শনিবার, ০২ জুলাই ২০২২, ১৮ আষাঢ় ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

সুদের জন্য বিক্রি হওয়া শিশুসন্তানকে মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিল পুলিশ

আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০২২, ০৮:৪০

অভাবে পড়ে মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নেন এক দিনমজুর নারী। মাসিক আশি শতাংশ সুদে সেই টাকা চক্রবৃদ্ধি হারে পাহাড়সম বোঝা হতে থাকে তার ঘাড়ে। মহাজনের বাড়িতে আয়ার কাজ করেও মন গলাতে পারেননি তিনি। সুদ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় কেড়ে নেওয়া হয় কোলের শিশুসন্তানকেও। অত্যাচারের ভয়ে ওই নারী এ ঘটনা কাউকে জানাতে পারেননি। প্রায় বছরখানেক পর তিনি পুলিশের দ্বারস্থ হন। বিষয়টি জানার সাথে সাথেই অভিযানে নামে পুলিশ, দেড়দিনের মাথায় অন্য এক এলাকা থেকে উদ্ধার হয় শিশুটি। সুস্থ-স্বাভাবিক অবস্থায় তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয় মায়ের কোলে।

সিনেমার গল্পকে হার মানিয়ে দেওয়া, অথচ অমানবিক ও নির্মম এই ঘটনা ঘটেছে নারায়ণগঞ্জে। নারায়ণগঞ্জ তো বটেই, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে এ নিয়ে এখন দেশজুড়েও চলছে আলোচনা। সোমবার (১৮ এপ্রিল) নারায়ণগঞ্জের ক-সার্কেলের (সদর, ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজমুল হাসান রাফি সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন ঘটনাটি।

বছর চারেক আগে ভাগ্যবদলের আশায় পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া থেকে স্বামী হান্নানের সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ আসেন রানী বেগম। আলীগঞ্জ পিডব্লিউডি কলোনিতে সুদের মহাজন আজাদের বাড়িতে ঘর ভাড়া নেন এই দম্পতি। জোটে ইট ভাঙার শ্রমিকের কাজ। অভাবের তাড়না মেটাতে না পেরে দুই বছর আগে বাড়িওয়ালা আজাদের ছোটমেয়ে লাকির কাছ থেকে মাত্র পাঁচ হাজার টাকা ঋণ নেন রানী। সেই ঋণের সুদ মেটাতে সর্বস্বান্ত হয়েছেন, চিরতরে হারাতে বসেছিলেন শিশুসন্তানকেও। সুদের পাওনা টাকা না পেয়ে লাকি বেগম তাদের শিশুসন্তানকে অন্যত্র বিক্রি করে দেয়। অবশেষে পুলিশ শিশুটিকে উদ্ধার করে মায়ের কোলে ফিরিয়ে এনেছে।

জানা যায়, লাকির কাছ থেকে নেওয়া ঋণের শর্ত ছিল, প্রতিমাসে ৮০ শতাংশ হারে সুদ দিতে হবে। অর্থাৎ পাঁচ হাজার টাকা ঋণের জন্য একমাসের সুদ দাঁড়ায় চার হাজার টাকা। ঋণ শোধ না করতে পারলে সুদ বাড়বে চক্রবৃদ্ধি হারে। এদিকে ইট ভাঙার কাজ করতে করতেই রানী সন্তানসম্ভবা হন। পরে লাকির বাড়িতেই কাজ নিয়ে ঋণ শোধ শোধ করার চেষ্টা করেন তিনি, কিন্তু এতে সন্তুষ্ট ছিল না লাকি। নানা ছলচাতুরীতে একসময় রানীর সদ্যভূমিষ্ট সন্তানকে কেড়ে নিয়ে ৬৫ হাজার টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে দেয় সে। অত্যাচার আর ভয়ভীতি দেখিয়ে রানীকেও আটকে রাখে, যেন ঘটনাটি কেউ না জানতে পারে। এদিকে স্ত্রীর ঋণের বোঝা শোধ না হওয়ায় মারধরের ভয়ে পালিয়ে যান স্বামী হান্নান।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজমুল হাসান রাফি ইত্তেফাককে বলেন, 'সুদের ঋণের টাকা আদায়ের জন্যে মানুষ কতোটা নির্মম হতে পারে, এটি তার উদাহরণ। ঘটনাটি প্রচণ্ড নির্মম, অমানবিক। বাস্তবে এমনটা ঘটেছে, এটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।'

পিডব্লিউডি কলোনির বাসিন্দারা জানান, আরও অনেকেই রানীর মতো করে সুদ পরিশোধ করতে করতে সর্বস্বান্ত হয়েছে। সুদের মহাজন আজাদ, মেয়ে লাকি ও মেয়ের জামাই হযরত আলী কলোনির ভেতরে প্রভাবশালী। হযরত আলী কাজ করেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দৈনিক মজুরিভিত্তিক পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে, সকলে জানেন সে ক্ষমতাবান সরকারি চাকরিজীবী। অপরদিকে যারা কলোনিতে ভাড়া থাকেন তারা সকলেই নিম্নআয়ের মানুষ হওয়ায় এদের অন্যায়ের প্রতিবাদ করার সাহস পান না। মাত্র পাঁচ হাজার টাকা ঋণ নিয়েও লাখ টাকা সুদের বোঝা মাথায় চেপেছে অনেকের। সেই টাকা পরিশোধ করতে না পারলে আজাদ ও হযরত আলী মারধর করেছে— এমন অভিযোগও আছে। তবে সুদ আদায়ের জন্য অত্যাচারের ঘটনা আগে ঘটলেও সন্তান বিক্রি করে দেওয়ার বিষয়টি কারোর জানা ছিল না।

