ঈদ হলো ভ্রাতৃত্ব ও সৌহার্দ্যের মেলবন্ধন

আপডেট : ০২ জুন ২০১৯, ২২:০০

শত যোজনের কত মরুভূমি পারায়ে গো, /কত বালুচরে কত আঁখি ধারা ঝরায়ে গো, /বরষের পর আসিলে ঈদ।

শত সংযম আর দীর্ঘ একমাস সিয়াম সাধনার পর বহু প্রতীক্ষিত ঈদ আসে মুসলমানদের দ্বারে।

হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে সাম্য-সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার বার্তা নিয়ে বছর ঘুরে আবারো এলো পবিত্র ঈদুল ফিতর। আনন্দ আর ত্যাগের এক অনন্য মহোত্সব এই ঈদ। যে উত্সবে আমরা ভুলে যাই পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ, মান-অভিমান, শত্রু-মিত্র। শত্রুকে বন্ধু করে নেওয়ার এই সুবর্ণ সুযোগ হয় প্রতি ঈদে। তাই কবি মন গেয়ে উঠে—আজ ভুলে যা তোর দোস্ত-দুশমন, হাত মেলাও হাতে। /তোর প্রেম দিয়ে কর বিশ্ব নিখিল ইসলামের মুরিদ।/ ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।

ধনী-গরিব, উঁচু-নিচু, বড়-ছোট এক হওয়ার এই প্রাণের উত্সবে মেতে ওঠে পুরো মুসলিম জাহান। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর আনাচে-কানাচে সকল মুসলমান শরীক হন এই মিলনমেলায়। ঈদ উত্সবে রঙিন হয় সারা জাহান, দূরীভূত হয় অন্ধকার অমানিশা। হাসিখুশি ছড়িয়ে পড়ে প্রতি ঘরে। সবাই যে যার মতো আনন্দে মশগুল হয়ে যায়। বিশাল অট্টালিকায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রুমে অবস্থান করা ধনাঢ্য শ্রেণির কাছে ঈদ এখন বুর্জোয়া বিলাসে পরিণত হচ্ছে। ঈদুল ফিতরের ত্যাগের শিক্ষা ভুলে তারা এটাকে এখন ফ্যাশনে রূপান্তর করছে। নিচতলার মানুষজন  কিভাবে ঈদ উদযাপন করবে সেদিকে এই ধনীদের বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ নেই। এটা কোনোভাবেই ঈদুল ফিতরের শিক্ষা হতে পারে না, ভদ্রসমাজে এটা মোটেই কাম্য নয়। ঈদুল  ফিতর আমাদের ত্যাগের মহিমা শেখায়। দান-খয়রাতে উদ্বুদ্ধ হতে অনুপ্রাণিত করে। যাকাত ফিতরা প্রদানের মাধ্যমে দরিদ্রের হক আদায় হয় ঈদুল ফিতরে। ধনীর পক্ষ থেকে গরিবের জন্য ঈদগাহ যাওয়ার পূর্বেই যাকাত প্রদান করার নির্দেশনা রয়েছে। সকল মানুষের সমান অধিকার এ স্লোগানের যথার্থতা পাওয়া যায় ঈদুল ফিতরের শিক্ষায়। জাতীয় কবির কণ্ঠে উচ্চারিত হয়— ইসলাম বলে সকলের তরে মোরা সবাই, /সুখ-দুঃখ সমভাগ করে নেব সকলে ভাই; /নাই অধিকার সঞ্চয়ের। /ঈদ-উল-ফিতর আনিয়াছে তাই নববিধান, /ওগো সঞ্চয়ী উদ্ধৃত যা করিবে দান; /ক্ষুধার অন্ন হোক তোমার।

ধনী-দরিদ্রের মাঝে গড়ে ওঠা এই আত্মিক সম্পর্ক বজায় থাকে সারাবছর। দুঃখ হতাশার দুয়ার এঁটে, রাশি রাশি আনন্দ আর হৈ-হুল্লোড়, ভালোবাসা ভাগ করে নেওয়ার উত্সবে শামিল হন  ধনী-গরিব, উঁচু-নিচু, বড়-ছোট সব ধরনের মানুষ। অসহায় গরিবের মুখেও সেদিন স্নিগ্ধ হাসি ফোটে। দিকেদিকে বয়ে যায় শান্তি, সম্প্রীতি আর সৌহার্দ্যের জয়জয়কার। শান্তি, ঐক্য, ভ্রাতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রত্যাশা করে কবি লিখেছেন— আমীর-ফকির এক হয়ে যায় যে ঈদে, /আয়না সবাই এই হয়ে যাই সেই ঈদে। /এক থাকি সব এমনি করে জীবনভর, /যাই ভুলে যাই উঁচু-নিচু, আপন-পর!

বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক দেশ। এদেশে হিন্দু-মুসলমানসহ নানা জাতি-ধর্মের লোক যুগ যুগ ধরে শান্তি ও নিরাপদে সহাবস্থান করে আসছে। এদেশে সকল ধর্মের উত্সব মিলেমিশে পালন করা হয়।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এই বাংলাদেশে ধর্ম যার যার, উত্সব সবার। তাইতো ঈদ উত্সব পরিণত হয় মহোত্সবে। ঈদ আনন্দে সাগ্রহে অংশগ্রহণ করে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষজন।

ঈদুল ফিতরের ত্যাগের শিক্ষা আমাদের বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে হবে। ভ্রাতৃত্ববোধ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ  আত্মিক বন্ধন গড়ে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সোচ্চার হতে হবে। সমাজ থেকে দূর করতে হবে হিংসা, হানাহানি, রেষারেষি। সম্প্রীতির বন্ধন জোরালো করে তুলতে হবে ঐক্যের সুর।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়