দুই দলের খেলোয়াড়েরা খেলছে মাঠে। এই একই ম্যাচ তৃতীয় আরেকটি পক্ষ খেলছে মাঠের বাইরে অনলাইনে। ধরা যাক ভারতের মাটিতে ক্রিকেট খেলা হচ্ছে। সেই খেলার আরেকটি সংস্করণ হচ্ছে অনলাইনে।
ভারতে খেলা হলেও অনলাইনে বাজিতে কোটি কোটি টাকা ওড়ে বাংলাদেশে। অথবা ধরা যাক ফুটবল খেলা হচ্ছে স্পেনে। সেই খেলাকে কেন্দ্র করে অনলাইনে বাজিতে কোটি টাকা লগ্নি হচ্ছে বাংলাদেশে। এভাবে একেকটি ম্যাচ ঘিরে শত কোটি টাকার বাণিজ্য হচ্ছে। আর অনলাইন জুয়াড়িদের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে লাখ লাখ মানুষ নিঃস্ব হচ্ছে।
বিশ্বকাপ ক্রিকেট, ফুটবল, জাতীয় লিগ, ইউরো কাপ, উয়েফা, স্পেনিশ লিগ, কোপা আমেরিকা, ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ-আইপিএল, বিপিএল—এসব খেলায় বিনোদন খোঁজেন দর্শক। তবে এই খেলা এখন আর শুধু আনন্দ-বিনোদনের মাধ্যম নয়, এমন একেকটি আসরকে অবৈধ আয়ের উপলক্ষ্য বানিয়ে নিয়েছেন কেউ কেউ।
বছর পাঁচেক আগেও অনলাইন বাজি ছিল এ দেশের মুষ্টিমেয় মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এখন সারা দেশের প্রায় প্রতিটি শ্রেণি-পেশার অনেক মানুষকে অনলাইনে বাজিতে বুঁদ হয়ে থাকার তথ্য মিলেছে। ফুটপাতের চা-দোকানি থেকে শুরু করে সেলুন দোকানদার, হকার, বাড়ির নিরাপত্তাপ্রহরী, বিক্রয়কর্মী থেকে শুরু করে ভবঘুরে, বাস-ট্রাকের চালক-হেলপার, সিএনজিচালক, নির্মাণশ্রমিক, গৃহপরিচারিকা, রিকশাচালক ও দিনমজুর শ্রেণির মতো একেবারে নিম্ন আয়ের মানুষ এখন দিনের একটা সময় অনলাইনে বাজি ধরতেই ব্যস্ত থাকে।
১ হাজার থেকে শুরু করে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত এই শ্রেণির মানুষ বাজি ধরে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তো রয়েছেই, স্কুলের নবম-দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরাও অনলাইনে বাজি ধরতে বেশ পটু।
রাজধানীর কাওরান বাজারের ফুটপাতের একজন চা-দোকানি অনলাইনে জুয়া খেলেন। গত সপ্তাহে আইপিএলের একটি খেলায় বাজি ধরার অভিজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, ঐ দিন এক খেলায় দেখলাম শেষ দুই বলে ১২ রান দরকার। মনে হচ্ছিল সেই রান তোলা বেশ কঠিন। বাজি ধরলাম ৫ হাজার টাকা। কিন্তু ব্যাটার দুই বলে দুই ছক্কা মারার কারণে আমি বাজিতে হেরে গেলাম।
গতকাল কাওরান বাজারের বাপেক্স ভবনের পেছনের ফুটপাতের চায়ের দোকানে দেখা গেল ঐ দোকানদার চা বানাচ্ছেন আর মোবাইল ফোনে বেটিং ওয়েবসাইটগুলো চেক করছেন। এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি তো ১ হাজার টাকার বাজি ধরি। মাঝেমধ্যে লাভ হয়। আবার লসও আছে। লস যখন হয়, তখন আরেকজনের কাছে ধার করে টাকা খাটাই।’
ওয়ান এক্স বেট, বেট থ্রি-সিক্সটি-ফাইভ, মোস্ট বেট বিডি, ৯ উইকেটসসহ প্রায় ১০০ সাইট সক্রিয়। অনলাইন বেটিং সাইটগুলোর অনেকগুলোতে এমনিতেই যে কেউ ঢুকতে পারেন। আবার কোনো কোনো বেটিং সাইটে নিবন্ধন করে ঢুকতে হয়। নিবন্ধন করতে আবার দ্বিগুণ টাকা দিতে হয়। আবার কোনো কোনো সাইটে প্রবেশ করতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করতে হয় ডলারে।