ভুক্তভোগী রানী জানান, নারায়ণগঞ্জ শহরে তার পরিচিত কেউ নেই। এই সুযোগে লাকি বেগম ও তার স্বামী হযরত আলী ঋণ বাবদ কাগজে সই রেখেছে। সেই কাগজ দেখিয়েই উল্টো মামলার ভয় দেখিয়েছে তারা। এই ভয়ে সন্তান হাতছাড়া হওয়ার পরও তিনি পুলিশের কাছে যেতে পারেন নি। মাত্র পাঁচ হাজার টাকা ঋণের সুদ হিসাবে এ পর্যন্ত দুই লাখ ১০ হাজার টাকা পরিশোধ করেছেন তিনি। আরও ১ লাখ ৩ হাজার টাকা পাওনা দাবি করেছে লাকি। সেই টাকা শোধ করতে না পারায় এক বছর আগে জন্ম নেওয়া তার একদিন বয়সী নবজাতককে তার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়।

সংবাদ সম্মেলনে ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজমুল হাসান রাফি। সঙ্গে রানী বেগম। ছবি: সংগৃহীত

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজমুল হাসান রাফি ইত্তেফাককে বলেন, 'সুদের ঋণের টাকা আদায়ের জন্যে মানুষ কতোটা নির্মম হতে পারে, এটি তার উদাহরণ। ঘটনাটি প্রচণ্ড নির্মম, অমানবিক। বাস্তবে এমনটা ঘটেছে, এটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।'

তিনি বলেন, 'সচেতন মানুষদের পরামর্শে পুলিশের কাছে আসেন নিজের গর্ভজাত সন্তান হারিয়ে ফেলা মা রানী বেগম। ঘটনাটি শুনে পুলিশ সুপার স্যারকে জানাই। তিনি এটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখার নির্দেশ দেন। অভিযোগ পাওয়ার ৩৬ ঘন্টার মধ্যেই পাশের জেলা মুন্সীগঞ্জ থেকে সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করা হয় ফুটফুটে শিশুটিকে। তাকে মায়ের কোলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অভিযুক্ত লাকি বেগম সহ ২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।'

ভুক্তভোগী রানী জানান, নারায়ণগঞ্জ শহরে তার পরিচিত কেউ নেই। এই সুযোগে লাকি বেগম ও তার স্বামী হযরত আলী ঋণ বাবদ কাগজে সই রেখেছে। সেই কাগজ দেখিয়েই উল্টো মামলার ভয় দেখিয়েছে তারা। এই ভয়ে সন্তান হাতছাড়া হওয়ার পরও তিনি পুলিশের কাছে যেতে পারেন নি। মাত্র পাঁচ হাজার টাকা ঋণের সুদ হিসাবে এ পর্যন্ত দুই লাখ ১০ হাজার টাকা পরিশোধ করেছেন তিনি।

এদিকে লাকি বেগমকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। সোমবার (১৮ এপ্রিল) নারায়ণগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কাজী মোহাম্মদ মোহসেনের আদালত লাকি বেগমের এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। পাশাপাশি শিশুটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে তার মায়ের জিম্মায় ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। এর আগে রোববার (১৭ এপ্রিল) মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর থেকে বিক্রি করে দেওয়া শিশুটিকে উদ্ধার করে ফতুল্লা থানা–পুলিশ। সোমবার গ্রেফতারকৃতদের আদালতে হাজির করা হয়।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজমুল হাসান রাফি ইত্তেফাককে বলেন, রানীর অভিযোগ পেয়ে তদন্ত নেমে নিজস্ব সোর্স ও তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে শনিবার (১৬ এপ্রিল) রাত সাড়ে ১১টার দিকে মুন্সিগঞ্জ জেলার শ্রীনগর থানার দক্ষিণ পাশা গ্রামে অভিযান চালিয়ে বাচ্চাটিকে উদ্ধারসহ আটক করা হয়েছে রানু বেগম নামের এক নারীকে। ওই নারী শিশুটিকে কিনে নিয়েছিলেন। সেসময় পিডব্লিউডি কলোনিতে লাকিকে পাওয়া না গেলেও তার মা, বাবা ও এক প্রতিবেশীকে আটক করে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়।

