প্রতিবছরই অনুষ্ঠানের সংখ্যা, চ্যানেলের চমক লাগানো বিজ্ঞাপনের সংখ্যা বাড়ে। কিন্তু একই ঐতিহ্যে আমাদের সংস্কৃতি, সমাজের বিভিন্ন অনুসঙ্গ নিয়ে নান্দনিক কাজ করে যাচ্ছে একমাত্র ইত্যাদি। আমাদের দেশে দীর্ঘসময় ধরে দর্শক জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা অনুষ্ঠানের নাম ‘ইত্যাদি’। যাঁর মেধা মননে তৈরি হয় এই অনবদ্য অনুষ্ঠান তাঁর নাম হানিফ সংকেত। নিজের ইন্টারভিউ একদমই দিতে চান না এই প্রচারবিমুখ মানুষটি। ইত্তেফাকের পাঠকদের জন্য তাই তাঁর এই সাক্ষাত্কারটি বিশেষ ঈদ উপহার। যেখানে বরেণ্য এই গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব তাঁর ভাবনা, দর্শক ও দর্শক কৌতুহলের কিছুটা ব্যাখ্যা করেছেন।
সাক্ষাত্কার নিয়েছেন তানভীর তারেক
প্রতিবছর জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ইত্যাদির এই দর্শক চাহিদার চাপ কীভাবে সামলান?
আসলে আমরা সময়কে ধরে দর্শকদের কথা চিন্তা করে অনুষ্ঠান নির্মাণ করি। মূলত ইত্যাদি নির্মাণে বেশি সময় যায় গান রেকডিং এবং মহড়ায়।
আজকালের বিভিন্ন গ্র্যান্ড ফিনালে কিংবা অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানের মতো একই কথায়, একই সুরে রেকর্ড করা গান আর পূর্ব নির্ধারিত নাচ দিয়ে চালিয়ে দিলে প্রতি ৭ দিনে একটি করে ইত্যাদি করা যেত। তাছাড়া এটি কোনো দৌড়-ঝাঁপ জাতীয় খেলাধুলা বা গাছে ওঠানামার অনুষ্ঠানও নয়। ইত্যাদির প্রতিটি বিষয়ই ভাবতে হয়। আর এতটা ভাবনা-চিন্তা করা হয় বলেই ইত্যাদির প্রতিটি বিষয়ই দর্শকদের ভাবতে শেখায়। মানুষের মাঝে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি পায়। আপনারাও বলছেন সেরা অনুষ্ঠান। সেরা জিনিসটি দিতে না পারলে অনুষ্ঠান সেরা হবে কেন? সেই লক্ষ্যেই আমরা কাজ করি।
কেউ বলেন শহুরে বিনোদন, কেউ বলেন গ্রামের বিনোদন, এর মাঝে পার্থক্য কী?
বিনোদনের কোনো ভাগ নেই। যেমন ইত্যাদিতে সব বয়সের, সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য বিনোদন থাকে। ইত্যাদিতে গ্রামের মানুষদের বিনোদন যেমন আছে, শহরের মানুষদের জন্যও বিনোদন রয়েছে। তবে বিনোদনের নামে গ্রামের সহজ-সরল সাধারণ মানুষকে নিয়ে ভাঁড়ামি কিংবা স্থুল বিষয় উপস্থাপন দর্শকদের বিরক্তিই বাড়ায়। আমরা এসব বিষয়ে সংযত থাকি সবসময়। সেকারণে দর্শকরা কৌতুহলী হয়ে আলোচনা করে প্রতিটি পর্বের।
‘হানিফ সংকেত’ এটি শুধু একটি ‘ব্র্যান্ড নেম’ নয়, একটি প্রতিষ্ঠানের নামও বটে। তিলতিল করে নিজেকে এই অবস্থানে নিয়ে এসেছেন, অনুভূতি কেমন?
