টঙ্গীবাজারের ‘লোটো’ ব্র্যান্ডের আউটলেটের সামনে বড় করে বিজ্ঞাপন দেওয়া, কোনো কোনো পণ্যে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ডিসকাউন্ট। কিন্তু গতকাল জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর যখন এই আউটলেটে অভিযান চালায় তখন তারা একটি পণ্যও দেখাতে পারেনি, যেখানে ৮০ শতাংশ ডিসকাউন্ট (মূল্য হ্রাস) দেওয়া হচ্ছে। এই বাজারেরই সফুরা মার্কেটের তানিশা ও জান্নাত এন্টারপ্রাইজে দেদার বিক্রি হচ্ছে অনুমোদনহীন নকল কসমেটিক্স।
এছাড়া পণ্যের গায়ে দামের আগের স্টিকার তুলে বেশি দাম লিখে নতুন স্টিকার বসিয়ে অতিরিক্ত দামে তা বিক্রিসহ নানাভাবে প্রতারিত করা হচ্ছে ভোক্তাদের। ঈদকে সামনে রেখে এক শ্রেণির অসৎ ব্যবসায়ী যেন ক্রেতাদের ঠকাতে প্রতারণার জাল পেতেছে। এসব অসৎ ব্যবসায়ীর কাছে ভোক্তারা রীতিমতো জিম্মি হয়ে পড়েছেন।
গতকাল শনিবার রাজধানীর উত্তরা, কাওরানবাজার, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী ও টঙ্গীর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে নানা অনিয়ম ও প্রতারণার চিত্র উঠে আসে। বিভিন্ন অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা ও সতর্ক করা হয়। টঙ্গীতে অভিযানে ভোক্তা অধিকার জান্নাত ও তানিশা এন্টারপ্রাইজে গিয়ে দেখতে পায়, প্রতিষ্ঠান দুটিতে অনুমোদনহীন বিভিন্ন নকল কসমেটিক্স বিক্রি করা হচ্ছে। এসব কসমেটিক্সের গায়ে মূল্য, এমনকি মেয়াদোত্তীর্ণ তারিখও লেখা নেই। পরে প্রতিষ্ঠান দুটিকে ৫ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়।
এ সময় সেখানে উপস্থিত এই মার্কেটের ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মতিউর রহমান বলেন, অনুমোদনহীন কসমেটিক্স বিক্রি করা তাদের ঠিক হয়নি। এই সফুরা মার্কেটে যেন আর নকল, অনুমোদনহীন কোনো কসমেটিক্স বিক্রি করা না হয়, সে বিষয়টি তিনি দেখবেন। এই মার্কেটেরই পাশে লোটো ব্র্যান্ডের আউটলেটে গিয়ে দেখা যায়, সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ মূল্য ছাড় দেওয়া হবে বলে বিজ্ঞাপনে লেখা রয়েছে। কিন্তু কোন পণ্যে ৮০ শতাংশ মূল্য ছাড় দিয়েছে তা তারা দেখাতে পারেনি। তাহলে কেন এমন বিজ্ঞাপন দেওয়া? ভোক্তা অধিকার অভিযান টিমের এ প্রশ্নের কোনো জবাব দিতে পারেনি এই আউটলেটের ম্যানেজার রাসেল মিয়া। পরে বিজ্ঞাপন সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়ে তাদের সতর্ক করা হয়।
সরকার এলপি গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ করে দিলেও বেশি দামে তা বিক্রি করছে টঙ্গীর মেসার্স পাটোয়ারি এন্টারপ্রাইজ। পরে এই প্রতিষ্ঠানকে বেশি দামে এলপি গ্যাস বিক্রির অপরাধে ভোক্তা অধিকারের টিম ৫ হাজার টাকা জরিমানা করে। নোংরা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার তৈরি ও সংরক্ষণের অপরাধে রাজধানীর আব্দুল্লাহপুরের জলখাবার বিরিয়ানি হাউজকে ৫ হাজার টাকা ও হাজী বাংলা খাবার হোটেলকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এরমধ্যে জলখাবারের রান্না ঘরে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ইঁদুর মরে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে।