সোমবার (১৮ এপ্রিল) নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের ক-সার্কেল কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে পুরো ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজমুল হাসান রাফি। এসময় পুলিশ পরিদর্শক তারিকুল ইসলাম ও কাজী মাসুদ সহ ভুক্তভোগী রানী বেগম উপস্থিত ছিলেন। সুদের জালে আটকা পড়ে নিজের সন্তানকে হারানোর কথা বলতে গিয়ে কাঁদেন রানী। তিনি বলেন, দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে তাকে সর্বস্বান্ত করে দেয়া হয়েছে। গর্ভে সন্তান আসার পর সন্তান পেটে নিয়েই কাজ করেছেন। সন্তান জন্মের পর তাকে না জানিয়েই অচেনা কোনো এক জায়গায় বিক্রি করে দেওয়া হয়। সন্তানসহ কাজ করতে নাকি অসুবিধা হবে, তাই মহাজনের মেয়ে তার সন্তানকে বিক্রি করে দেয়। 

রানী বাদী হয়ে মানবপাচার আইনে ফতুল্লা থানায় একটি মামলা করেছেন। অন্যদিকে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে লাকির বাবা ও সুদের মহাজন হিসেবে পরিচিত আজাদ বলেন, তারা কোনো সুদের কারবার করেন না। এগুলো তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। তবে তার মেয়ে সুদে টাকা দিয়েছেন বলে স্বীকার করেন তিনি। তবে বাচ্চা বিক্রি করে সুদের টাকা আদায়ের বিষয়টি তার জানা নেই বলেও দাবি করেন তিনি।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজমুল হাসান রাফি বলেন, পুলিশ সবসময়ই মানুষের বন্ধু। সুদের বোঝায় জর্জরিত আর সন্তানকে হারিয়ে অসহায় রীনা বেগম আমাদের কাছে প্রায় এক বছর পর এসেছেন। তবু আমরা দ্রুতসময়ে তার সন্তানকে উদ্ধার করতে পেরেছি। শিশুটিকে মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিতে পেরে আমরা আনন্দিত।

এর আগে ফতুল্লা থানায় শিশুটিকে তার মা রীনা বেগমের কাছে তুলে দিতে গেলে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। শিশুটিকে 'কিনে নেওয়া' রানু বেগমও বুক চাপড়ে বিলাপ করতে থাকেন। এক বছর ধরে সন্তানের স্নেহে বড় করা শিশুটিকে কোন উপায়ে নিজের কাছে রাখা যাবে, তা জানতে বিভিন্নজনকে প্রশ্ন করতে থাকেন। নিজের সন্তানকে কাছে ফিরে পেয়ে রানীও কান্নায় ভেঙে পড়েন।

একবছর ধরে লালনপালন করা শিশুটিকে ফিরিয়ে দিতে হবে, তাই বিলাপ করে কাঁদছেন রানু বেগম। পাশে জন্মদাতা মা রানী বেগমের কোলে শিশুটি। ছবি: সংগৃহীত

রানু বেগম জানান, এক মেয়ে ও এক ছেলের মা তিনি। তার ১০ বছর বয়সী একমাত্র ছেলে বুদ্ধি ও শারীরিক প্রতিবন্ধী। বেশ কয়েক বছর ধরে একটি সন্তান দত্তক নিতে চাচ্ছিলেন। করোনা মহামারীর সময় হঠাৎ জানতে পারেন একটি শিশুসন্তান বিক্রি হবে। তিনি টাকার বিনিময়ে লাকির কাছ থেকে বাচ্চাটিকে কিনে নেন। নিজের সন্তানের মতো করেই যত্ন করে তিনি তাকে লালনপালন করেছেন। নাম রাখেন ইউসুফ। এদিকে নাড়িছেঁড়া ধনকে ফিরে পেয়ে খুশি রানী। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, তার বিশ্বাস ছিল একদিন ছেলেকে ফিরে পাবেন।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজমুল হাসান রাফি বলেন, পুলিশ সবসময়ই মানুষের বন্ধু। সুদের বোঝায় জর্জরিত আর সন্তানকে হারিয়ে অসহায় রীনা বেগম আমাদের কাছে প্রায় এক বছর পর এসেছেন। তবু আমরা দ্রুতসময়ে তার সন্তানকে উদ্ধার করতে পেরেছি। শিশুটিকে মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিতে পেরে আমরা আনন্দিত। পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে অনেক কাজই মানসিক শান্তি ও আনন্দের খোরাক যোগায়। এই ঘটনার ফলাফল এমনই ছিল আমাদের জন্য।

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

পাগলা মসজিদের দানবাক্সে এবার মিললো ১৭ বস্তা টাকা

রাণীনগরে স্কুলছাত্রী ধর্ষণের অভিযোগে মামলা

কুড়িগ্রামে উপজেলা চেয়ারম্যান গ্রেফতার

রংপুরের করোনা পরীক্ষার মেশিন নষ্ট, ৪ জেলায় ভোগান্তি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

একই স্থানে বিএনপি- আওয়ামী লীগের কর্মসূচি, ১৪৪ ধারা জারি

স্ত্রী ছেড়ে চলে যাওয়ায় স্বামীর ‘আত্মহত্যা’!

কুড়িগ্রামে ১২৭ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি বন্যায়  

নজর কাড়ছে ৩৫ মণ ওজনের ‘সুলতান’