আমি কাজ করি একটি দায়বোধের জায়গা থেকে। আমি পুরস্কার বা মূল্যায়নের ধার ধারি না। আজকাল পয়সা দিলে, চ্যানেল থাকলে, লাইন থাকলে, তোষামোদি চরিত্র থাকলে, সবচাইতে বড় কথা নির্লজ্জ হলে অনেক পুরস্কার পাওয়া যায়। দেখেন না ২/১ জনের পুরস্কার প্রাপ্তির পর টকশো হয়েছে, অনলাইনে ট্রল হয়েছে, তারপরও নির্লজ্জের মতো হাসছে। দেখবেন এরা আরো পুরস্কার পাবে। আমাদের দেশে এখন পুরস্কার পাওয়ার অন্যতম গুণ হচ্ছে চাটুকারিতা, লেজুরবৃত্তি ও ভণ্ডামি। মূল্যায়নের চিন্তা করলে প্রতিবছর বছর ইত্যাদির পূর্তি অনুষ্ঠান করে কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তি ডেকে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁদের প্রশংসাবাক্য শুনতাম। আমার প্রশংসাপত্র দেন দর্শকরা। তাঁদের ভালোবাসার কারণেই এতদিন ধরে ইত্যাদি করতে পারছি।
টেলিভিশন অনুষ্ঠানের মান বৃদ্ধিতে কী করা প্রয়োজন?
মৌলিক অনুষ্ঠান করতে হবে। অনুষ্ঠান নিয়ে ভাবতে হবে। ভাবতে হলে মেধা লাগবে। সুতরাং মেধাবীও হতে হবে। নিজের কল্যাণের জন্য নয়, মানুষের কল্যাণের জন্য অনুষ্ঠান করতে হবে।
উপস্থাপনা আসলে কী আপনার কাছে?
একটা শিল্প। যিনি উপস্থাপক হবেন তিনি অনুষ্ঠানের বিষয় বৈচিত্র্য, পরিকল্পনা, গ্রন্থনা, মূলত সবকিছুর সাথে জড়িত থাকবেন। তাঁকে হতে হবে ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। কারণ তাঁর ব্যক্তিত্বের আবর্তেই পুরো অনুষ্ঠান আবর্তিত হবে। কিছু বেতনভুক্ত কর্মচারী দিয়ে সবকিছু ঠিক করে নিজে উপস্থাপক সেজে পর্দায় আসলে তিনি উপস্থাপক নন, ঘোষক। আর ঘোষকই অন্যের লেখা পাঠ করেন, অন্যের নির্দেশনায় চলেন। বর্তমানে এদের সংখ্যাই বেশি।
আজকাল অনেককেই দেখি সংখ্যাতত্ত্বে চলে গেছেন। কে কত শিল্পী জোগাড় করতে পারলেন—
আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে একুশে টিভির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আমরা ৫ হাজার কণ্ঠে উদ্বোধনী সঙ্গীতটি পরিবেশন করেছিলাম। এনটিভির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৫ হাজার। আবার হাজার শিল্পীর নৃত্য, শতাধিক বিদেশির নৃত্য এসব ‘ইত্যাদি’তে হরহামেশাই হচ্ছে। তবে আমরা এ নিয়ে বাগাড়ম্বরে বিশ্বাসী নই। আমরা এ নিয়ে বলি না ২ হাজার কণ্ঠে গান কিংবা ৫ হাজার কণ্ঠে গান। মূলত তাঁরা কণ্ঠ মেলায়। সুতরাং কণ্ঠের গান বলা ঠিক নয়। ‘ইত্যাদি’তে প্রতি ঈদেই রমজানের গানটি ৫ থেকে ১০ হাজার অংশগ্রহণকারী কণ্ঠ মেলায়। গতবার ২০ হাজার শ্রমজীবী মানুষ অংশগ্রহণ করেছেন। তাই বলে কী আমরা বলবো ২০ হাজার কণ্ঠের গান?
অবসরে কী করেন?
অবসর সেই অর্থে নেই। আমার সময় কাটে মিরপুরস্থ আমার অফিসে। কাজ ছাড়া বাইরে বের হই না। অযথা আড্ডা দেওয়াও পছন্দ না। অবসর বলতে বছরে একটা সময় পরিবার নিয়ে কিছুদিনের জন্য দেশের বাইরে বেড়াতে যাওয়া। এবারো ঈদের পর আমেরিকা যাওয়ার ইচ্ছে আছে। এর বাইরে আমার পুরো সময় ব্যয় হয় এসব কাজেই।
দর্শকদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন—
সবাইকে ঈদ মোবারক। ঈদ হোক সবার জন্য আনন্দময়। সবাইকে ইত্যাদি দেখার আমন্ত্রণ রইলো।
