রোববার, ০৩ জুলাই ২০২২, ১৮ আষাঢ় ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

অমলার যুদ্ধ 

আপডেট : ২২ এপ্রিল ২০২২, ০৬:২৬

শরীয়তপুরে মনোহর বাজারে একদিনে পাকহানাদার বাহিনী ৩৬০ জন নিরীহ মানুষকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে। মৃত্যু আতঙ্কে, জীবন বাঁচাতে মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটছে। বাবা-মা ছয় মাস বয়সি অসুস্হ অমলাকে নিয়ে ভারতে যাবার কথা ভাবতে পারছে না। অবশেষে প্রতিবেশী এক মুসলিম পরিবারে অমলা এবং সত্তর বছর বয়সি ঠাকুরমাকে রেখে অমলার বাবা-মা, ভাইবোন ভারতে আশ্রয় নেয়। রাহেলা বেগমের কোলে তিন মাস বয়সি আজিজ। অমলা আর আজিজ দুইজন রাহেলার বুকের দুধ ভাগাভাগি করে খেত।

চিকিত্সাসেবা-যত্নে অসুস্হ অমলা সুস্হ হয়ে উঠল। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর স্বাধীন দেশের মাটিতে অমলার বাবা-মা, ভাইবোন, আত্মীয়স্বজন ফিরে এলো।

অমলাকে রাহেলার কোল থেকে কেউ নিতে চাইলে চিত্কার করে কেঁদে উঠত। অমলা নিজের মায়ের কোলেও যেতে চাচ্ছে না। একবার জোর করে অমলাকে বাড়ি নিয়ে গেলে জ্বর ওঠে, বমি করে অবস্হা খারাপ হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে অমলাকে আজিজের মায়ের কাছে রেখে আসে। আজিজের মা-বাবা দুজনেই অমলার জন্য পাগল। দুই বাড়ির আদর-যত্নে অমলা বড় হয়ে ওঠে। পাঁচ বছর বয়সে অমলা আপন মায়ের কাছে ফিরে যায়।

একই স্কুলে একেই ক্লাসে অমলা আর আজিজ দুই ভাইবোন ভর্তি হলো। স্কুলের পাশেই আজিজদের বাড়ি। অমলাদের বাড়ি কিছুটা দূরে। স্কুল ছুটি হলেই অমলা আজিজদের বাড়ি যায়। আজিজের মাকে অমলা মা বলেই ডাকে। কোনো কোনো দিন অমলার বাবা কিংবা ভাই আসে অমলাকে নিতে। অমলা কোনো দিন যায়, কোনো দিন যায় না।

ক্লাসের ছেলেমেয়েরা অমলাকে বলে, তোর অনেক ভাগ্য, দুইটা মা! দুর্গাপূজার সময় আজিজের বাবা অমলার জন্য নতুন জামা-কাপড় কিনে দেন, আবার অমলার বাবা ঈদের সময় আজিজের জন্য নতুন জামা-কাপড় কিনে দেন। বড় ক্লাসে পড়ার সময় সহপাঠীরা মাঝেমধ্যে অমলাকে বলত, তুই কি হিন্দু নাকি মুসলমান?

অমলা হাসতে হাসতে বলত, জানি না! তবে আমি আর আজিজ একই মায়ের দুধ ভাগাভাগি করে খেয়েছি!

এসব কথা আর বাড়ে না, হাসি-ঠাট্টা করে শেষ হয়ে যায়। বাবা মারা যাবার পর আজিজ লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে সংসারের হাল ধরেছে।

অমলা উচ্চশিক্ষা শেষে ভালো বেতনে চাকরি করে। প্রতিবার ভাইফোঁটার দিন আজিজ অমলার জন্য একটা শাড়ি কিনে নিয়ে যায়। অমলা আজিজের পরিবারের সদস্যদের জন্য নতুন জামা-কাপড় উপহার দেয়। কাছে বসে ভাইকে নানা পদের খাবার খেতে দেয়। মায়ের জন্যও আলাদা করে খাবার পাঠিয়ে দেয়। আজিজকে মনে মনে ভাইফোঁটা দেয় এবং ঠাকুরের কাছে ভাইয়ের দীর্ঘায়ু কামনা করে প্রার্থনা করে।