আবার কোনো কোনো দেশের সাইটে প্রবেশ করতে তাদের সেই দেশের অর্থ দিয়ে কয়েন কিনে সাইটগুলোতে প্রবেশ করতে হয়। আর এর অর্থ লেনদেন হচ্ছে বিকাশ, নগদ, রকেট বা ভিসা, মাস্টারকার্ডে। তবে এই মাধ্যমে লেনদেনে জড়িত থাকে স্থানীয় এজেন্টরা। কোনো কোনো বেটিং সাইটে বিট কয়েনের মাধ্যমে কেউ কেউ অংশ নিচ্ছে। জুয়ার পর ঐ সব অর্থ ক্রেডিট কার্ড, ই-ব্যাংকিং ও হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার হচ্ছে। জুয়া বাবদ দিনে কী পরিমাণ অর্থ পাচার হচ্ছে তার কোনো হিসাব নেই সরকারের কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের উপ-কমিশনার তারেক বিন রশিদ বলেন, ‘অনলাইন জুয়ার বিষয়ে কোনো আইন নেই। আমরা শনাক্ত করে যাদের গ্রেফতার করছি, তাদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে মামলা দিচ্ছি। এ পর্যন্ত অনেক বেটিং ওয়েবসাইট আমরা বন্ধ করে দেওয়ার সুপারিশ করেছি বিটিআরসির কাছে। সাইট বন্ধও হয়েছে। কিন্তু একশ্রেণির অসাধু চক্র ভিপিএন দিয়ে আবারও ব্যবহার করে।’
অনলাইন বেটিং বা জুয়া থেকে সাধারণ মানুষকে কীভাবে দূরে রাখা যায় জানতে চাইলে উপকমিশনার তারেক বিন রশিদ বলেন, ‘সবার আগে আমাদের সচেতন হতে হবে। এ ক্ষেত্রে অভিভাবক ও শিক্ষকদের এগিয়ে আসতে হবে। এটার পেছনে আন্তর্জাতিক চক্র জড়িত। এখানে আমরা গুগল, ফেসবুক, টুইটারসহ যোগাযোগমাধ্যমগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। তাই এক্ষেত্রে সবার আগে প্রয়োজন সচেতনতা।’
ঢাকার কেরাণীগঞ্জের অটোরিকশাচালক সাগর বলেন, ‘অনলাইনে বাজি ধরে আমি নিঃস্ব হয়ে গেছি। নিজের সন্তানের স্কুলের মাসের বেতনের টাকাও অনলাইনে বাজি ধরেছি। আগে যেখানে অটোরিকশা চালিয়ে দৈনিক ১ হাজার টাকা রোজগার হতো, বাজি ধরতে গিয়ে আমি শেষ। ধারের টাকা পরিশোধ করছি। সংসারে বাজারের টাকা পর্যন্ত নেই।’ এলাকার রাসেলের মাধ্যমে এই পথে তার আসা। এই পথে যেন কেউ না আসে।
সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি ইমাম হোসেন বলেন, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে ভারত, ইন্দোনেশিয়া, রাশিয়া ও মালয়েশিয়া থেকে অনলাইন বেটিং ওয়েবসাইট পরিচালনা করা হয়। দিনে ১০০টি প্ল্যাটফরমে গড়ে একেকটিতে কোটি টাকার হিসাব ধরলে ১০০ কোটি টাকার বাজি হয়। বছরের হিসাবটি করলে দাঁড়ায় হাজার হাজার কোটি টাকা।
অনলাইন গ্যাম্বলিং চক্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে বিভিন্ন মেসেঞ্জার গ্রুপে যুক্ত হয়ে সারাদেশের যুবসমাজকে অল্প সময়ে প্রচুর অর্থ উপার্জনের লোভ দেখিয়ে অনলাইন বেটিংয়ে আসক্ত করছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডলার ‘বাই অ্যান্ড সেলিং’ বিভিন্ন গ্রুপের এজেন্ট হিসেবে কাজ করে। এই লক্ষ্যে ভাচুর্য়াল ইউএস ডলার অনলাইন জুয়াড়িদের মধ্যে কমিশন ভিত্তিতে সরবরাহ করে।
ডিজিটাল ও ইলেকট্রনিক প্রতারণার মাধ্যমে অবৈধ ই-ট্রানজেকশন করে কোটি কোটি টাকা লেনদেন করাসহ বেশ কয়েকটি চক্রের সদস্যদের গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