পরে আব্দুল্লাহপুরের বিভিন্ন বাস কাউন্টারে অভিযান চালানো হয়। দেখা যায়, বেশি দামে টিকিট বিক্রি না হলেও বেশির ভাগ বাসেরই অগ্রিম টিকিট নেই। অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু না হতেই কীভাবে শেষ হয়ে গেল এই প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে পারেনি বাস কাউন্টারগুলোর ম্যানেজাররা।
এ প্রসঙ্গে উত্তরা ও টঙ্গী এলাকার অভিযানে নেতৃত্বদানকারী ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ঢাকা জেলার অফিসপ্রধান মো. আব্দুল জব্বার মণ্ডল ইত্তেফাককে বলেন, মানুষ নানাভাবে প্রতারিত হচ্ছে। এজন্য মানুষকে সচেতন হতে হবে।
তিনি বলেন, আমরা অভিযানে এখন মূলত গণপরিবহনকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। মানুষ ঈদে বাড়ি যাচ্ছে, কেউ বাড়তি টাকা টিকিটের মূল্য হিসেবে নিচ্ছে কি না, এ বিষয়টি দেখা হচ্ছে।
তিনি বলেন, বাস কাউন্টারগুলোর পাশাপাশি আমরা বিভিন্ন কাপড়, জুতার শোরুমেও তদারকি করছি। গতকাল উত্তরার ইনফিনিটি, বাটাসহ নামিদামি শোরুমে তদারকি করা হয় বলে তিনি জানান।
এদিকে ঈদকে উপলক্ষ্য করে মোহাম্মদপুর টাউনহল বাজারের মাংস ব্যবসায়ীরা প্রতি কেজি মাংসে ৫০ টাকা দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। গতকাল অভিযানের সময় গরুর মাংস ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে হ্যান্ড মাইকে ভোক্তা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ফাহমিনা আক্তার বলেন, গরুর মাংসের কেজি কেন ৭০০ টাকা? ৬৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করতে হবে। ভোক্তাদের কাছ থেকে কোনোভাবেই দাম বেশি রাখা যাবে না। এছাড়া মহিষের মাংস গরুর মাংস বলে এবং ছাগলের মাংস খাসির মাংস বলে চালানো যাবে না। ওজনে কম দেওয়া যাবে না। অন্যথায় আইনের আওতায় আনা হবে।
মোহাম্মদপুরের টাউন হল বাজারের পাশাপাশি টোকিও স্কয়ার শপিং মল ও শ্যামলী এলাকার বাস কাউন্টারগুলোতে অভিযান চালায় ভোক্তা অধিদপ্তর। এই অভিযান দলের নেতৃত্ব দেন ভোক্তা অধিদপ্তরের পরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার। অভিযানের বিষয়ে তিনি বলেন, বিভিন্ন অপরাধে এখানে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, কোনো পণ্য বা সেবা ক্রয়ে কেউ প্রতারিত হলে অথবা বাসের টিকিট ক্রয়ের সময় বেশি ভাড়া নিলে ভোক্তা হটলাইন ১৬১২১ নাম্বারে জানাতে অনুরোধ জানানো হলো।
মনজুর বলেন, ভোক্তারা এসব বিষয়ে এখন আগের থেকে অনেক বেশি সচেতন। আগে ভোক্তারা শুধু পানির দাম নিয়ে অভিযোগ জানাতেন, এখন বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তারা অভিযোগ করছেন। আমরা সেসব অভিযোগ আমলে নিয়ে দ্রুত সমাধান করছি। যেসব ব্যবসায়ী ভোক্তাদের সঙ্গে প্রতারণা করেন, আইন মেনে ব্যবসা করেন না তাদের বিরুদ্ধে শুধু জরিমানা নয়, ঈদের পর থেকে মামলা করা হবে। অপরাধীকে কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না।