বিদায়বেলায় অমলা ভাইয়ের পিছন পিছন রাস্তা পর্যন্ত আসে। ভাইকে বারবার মনে করিয়ে দেয় যেন মায়ের খোঁজখবর ঠিকমতো রাখে।

আজিজের সংসারে অভাব-অনটন দিন দিন বাড়ছে। জমিতে ফসল বুনে তেমন একটা লাভ হয় না। ফসল উত্পাদনের খরচ বাড়ছে আবার ফসল বিক্রির সময় দামও পাওয়া যায় না। ঋণের জালে আটকা পড়েছে আজিজ। দায়মুক্ত করতে অমলা বেশ কয়েকবার টাকা-পয়সা দিয়েছিল আজিজকে, কিন্তু কোনো ফল হয়নি।

অমলা নিজের মাকে প্রতি মাসে ভরণপোষণের জন্য টাকা-পয়সা দেয় আবার আজিজের মাকেও দেয়। যে টাকা এই দুই মায়ের জন্য দেয় সেগুলো ওষুধ কিনতেই শেষ হয়ে যায়। দুই মায়ের শরীর দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। অসুখ একটার পর একটা লেগেই আছে। প্রতিবেশীদের কয়েকজন আজিজের মাকে বলেছে, হিন্দু মেয়ের সাহায্য নিলে আপনার ইবাদত-বন্দেগি হবে না।

আজিজের মা এসব কথা কানে তোলেন না। কারণ তিনি একাত্তর সালে তীব্র সমালোচনার মুখে অমলাকে বুকের দুধ দিয়েছেন এবং অসুস্হ ঠাকুরমাকে নিজ হাতে সেবা-শুশ্রূষা করেছেন। তিনি আজিজ-অমলার মধ্যে পার্থক্য খুঁজে দেখতে চাননি, দেখেছেন সন্তান হিসেবে। একদিন রাত দশটার দিকে অমলা ফোন পেল আজিজের মা গুরুতর অসুস্হ হয়ে পড়েছেন। স্বামী অনিলকে নিয়ে অমলা ছুটে গেল আজিজদের বাড়িতে। মাকে সদর হাসপাতালে এনে ভর্তি করে দিল। সপ্তাহখানেক পর কিছুটা সুস্হ হলে মাকে নিজের বাসায় নিয়ে এলো। এদিকে অমলার আপন মাও মারাত্মকভাবে অসুস্হ হয়ে পড়েন। তাঁকেও বাসায় নিয়ে এলো। দুই দিকে ছুটোছুটি করা ৫২ বছর বয়সি অমলার জন্য অনেক কষ্টকর।

অমলার ছেলেমেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়া শেষে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করেছে। তারা এসেছে দুই দিদিমার অসুস্হতার সংবাদ শুনে।

আজিজের মায়ের নামে চল্লিশ শতক ধানের জমি আছে। এটা তিনি তাঁর পিতার কাছ থেকে পেয়েছেন। সেই জমিটুকু অমলাকে দানপত্র করে দিতে চান। অমলা কিছুতেই নিতে রাজি হচ্ছে না।

ক’দিন ধরে অমলাকে আজিজ সুপারিশ করছে মাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে। অমলা বলছে, মা তো যেতে চায় না। তুমি বুঝিয়ে নিতে পারলে নিয়ে যাও।

আজিজ মায়ের হাত ধরে পাশে বসে বলল, মা তুমি বাড়ি চল। পরের বাড়িতে আর কতদিন থাকবে!

আজিজের মা শান্ত কণ্ঠে বললেন, আমি অমলার হাতে মরব।

অমলা আড়ালে দাঁড়িয়ে মায়ের কথা শুনে অঝোরে কাঁদছে।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

আদল

বাংলাদেশপ্রেমিক একজন কবি

পুরস্কার ও তিরস্কারময় জীবন

পাশের সিটের মেয়েটি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

গ্রেট মাইন্ড থিংক অ্যালাইক

রামমোহন ও উপমহাদেশে পারস্যচর্চা

মায়ের ঘ্রাণ

আষাঢ়স্য প্রথম দিবস