একের পর এক ভাঙছে বাঁধ, চলছে লড়াই

আপডেট : ১৮ এপ্রিল ২০২২, ২১:৩১

গত বেশ কিছুদিন থেকেই বৈরি প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে চলছেন সিলেট অঞ্চলের লাখ লাখ কৃষক। পাহাড়ি ঢলের প্রবল চাপ ও কালবৈশাখী ঝড়, শিলাবৃষ্টি, বজ্রপাত মাথায় নিয়ে সারা বছরের খোরাকি ঘরে তোলার প্রাণবন্ত চেষ্টা চলছে হাওরপড়ে। এরপরও একের পর এক আসছে হাওররক্ষা বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকে পড়ার খবর।

সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, পাহাড়ি ঢলে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। সবগুলো বাঁধে পানি ছুঁই ছুঁই অবস্থায়। তাই সবাইকে বাঁধে অবস্থান  নিয়ে পাহারা দিতে হবে। আগামী ২৪ ঘণ্টা হাওরের বাঁধগুলো খুবই ঝুঁকিতে রয়েছে। 

রবিবার দ্বিতীয় দফা ঢলে তাহিরপুর ও দিরাই উপজেলার দুটি হাওরের ফসল ডুবির ঘটনা ঘটে। সরকারি হিসাবে রবিবার পর্যন্ত ৫ হাজার ৫১০ হেক্টর জমির বোরো ফসলের ক্ষতি হয়েছে। বেসরকারি হিসাবে আরও বেশি। সূত্র মতে, ফসলহানীর পরও ৯৮ ভাগ ফসল মাঠে অক্ষত রয়েছে। এদিকে মাঝে মধ্যে প্রখর রোদে আশা জাগালেও মেঘালয় ও চেরাপুঞ্জির বৃষ্টির পানি ধেয়ে এসে হাওরপড়ের মানুষকে কাঁদাচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘এখনকার বৃষ্টি তত ভয়ের নয়। যত ভয় মেঘালয় ও চেরাপুঞ্জির বৃষ্টি।’ রবিবার গুরমা হাওরের আপড় (কান্দা) দিয়ে প্রথমে উপচে পানি ঢুকতে শুরু করে হাওরে। সেখানে ৫০ বছরেরও বেশি বয়সের কয়েকটি হিজল-করচ গাছ উপড়ে পড়ে পানিতে তলিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখে  কৃষি কর্মকর্তারাসহ অনেকেই অবাক হয়েছেন। 

এবার গুরমার হাওরে ১৩টি পিআইসির মাধ্যমে বাঁধের কাজ শুরু হয়। এই বাঁধটিতে নোয়াল, গলগলিয়া, পানা, বলাইচাতল, উলান, জিনারিয়া, মানিকখিলা, গায়েরকিত্তা এবং ধর্মপাশা, মধ্যনগর উপজেলার কলমা ও হুরি বিলের ফসল রক্ষা হয়। হঠাৎ বাঁধের ওপর দিয়ে পানি প্রবেশ করতে দেখে কৃষকসহ সংশ্লিষ্ট সবাই হাজির হন। কিন্তু উপায় না পেয়ে কৃষকেরা পরে বাঁধ ছেড়ে, নিজের আধা-পাকা ধান কেটে আনতে নেমে পড়েন। তারপরও শেষ রক্ষা হয়নি।

কৃষি কর্মকর্তা বলেছেন, গলগলিয়া ও পানা হাওরের ধান ডুবেছে। গুরমার বিশাল ফসলের মাঠ রক্ষার চেষ্টা চলছে। তবে পাঠাবুকা, ভবানীপুর, সন্তোষপুর, মানিকটিলা, রামসিংহপুর, লামাগাঁও, নোয়াগাঁও, বলাইকান্দি, গোলাবাড়ী, জয়পুর, গাঞ্জাইল, মেয়াজ্জেমপুরসহ অসংখ্য গ্রামের কৃষকদের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে। 

হুরামন্দিরা হাওর ডুবেছে

রবিবার রাতে ঢলের তোড়ে দিরাই উপজেলার হুরামন্দিরা হাওরের ৪২ নম্বর পিআইসি বাঁধের সাতবিলা রেগুলেটর সংলগ্ন অংশ ভেঙে যায়। এতে ৩০০ হেক্টর বোরো ধান তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দেয়। সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক বিমল চন্দ্র সোম জানান, এই হাওরে এক হাজার হেক্টর জমি রয়েছে। ৮০ ভাগ ধান কাটা শেষ,বাকিগুলো দ্রুত হারভেস্টার মেশিন দিয়ে কাটা হবে। দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুর রহমান মামুন জানান, হাওরটি দিরাই উপজেলার পঞ্চম বৃহত্তম হাওর। তবে হাওরের বেশিরভাগ ধান কেটে ফেলায় খুব বেশি ক্ষতি হয়নি।’  সব বাঁধে পাহারা দিতে নির্দেশনা দিয়েছে প্রশাসন। 

