মস্কভা ডুবি অন্যদের জন্য সতর্ক বার্তা!

আপডেট : ১৮ এপ্রিল ২০২২, ০৮:৩২

ইউক্রেন যুদ্ধে রুশ নৌবাহিনীর নেতৃত্বে থাকা রণতরি মভস্কা এখন কৃষ্ণ সাগরের গভীর তলে অন্তিম বিশ্রামে চলে গেছে। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বুধবার আগুনের কারণে জাহাজটিতে রাখা গোলাবারুদ বিস্ফোরিত হতে থাকে এবং এরপর সব ক্রুকে নামিয়ে আনা হয়। ক্ষতিগ্রস্ত রণতরিটি টেনে বন্দরে নেওয়ার চেষ্টাকালে বৃহস্পতিবার ঝোড়ো আবহাওয়ায় এটি ডুবে গেছে। আগুন লাগার কারণ সম্পর্কে কিছুই জানানো হয়নি। রুশ কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা এ ব্যাপারে তদন্ত করছে।

কিন্তু ইউক্রেনের দাবি তাদের ছোড়া দুটি নেপচুন ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় গত বুধবার বিধ্বস্ত হয় যুদ্ধজাহাজ মস্কভা। এক দিন পর এটি ডুবে গেছে। রাশিয়া এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের দাবি সমর্থন করে বলেছে, ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতেই মস্কভা ডুবে গেছে।

৫১০ ক্রুসহ মিসাইলবাহী মভস্কা রণতরিটি রাশিয়ার সামরিক শক্তির প্রতীক। মস্কভা কৃষ্ণসাগরে রুশ নৌবহরের এক ফ্ল্যাগশিপ জাহাজ। ফ্ল্যাগশিপ জাহাজ হচ্ছে কোনো নৌবহরের নেতৃত্বদানকারী জাহাজ, যেটি অধিনায়ক ব্যবহার করেন। নৌবহরের অন্যান্য জাহাজের তুলনায় ফ্ল্যাগশিপ জাহাজ সাধারণত খুবই দ্রুতগামী এবং শক্তিশালী হয়। গাইডেড মিসাইল ক্রুজার মস্কভা ২০০০ সাল থেকে কৃষ্ণ সাগরে রুশ নৌবহরের নেতৃত্ব দিয়ে আসছিল।

১৯৮০ দশকে তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ ইউক্রেনের এক ডক ইয়ার্ডে জাহাজটি নির্মাণ করা হয়। মস্কভা জাহাজ নিয়ে আলোচনা ছিল ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুর দিকে। সে সময় একটি দ্বীপ স্নেক আইল্যান্ডে এই জাহাজ গিয়ে সেখানে মোতায়েন সব ইউক্রেনীয় সৈন্যকে আত্মসমর্পণ করার জন্য হুমকি দেয়। সিরিয়া যুদ্ধের সময়ও রাশিয়া এই মস্কভা জাহাজটি সিরিয়ান সেনাদের নৌ সুরক্ষার কাজে ব্যবহার করেছে। জাহাজটিতে বিধ্বংসী মিসাইল এবং সাবমেরিন ও টর্পেডো বিধ্বংসী অস্ত্র ছিল। জাহাজটিতে হামলার ইউক্রেনীয় দাবি যদি ঠিক হয়, তাহলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১২ হাজার ৪৯০ টনের মস্কভা হলো সবচেয়ে বড় রণতরী ডুবে যাওয়ার ঘটনা।

ইউক্রেনের মিসাইল হামলা হোক, রাশিয়ার অদক্ষতা বা দুর্ভাগ্য যাই হোক না কেন, এটি সত্য যে, গত ৪০ বছরে এটি সবচেয়ে বড় যুদ্ধজাহাজ হারানোর ঘটনা। এটি শুধু মস্কোর জন্য বিব্রতকর ঘটনা নয়, বরং বিশ্বের অন্যান্য সামরিক শক্তির জন্য দুশ্চিন্তার বিষয়।

ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের লড়াইয়ে ১৯৮২ সালের ২ মে আর্জেন্টিনার ক্রুজার জেনারেল বেলগ্রানো ডুবিয়ে দিয়েছিল ব্রিটিশ পরমাণু ক্ষমতাসম্পন্ন সাবমেরিন এইচএমএস কনকুয়ারার। জেনারেল বেলগ্রানোর আকারও ছিলো ৬০০ ফুট। ঐ জাহাজ ডুবিতে ১ হাজার ১০০ ক্রুর মধ্যে ৩২৩ জনের মৃতু্য হয়েছিল। মস্কভা ডুবে যাওয়ায় কতজন মারা গেছে সেটি জানায়নি রাশিয়া।

বিবিসির নিরাপত্তা বিষয়ক সংবাদদাতা ফ্রাংক গার্ডনারের মতে, সামরিক ও মনোবলের দিক থেকে এ ঘটনা রাশিয়ার জন্য একটি বড় আঘাত। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগন বলেছে, রুশ যুদ্ধজাহাজ মস্কভা ডুবির ঘটনা কৃষ্ণসাগরে দেশটির নৌশক্তির জন্য একটি বড় ধাক্কা। মার্কিন নৌবাহিনীর সাবেক ক্যাপ্টেন কার্ল শুস্টার বলেন, ১০ বছর আগে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তার দেশের নৌবাহিনীর দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন। সেই পদক্ষেপ নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠছে।

মস্কভা যদি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে ডুবে যায় তবে সেটি শুধু রাশিয়া নয়, অন্যান্য দেশের জন্যও বড় সতর্ক বার্তা। ভবিষ্যতে তাইওয়ানের ওপর নিয়ন্ত্রণ জোরদারে চীন সেখানে সামরিক অভিযান চালাতে পারে বলে অনেকেই আশঙ্কা করছেন। যে কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের উত্তেজনা বাড়ছে। থিংক ট্যাংক র্যান্ড করপ-এর আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক টিমোথি হিথ বলেন, সম্ভাব্য যে কোনো সামরিক সংঘাতের ক্ষেত্রে ভাসমান যুদ্ধজাহাজের নিরাপত্তার বিষয়টি চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এখন ভাবনার বিষয়।

এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র চাইবে তাদের যুদ্ধজাহাজগুলো চীনের অ্যান্টি-শিপ ক্ষেপণাস্ত্রের আওতার বাইরে নিয়ে রাখতে। অন্যদিকে তাইওয়ানও ইউক্রেনের মতো অ্যান্টি-শিপ ক্ষেপণাস্ত্র জোগাড় করে চলেছে। ফলে তাইওয়ানে চীনের যে কোনো আগ্রাসন উচ্চ ঝঁুকিপূর্ণ মিশন হবে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক নেভি সাবমেরিন কমান্ডার থমাস শুগার্টের মতে, পরিস্হিতি একরকম নয়। মস্কভার চেয়ে মার্কিন ক্রুজারগুলোর প্রযুক্তি অনেক উন্নত।

ইত্তেফাক/টিআর