যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে সংকটে পড়বে বাংলাদেশের রপ্তানি

আপডেট : ২৩ এপ্রিল ২০২২, ০১:২১

বন্দরে কনটেইনার স্ক্যানিং-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য সংকটের মুখে পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপে কালো তালিকাভুক্ত একটি কোম্পানির কাছ থেকে এসব স্ক্যানিং মেশিন সংগ্রহ করার কারণে এ সংকট তৈরি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এর আগে নিষিদ্ধ ঐ কোম্পানি থেকে স্ক্যানিং মেশিন সংগ্রহ করে বাংলাদেশ। এবারও একই উত্স থেকে চট্টগ্রাম বন্দর কতৃ‌র্পক্ষ সংশ্লিষ্ট মেশিনগুলো সংগ্রহের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করেছে বলে জানা গেছে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য রপ্তানি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপে হয়ে থাকে। ইন্টারন্যাশনাল শিপ অ্যান্ড পোর্ট ফ্যাসিলিটি সিকিউরিটি কোড প্রতিপালন করতে গেলে রপ্তানিযোগ্য কনটেইনারগুলো স্ক্যানিং করা বাধ্যতামূলক।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে মোট সাতটি স্ক্যানার মেশিন রয়েছে। এসব মেশিন সরবরাহ করেছে চীনা কোম্পানি নাকটেক কোম্পানি লি.। কিন্তু এ কোম্পানিটিকে অনেক দেশ কালো তালিকাভুক্ত করেছে দেশগুলোর সরকার। বিভিন্ন ধরনের তথ্য পাচার এবং অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার কারণে এ ব্যবস্হা নেওয়া হয়।

যুক্তরাষ্ট্র সরকার বলেছে, কোম্পানিটি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা এবং বৈদেশিক নীতির জন্য ক্ষতিকর। মালয়েশিয়ান সরকারও নানটেক কোম্পানি লি.কে ১০ বছর আগে সেদেশে নিষিদ্ধ করে।

ইয়াহু নিউজে প্রকাশিত এক রিপোর্টে জানা যায়, কেলাং টার্মিনালে কনটেইনার স্ক্যানিংয়ের জন্য সেখানকার পোর্ট অথরিটি নানটেক থেকে একটি মেশিন বসায়। এ মেশিনটি প্রতি মাসে ১০ বার নষ্ট হয়েছে। এছাড়া মেশিনটির রক্ষণাবেক্ষণ চার্জও অনেক বেশি। এরপর ২০১১ সালে রয়্যাল মালয়েশিয়ান কাস্টমস ডিপার্টমেন্ট সংশ্লিষ্ট কোম্পানি থেকে স্ক্যানিং মেশিন না কেনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

এছাড়া ব্রিটেনের টেলিগ্রাফ পত্রিকায় প্রকাশিত এক রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, নানটেকের বিরুদ্ধে নামিবিয়ায় একটি দুর্নীতির অভিযোগ উঠে। দেশটির দুর্নীতি দমন কমিশন অভিযোগটির তদন্ত করে সত্যতা পায়। কোম্পানিটির বিরুদ্ধে একই অভিযোগ তাইওয়ান এবং ফিলিপাইনেও উঠেছে এবং সেগুলো প্রমাণিত হয়েছে।

এরই মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর কতৃ‌র্পক্ষ বন্দরে আরো দুটি কনটেইনার স্ক্যানিং মেশিন কেনার উদ্যোগ নিয়েছে। এ দুটি মেশিন কেনার জন্য বন্দর কতৃ‌র্পক্ষ এমন কিছু শর্তারোপ করেছে যাতে সুনির্দিষ্ট একটি কোম্পানি ছাড়া আর কেউ অংশগ্রহণ করতে না পারে। এসব বিষয়ে বিভিন্ন মহল থেকে আপত্তি তোলা হলেও কতৃ‌র্পক্ষ তাতে কান দেয়নি। সংশ্লিষ্টরা এ বিষয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের কাছে তাদের অভিযোগ দায়ের করেছে।

অভিযোগে জানা যায়, স্ক্যানিং মেশিন কেনার জন্য কতৃ‌র্পক্ষ বেশ তাড়াহুড়া করেছে। বিশেষ করে করোনা, রমজান এবং ঈদের কারণে প্রস্তাব দেওয়া অনেকের জন্য দুরূহ হবে। এছাড়া সরবরাহকারীদের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়েছে ১০ বছর। কিন্তু আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী এইটি তিন থেকে পাঁচ বছর হবার কথা। সুনির্দিষ্ট কোম্পানিকে সুবিধা দিতে এটি করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।

এদিকে বন্দরের জন্য দুটি কনটেইনার স্ক্যানিং মেশিন কিনতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজ ২০১৮ সালে প্রস্তাব আহ্বান করেছিল। তা নিয়েও এখনো জটিলতা কাটেনি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, কাস্টমস হাউজ কতৃ‌র্পক্ষ এ মেশিনগুলো সরবরাহের জন্য নাকটেক কোম্পানি লি.কে মনোনীত করলে তা শেষ পর্যন্ত আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। বাজারমূল্যের চাইতে প্রায় দেড় শ কোটি টাকা বেশি দামে মেশিনগুলো কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এ বিষয়ে সুদৃষ্টি চেয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স হেলেন লা-ফেব এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রাহমাতুল মুমিনকে চিঠি দিয়েছিলেন।

জানা গেছে, ঐ দুটি স্ক্যানার মেশিন কেনার প্রক্রিয়ায় কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান যুক্ত থাকার কথা ছিল না। এমনকি যৌথ উদ্যোগও এখানে নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু নাকটেক কোম্পানি লি. সরাসরি ঐ প্রক্রিয়ার মধ্যে যুক্ত হয়ে যায়। ২০১৯ সালেও এনবিআর ১৪টি স্ক্যানার মেশিন ক্রয়ের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু এখানেও নিউটাক কোম্পানিকে সরবরাহের কাজ দিতে একটি পক্ষ মরিয়া হয়ে উঠে। শেষ পর্যন্ত আপত্তির মুখে ঐ প্রক্রিয়া বাতিল করা হয়।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিষিদ্ধ নানটেক কোম্পানি লি. থেকে স্ক্যানার মেশিন সংগ্রহ করা হলে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য হুমকির মুখে পড়বে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, যে কোম্পানিটি তাদের দেশে নিষিদ্ধ হয়েছে সেটি থেকে স্ক্যানার কেনা হলে সে স্ক্যানিং রিপোর্ট অনেকাংশে গ্রহণযোগ্য হবে না। সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ে কাজ করছেন।

তিনি এ বিষয়ে ইত্তেফাককে বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত বলে আমাদের অবশ্যই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে চলতে হবে। আজকের দিনে কম্পÏায়েন্স ইসু্য অনেক বড়।

তিনি বলেন, আমাদের রপ্তানি এবং আমদানি পণ্য কাদের দিয়ে স্ক্যানিং করাচ্ছি সেটা গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড না মেনে কাজ করার কারণে আমাদের ইমেজের যদি কোনো ব্যত্যয় ঘটে তাহলে সুনামের ঘাটতি হবে।

গোলাম মোয়াজ্জেম আরো বলেন, এমন নয় যে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মোটামুটি সুনাম রয়েছে—এ ধরনের কোম্পানির অভাব রয়েছে। যেসব কোম্পানির বিরুদ্ধে অভিযোগ নেই তাদের আমরা এসব কাজে জড়াতে পারি।

ইত্তেফাক/বিএএফ