‘চোখ মেললেই পানি, হায়রে এতো পানি কোথা থেকে আসে’

এদিকে বৈশাখী ফসল বোরো কাটা শুরু হয়েছে। কিন্তু একটার পর একটা বাঁধ ভেঙ্গে ফসলহানীর ঘটনায় হাহাকার চলছে। ফসলহারা মানুষের চোখের পানি আর ঢলের পানি একাকার হচ্ছে। ‘চোখ মেললেই পানি আর পানি। হায়রে কোথা থেকে এতো পানি আসে বুঝিনা,’ আক্ষেপের সুরে তাহিরপুর উপজেলা চেয়ারম্যান করুনা সিন্দু চৌধূরী বাবুল ইত্তেফাককে বলেন,‘ এবার ভাগ্যে কি আছে জানিনা। তবে বাঁধ টিকিয়ে রাখার শেষ চেষ্টা চালিয়ে যাবো।’ তিনি বলেন, ‘ফসলহারা মানুষের সারা বছরের খোরাকি ও ঋণের চিন্তায় অস্থির।’ এখনো বড় বড় হাওরে ধান অক্ষত, শেষ পর্যন্ত যদি এসব হাওরের ধান ঘরে তোলা যায় –তাহলে রক্ষা।’

অফিস চলে এখন হাওরে

দিন-রাত পানি উন্নয়ন বোর্ড, পিআইসি, কৃষি বিভাগ, প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা হাওর থেকে হাওরে ছুটে চলছেন।  নাওয়া খাওয়া বাদ দিয়ে সঙ্গে রয়েছেন কৃষক। নৌকা, স্পিডবোটেই চলছে তাদের অফিস। তারা বাঁধ রক্ষার নির্দেশনা দিচ্ছেন। রাতে ছুটে চলছেন ঢল ঠেকাতে।  এ যেন এক কঠিন পরীক্ষা। ধান কেটে ঘরে তোলার তোড়জুড় শুরু হলেও এ পর্যন্ত দেশীয় জাতসহ মোট ৮ ভাগ ধান পেকেছে। জেলায় রবিবার পর্যন্ত ৫১ হাজার হেক্টরের বোরো ধান কাটা হয়েছে। এবার সুনামগঞ্জ জেলায় ২ লাখ ২২ হাজার হেক্টর চাষ হয়েছে। সব কিছু টিক থাকলে এ জেলা থেকে ১৫ লক্ষাধিক মেট্রিক টন চাল কৃষকের ‘গোলায়’ উঠবে। 

পানি চুইয়ে বাধের অবস্থা খারাপ হয়

সুনামগঞ্জের ১১টি উপজেলার ১ হাজার ৭১৮ কি.মিটার ডুবন্ত বাঁধের ৫৩৭ কিমি ‘হাওর রক্ষা’ বাধ নির্মাণ পুন:নির্মাণ ও ১৩০ টি ক্লোজার বন্ধ করা প্রকল্প হতে নেওয়া হয় ১২২ কোটি টাকায় ব্যয়ে। বাঁধ নির্মাণে ৭২৭ টি পিআইসি (প্রজেক্ট ইমপ্লিমেনটেশন কমিটি) গঠন হয়। কিন্তু ঢল নামতেই এগুলো অবস্থা খারাপ হতে থাকে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী প্রবীর কুমার ঘোস্বামী শনিবার সন্ধ্যায় তাহিরপুরে বরাম হাওর থেকে ইত্তেফাককে বলেন, নদীর পানি চুইয়ে মাটির বাঁধকে নরম করে দেয়। আর পানির চাপে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়। 

বৈশাখী ফসল বোরো ধান এক সময় সিলেট অঞ্চলের কৃষকেরা হেসে-খেলে আনন্দের সঙ্গে কাটা মাড়া দিয়ে ’গোলায়’ তুলতেন। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিগত কয়েক বছর থেকে সেই আনন্দ উদ্বেগে রূপ নিয়েছে। কিন্তু এবারও মাঠ সোনালী হওয়ার আগেই পাহাড়ি ঢলের চাপে কৃষকের ঘুম হারাম হয়।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি