রবিবার পারিবারিক কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন মুহিত

আপডেট : ৩০ এপ্রিল ২০২২, ২১:৪৮

সাবেক অর্থমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ বৃহত্তর সিলেটের কৃতি সন্তান আবুল মাল আবদুল মুহিতের মৃত্যুতে সিলেটের সর্বস্তরের মানুষ শোকে মুহ্যমান।

শনিবার রাতে তার মরদেহ সিলেটে নিয়ে আসা হবে। রবিবার দুপুর ২টায় সিলেট আলিয়া মাদরাসায় তার জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। পরে শহরের রায়নগরস্থ তার পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হবে।

গত শুক্রবার (২৯ এপ্রিল) দিবাগত রাত ১২টা ৫৬ মিনিটে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে তিনি মৃত্যু বরণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর। আবুল মাল মুহিত পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের বড় ভাই।

এর আগে গত শনিবার সকাল সাড়ে ১০টায় গুলশান আজাদ মসজিদে প্রথম জানাজা, বেলা সাড়ে ১১টায় সংসদ প্লাজায় দ্বিতীয় জানাজার পর দুপুর ১২টায় মরদেহ সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য শহিদ মিনারে নেওয়া হয়।

বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী আবুল মাল আবদুল মুহিতের  মৃত্যুতে সিলেটবাসী একজন অভিভাবক হারালো- এ মন্তব্য করেছেন অনেকে। তার মৃত্যু সংবাদ শোনার সঙ্গে সঙ্গে সিলেট নগরীর প্রাণ কেন্দ্রে অবস্থিত আবুল মাল মুহিতের প্রিয় ‘হাফিজ কমপ্লেক্সে’ মানুষের ভিড় জমে। তিনি ১৬ মার্চ হাফিজ কমপ্লেক্সে এসেছিলেন।

এএমএ মুহিত ১৯৩৪ সালের ২৫ জানুয়ারি সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন। তার মা সৈয়দা শাহার বানু চৌধুরী ও বাবা আবু আহমদ আবদুল হাফিজ। মা-বাবা দুইজনই তৎকালীন সিলেট জেলার রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। ১৪ ভাই-বোনের মধ্যে তার অবস্থান তৃতীয়।

আবুল মাল আবদুল মুহিত ১৯৫১ সালে সিলেটের এমসি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীতে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) শ্রেণিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৯৫৪ সালে প্রথম শ্রেণি পেয়ে কৃতকার্য হন এবং একই বিষয়ে ১৯৫৫ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বিদেশে চাকরিরত অবস্থায় অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন তিনি। ১৯৬৩-৬৪ শিক্ষাবর্ষে হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমপিএ ডিগ্রি লাভ করেন।

কর্মজীবন পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস সংস্থার কেন্দ্রীয় কমিটির মহাসচিব ছিলেন আবুল মাল আবদুল মুহিত। ১৯৬০ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্বে ছিলেন। অর্থনৈতিক পরামর্শক হিসেবে ১৯৬৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তৎকালীন পাকিস্তান দূতাবাসে যোগদান করেছিলেন। চাকরিরত অবস্থায় পাকিস্তান কর্মপরিকল্পনা কমিশনের প্রধান ও উপ-সচিব ছিলেন। ওই সময় তিনি পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্য প্রতিবেদন আকারে তুলে ধরেন ও পাকিস্তান জাতীয় কংগ্রেসে পেশ করেন।

পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে পরিকল্পনা কমিশনের সচিব হিসেবে নিযুক্ত হন। এছাড়া ১৯৭৭ সালে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বহিঃসম্পদ বিভাগের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মুহিত। বাংলাদেশ থেকে এসকাপের প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে ১৯৮৩ সালে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

ওয়াশিংটনে তৎকালীন পাকিস্তানের দূতাবাসে প্রথম কূটনীতিবিদ হিসেবে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের সপক্ষে নিজ অবস্থান তুলে ধরে চাকরি থেকে ইস্তফা দেন মুহিত। পরে ১৯৭১ সালে গঠিত অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়াশিংটন দূতাবাসে ইকনমিক কাউন্সিলরের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৮১ সালে আবুল মাল আবদুল মুহিত সরকারি চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নেন। এরপর তিনি ফোর্ড ফাউন্ডেশনের অর্থনীতি এবং উন্নয়ন বিভাগের একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেন। আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন সংস্থা বা ইফাদের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ১৯৮২-১৯৮৩ সালে এরশাদ সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন মুহিত। পরবর্তী সময়ে বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানসহ জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ, আইডিবি এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে তিনি সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন।

আবুল মাল আবদুল মুহিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহা ঐক্যজোটের মনোনয়নে সিলেট-১ আসনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি অর্থমন্ত্রী হিসেবে শপথ বাক্য পাঠ করেন। তার স্ত্রী সৈয়দা সাবিয়া মুহিত একজন ডিজাইনার। তাদের দুই ছেলে ও এক কন্যা রয়েছে। মেয়ে সামিয়া মুহিত ব্যাংকার এবং মুদ্রা নীতি খাতের একজন বিশেষজ্ঞ। তাদের বড় ছেলে  শাহেদ মুহিত একজন বাস্তুকলাবিদ এবং কনিষ্ঠ পুত্র সামির মুহিত একজন শিক্ষক।

 

ইত্তেফাক/ইউবি