অপরাধ প্রবণতা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা

আপডেট : ০২ জুন ২০১৯, ২২:০০

কোনো ব্যক্তির অপরাধী হওয়ার জন্য সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, মনস্তাত্ত্বিক, পারিবারিক ও পারিপার্শ্বিক ব্যবস্থা বহুলাংশে দায়ী। মানুষের চালচলন, চাহনি, হাবভাব, মুখের পেশির সংকোচন ও প্রসারণ হতে সে ভীত, দুঃখিত, ক্ষুব্ধ, প্রলুব্ধ বা ক্রুদ্ধ কিংবা হতাশ কিনা তা বোঝা যায়। মনের এই কষ্ট থেকেও মানুষ অপরাধ করে থাকে। অভাবের তাড়নায় কিংবা অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে একাধিকবার অপরাধ করে যদি কারো মধ্যে অনুতাপ ও লজ্জাবোধ দেখা যায়, তাহলে সে প্রকৃত অপরাধী নয়। এদের বলা হয় প্রাথমিক অপরাধী। তবে অনুতাপ ও লজ্জাবোধ হারানো মাত্র তারা প্রকৃত অপরাধীতে পরিণত হয়। প্রকৃত অপরাধ নিজ উদ্যোগে স্বেচ্ছায় হয়ে থাকে। প্রাণভয়ে ভীত হয়ে অপরের ইচ্ছা ও নির্দেশে অপকর্ম করা অপরাধ নয়।

পুলিশে ২৬ বছর বিভিন্ন থানার ওসি হিসেবে এবং র্যাবে পাঁচ বছর সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার পদে চাকরির সময়ে দেখেছি, অনেক গরিব লোক পেটের তাগিদে টিউবওয়েলের হেড, গাছের কলা, পেঁপে, মুরগি, মেলে দেওয়া কাপড়চোপড় ইত্যাদি ছোটখাটো চুরি করার পর অনুতপ্ত ও লজ্জিত হয়ে তা স্বীকার করেছে। আবার অনেকে ছোটখাটো চুরি করতে করতে হাত পাকিয়ে ক্রমশ বড় ধরনের দাগি ও কুখ্যাত অপরাধী হয়েছে। কোনো এলাকায় যদি জুয়ার  আসর বসে, তাহলে সেখানে চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়ে যায়। জুয়া খেলার টাকা জোগাড়ের জন্য অনেকে অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। তদ্রুপ থানা এলাকায় বেআইনি চোলাই মদ চালু হলে ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধ বাড়ে। আবার মেলায় লটারি ও হাউজি চালু হলেও অপরাধের সংখ্যা বাড়ে। তাছাড়া এলাকায় ঠিকমতো পুলিশি টহল না থাকলেও চুরি, ছিনতাই, দস্যুতা, ডাকাতির মতো ঘটনা ঘটে। অপরাধীর বিরুদ্ধে সঠিক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে পুণরায় সে অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।

অপরাধ দমনের জন্য অপরাধ দমন সভা অত্যন্ত কার্যকরী এবং ফলপ্রসূ। এতে শুধু জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টিই হয় না। অপরাধ দমন সভায় সর্বস্তরের জনগণের কাছ থেকে এলাকার অপরাধ পরিস্থিতি সম্পর্কে বাস্তব চিত্র এবং সে মোতাবেক অপরাধ দমনের জন্য তাদের গঠনমূলক পরামর্শ পাওয়া যায়। অপরাধ করলে আইনগতভাবে তার পরিণতি বা শাস্তি ইত্যাদি সম্পর্কে তারা ধারণা লাভ করে। নিরপরাধ মানুষের মধ্যে ভাবপ্রবণতা এবং আদর্শ বহুক্ষণ স্থায়ী হয়। কিন্তু অপরাধীদের মধ্যে ভাবপ্রবণতায় কোনো আদর্শ বা অনুতাপ থাকে না; তাদের ভাবপ্রবণতা, দাম্ভিকতা, নিষ্ঠুরতা এবং  অলসতা পৃথকভাবে প্রকাশ পেয়ে থাকে। অপরাধীরা নিজেদের অপরাধী হিসেবে কুখ্যাত হওয়ার মধ্যে গর্ব অনুভব করে। বাগমারা, বাঘা, শাহজাদপুর, মহাদেবপুর, জগন্নাথপুর, উলিপুর, শেরপুর, পীরগঞ্জ, ইত্যাদি থানায় ওসি হিসেবে চাকরি করার সময় এটা উপলব্ধি করেছি।

অনেক সময় ভালোবাসা ও স্নেহবঞ্চিত ব্যক্তি জিঘাংশাবশত অপরাধে লিপ্ত হয়। সত্মায়ের জ্বালা-যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে কখনো সত্মা আবার কখনো সত্ ভাইকে খুন করার মতো ঘটনা ঘটতে দেখেছি। আবার ঐশী নামে একজন কিশোরী কর্তৃক তার মা এবং পুলিশ ইন্সপেক্টর বাবাকে খুন করার মতো চাঞ্চল্যকর ও লোমহর্ষক ঘটনার কথা সবারই জানা আছে।

