতা থেকে মন্ত্রীদের পদত্যাগের ঘোষণা দেয়। রাজা আচারিয়া মাদ্রাজ সরকার থেকে পদত্যাগ করে ১৯৩৫ সালের আইন অনুসারে গভর্নরের শাসন জারির পথ সুগম করেন। ব্রিটিশ গভর্নর দ্রুত হিন্দি ভাষার আইন বাতিল করার ফলে এক পর্যায়ে আন্দোলন স্থগিত হয়।
তবে ঘটনার সুদূরপ্রসারী রেশ তখনো শেষ হয়নি। একই বিষয় আবার ফিরে আসে স্বাধীন ভারতে। ১৯৫০ সালে ভারতীয় সংবিধানে বলা হয়, ১৯৬৫ সালের ২৬ জানুয়ারি ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসে সব রাজ্যে সর্বস্তরের হিন্দি হবে প্রধান ভাষা। অনেকে মনে করেন, কংগ্রেস নেতারা প্রধানত হিন্দিবলয় তথা উত্তর ভারতের হওয়ায় দক্ষিণের মানুষের অনুভূতি উপলব্ধি করতে পারেননি। তাই ওই বিধানের পর থেকেই হিন্দিভাষী অঞ্চলের বাইরে সর্বত্র অসন্তোষ জমাট বাঁধতে শুরু করে। ১৯৫৮ সালে নেহরু মাদ্রাজ সফরে গিয়ে তামিলভাষীদের ভাষা আন্দোলনের বিষয়ে তির্যক মন্তব্য ‘ননসেন্স’ বলায় একটি রক্তক্ষয়ী প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই দিন মাদুরায় সংঘটিত রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে প্রায় ৩০০ মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়। নেহরু অবশ্য পরে দক্ষিণ ভারতের মানুষের অনুভূতি বুঝতে পেরে ১৯৬৩ সালে ভাষা বিষয়ে সংবিধানে বর্ণিত ধারায় পরিবর্তন এনেছিলেন। সেখানে বলা হয়েছিল, কোনো প্রদেশ চাইলে প্রচলিত ইংরেজি ভাষা ১৯৬৫ সালের জানুয়ারির পরেও অব্যাহত রাখতে পারবে। কিন্তু তামিল ছাত্ররা সংশোধনী সম্পর্কে পুরোপুরি সন্দেহমুক্ত হতে পারেননি। তারা আন্দোলন অব্যাহত রাখেন। এইসময়ে আচমকা নেহরুর মৃত্যু হলে লাল বাহাদুর শাস্ত্রী ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন এবং সংবিধানের ভাষাবিষয়ক বিধানটি কার্যকর হওয়ার দিন ১৯৬৫ সালের ২৬ জানুয়ারির আগের দিন ২৫ জানুয়ারি তামিলনাড়ুর ছাত্ররা প্রতিবাদ সমাবেশে সমবেত হন। কিন্তু ছাত্ররা সেসময় কংগ্রেস কর্মী ও পুলিশ দ্বারা আক্রান্ত হন। দুজন স্কুলছাত্র নিজ দেহে অগ্নিসংযোগে আত্মাহুতি দেন। ভয়ংকর সেই সংঘর্ষ ভারতের অন্যসব প্রদেশকেই কমবেশি প্রভাবিত করেছিল। নানা সূত্রে জানা যায়, তামিলনাড়ুতে মৃত মানুষের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় দেড় শতাধিক। তত্কালীন সরকার অবশ্য বলেছিল, পুলিশের গুলিতে ৫০ থেকে ৬০ জন নিহত হয়েছে। এর পরই লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর সরকার সংকটের গুরুত্ব বুঝতে পারে। শাস্ত্রী তখন তড়িঘড়ি করে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক বেতার ভাষণে ইংরেজির স্বীকৃতি প্রদান করেন।