শিক্ষা, সংস্কার ও ভয়ের গভীরতার তারতম্য অনুসারে মানুষের মন কমবেশি অপরাধপ্রবণ হয়। উচ্চাকাঙ্ক্ষা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসমতা প্রভৃতিও অনেক সময় অপরাধপ্রবণতা বহিঃপ্রকাশে সহায়ক হয়। অনেকে তাড়াতাড়ি বড়লোক হওয়ার আশায় দুর্নীতি এবং মাদক ব্যবসা ইত্যাদি করে রাতারাতি কোটিপতি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে উচ্চাকাঙ্ক্ষাই তাদেরকে অপরাধপ্রবণতায় উত্সাহিত করেছে। আবার অশিক্ষা, কুসংস্কার এবং সামাজিক বৈষম্যের কারণে বস্তিবাসী কিংবা নিম্নশ্রেণির ছেলেদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা বেশি দেখা যায়।                    

ক্রোধ মানুষকে উন্মাদ করে এবং এটা অপরাধের উল্লেখযোগ্য কারণ। বিতৃষ্ণা ও ক্রোধ একত্র হলে মানুষের মধ্যে উন্মাদনার সৃষ্টি করে। এরূপ মানসিক অবস্থায় মানুষ সহজেই অপরাধমূলক কাজ করে। দীর্ঘদিন থানার ওসি থাকার সময়ে আমি অনেক মামলার তদন্ত করেছি, যেখানে ক্রোধের বশবর্তী হয়ে ছেলে বাবা কিংবা ভাইকে আবার বাবা ছেলেকে খুন করেছে। শিক্ষা, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি দ্বারা মানুষ তার এই অপরাধপ্রবণতাকে প্রতিরোধ করে। এ ছাড়া বিকৃত যৌনবোধও মানুষকে অপরাধী করে। শিশু ও অপরিণত বালক দ্বারা কৃত কোনো অপরাধ অপরাধরূপে স্বীকৃত হয় না। মাতাল অবস্থায় লোকে যদি কোনো অপরাধ করে, তাহলে তার সেই অপরাধকে অপরাধ বলা হয় না। তবে সেই ব্যক্তি যদি অপরাধ করার উদ্দেশ্যে মদপান করে, তাহলে অবশ্যই তা অপরাধ। এমন অনেক দুর্বল মানুষ আছে, যারা অপর ব্যক্তি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অপরাধ করে। আইনত অপরাধীদের তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়। যথা— (১) শিশু অপরাধী (২) কিশোর অপরাধী এবং (৩) বয়স্ক অপরাধী। কিশোর অপরাধীরা সাধারণত প্রাথমিক অপরাধী। তবে এদের কেউ কেউ তাদের অপরাধজীবন বয়স্কাল পর্যন্ত অব্যাহত রেখে প্রকৃত তথা শেষ পর্যায়ের অপরাধী হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে বংশগত প্রভাবও অনেকটা দায়ী।

আমেরিকা, বিট্রেন, জার্মান এমনকি এশিয়ার চীনে একটি থানা সব দিক দিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ। সেসব দেশের প্রতিটি থানায় ফোর্সের সংখ্যা ২৫০ জনের মতো। এ ছাড়া প্রতিটি থানায় রয়েছে ফরেনসিক মেডিসিন, ক্রাইম সিন, আঙুলের ছাপ ও হস্তবিশারদ, আলাদা তদন্ত ইউনিট ইত্যাদি। তাদের রয়েছে পর্যাপ্ত যানবাহন, হেলিকপ্টার এবং আবাসন ব্যবস্থা। তার পরও সেসব দেশে আমাদের দেশের তুলনায় অপরাধের সংখ্যা অনেক বেশি। সেখানে পাঁচ মিনিট বিদ্যুত্ না থাকলে নারী ধর্ষণ, রাহাজানি, লুটতরাজের মতো শত শত ঘটনা ঘটে। কিন্তু লোডশেডিংয়ের কারণে আমাদের এখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুত্ না থাকলেও হাতে গোনা দু-একটি অপরাধ সংঘটিত হয়। এদিক থেকে আমাদের দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুবই ভালো।

১৮৬১ সালের পুলিশ অ্যাক্ট অনুযায়ী পুলিশ বাহিনী প্রতিষ্ঠার পর থেকে অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষায় নিজস্ব বিধিবিধানের আলোকে বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এ সংক্রান্ত বিভিন্ন আইন ও বিধিবিধানে সুস্পষ্টভাবে পুলিশের শৃঙ্খলা ভঙ্গের বিচারে করণীয় পদ্ধতি বলা আছে। একটা প্রবাদ বাক্য আছে— পাপীকে নয়, পাপকে ঘৃণা করো। আসলেই তাই, অপরাধী যাতে অপরাধ কর্ম ছেড়ে নিরাপরাধ হিসেবে তার জীবনকে পরিচালিত করতে পারে সেজন্য তাকে এবং পাশাপাশি অন্যান্য সকল অপরাধীকে অপরাধ করা থেকে নিরুত্সাহিত করতে হবে। অপরাধ প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সমাজের সবাইকে সামাজিক আন্দোলন করতে হবে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে নাগরিক সমাজসহ সর্বস্তরের মানুষকে এগিয়ে এসে সর্বত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। আসুন, আমরা সবাই মিলে অপরাধমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলি।  

n লেখক : সাবেক পুলিশ ও র্যাব কর্মকর্তা