এরপর একটি অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটে। ১৯৬৭ সালের নির্বাচনে তামিলনাড়ুতে কংগ্রেস সরকারের পতন ঘটে। সেই যে তামিলনাড়ু থেকে কংগ্রেসের পতন ঘটল, এখন পর্যন্ত আর কখনো সেখানে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি কংগ্রেস। ১৯৬৭-তে ক্ষমতায় এসেছিল ডিএমকে। গত পরশু পয়লা জুন ভারতের নতুন খসড়া শিক্ষানীতির পরিপ্রেক্ষিতে ডিএমকে প্রধান এম কে স্ট্যালিন বলেছেন, ‘তামিলদের রক্তে হিন্দির স্থান নেই। তামিলনাড়ুর ওপর হিন্দি চাপিয়ে দেওয়া মৌচাকে ঢিল ছোড়ার শামিল।’ অন্য আরেক ডিএমকে নেতা টি শিবা বলেছেন, ‘তামিলনাড়ুতে হিন্দি বাধ্যতামূলক করার অর্থ সালফারের গুদামে আগুন ছোড়া। এমডিএমকে নেতা ভাইকো বলেছেন—কেন্দ্রীয় সরকার এই নীতি বাস্তবায়ন করলে ‘ভাষা-যুদ্ধ’ শুরু হয়ে যাবে। এএমএমকে নেতা টিটিভি দিনাকরণের বক্তব্য, ‘অ-হিন্দিভাষী রাজ্যগুলিতে হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার অর্থ বৈচিত্র্যকে ধ্বংস করে দেওয়া। এতে অ-হিন্দিভাষীরা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে গণ্য হবেন।’ যদিও ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে মন্ত্রী প্রকাশ জাভড়েকর বলেছেন, যে রিপোর্ট কমিটি তৈরি করেছে, তা সামনে এসেছে, কিন্তু এটা সরকারের নীতি নয়। সরকার এ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত এখনো নেয়নি। আর মোদি সরকারের বরাবরেই নীতি, সব ভাষারই বিকাশ হোক। কোনো ভাষাই কারো ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে না।’ সুতরাং বিষয়টি ভাষাযুদ্ধ নাকি নতুন করে অ্যাসিড টেস্ট করা—তা বুঝতে সময় লাগবে। আমরা বরং এই লেখার শেষাংশ একাধিক ভাষা শেখার গুরুত্ব নিয়ে মজার কিছু ঘটনা শুনি।
ভিনদেশে দুজন বহুভাষাবিদ নৌকায় করে যাচ্ছিলেন। একজন জিগ্যেস করলেন—সাঁতার জানেন? অন্যজন বললেন—‘জানি না, তবে নয়টা ভাষা জানি। ডুবে গেলে নয় ভাষায় সাহায্যের জন্য চিত্কার করতে পারব!’
নিজের ভাষার বাইরে আর কোনো ভাষা না জানায় সমস্যায় পড়েছিল সুবোধ। তার এলাকায় চিং হোয়াই নামে চীনের এক ধনী ব্যক্তি হঠাত্ খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায় সুবোধ। সারা রাত চিং হোয়াইর পাশে থাকে সে। শেষ রাতে সুবোধ উঠে দাঁড়িয়ে চিং হোয়াইকে কাছ থেকে একনজর দেখতে গিয়ে ‘লি কায় ওয়াং কি গুয়ান’ কথাটি বারবার বলতে বলতে মারা যায় বেচারা। কথাটি মুখস্থ করে রাখে সুবোধ। চীনা ভাষা জানে এমন একজনকে খুুঁজে সে জানতে চায় ওই কথাটির মানে। চীনা ভাষা জানা লোকটি বললেন, কথাটির অর্থ হলো—‘আমার অক্সিজেনের নলটার ওপর থেকে সরে দাঁড়াও দয়া করে!’
n লেখক : সাংবাদিক, চলচ্চিত্রকার
