মাসে ৩ কোটি টাকার গহনা বিক্রি হচ্ছে বগুড়ার ধরমপুর এ্যানটিক পল্লীতে

আপডেট : ০২ মে ২০২২, ১১:০৪

জেলা শহরের উপকন্ঠে সম্প্রসারিত পৌর এলাকার ১৭ নম্বর ওয়ার্ড ধরমপুর এ্যানটিক পল্লী। এখানে দিনরাত কাজ করছে ২০ গ্রামের ৩ সহশ্রাধিক নারী-পুরুষ। এই ২০ গ্রাম থেকে প্রতিদিন ১০ লাখ টাকার এ্যানটিক গহনা যায় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। মাসে প্রায় ৩ কোটি টাকার এ্যানটিকের গহনা পাইকারি বিক্রি হয়ে থাকে।

এখন সোনার দাম আাকাশ চুম্বি হওযায় মানুষ বেছে নিয়েছে তামা, পিতল ও দস্তার তৈরী এ্যানটিকের গহনা। সোনার গহনা চুরি ও ছিনতাইয়ের ভয় থাকবেনা তাই এ্যানটিকের তৈরী গহনা প্রচোলন শুরু হয়েছে। এ্যানটিকের বাজার সম্প্রসারিত হয়েছে। ভারত ও দেশের যশোর থেকে কাঁচামাল এনে বগুড়ার ধরমপুরে কারিগররা সুনিপুঁণ হাতে তৈরী করছে এ্যাটিকের সব ধারনের গহনা। দেখে বুঝা যায় না এই গহনা সোনা দিয়ে তৈরী নয়। 

আগে সোনার গহনা তৈরীর জন্য কয়লার আগুনে পিতলের নল দিয়ে গহনার জোড়া লাগানো হতো। এখন প্রযুক্তি পাল্টে গেছে তারা গ্যাসের পটে চাপ দিয়ে এ্যানটিকের গহনাকে জোড়া লাগায়। সোনার গহনার মত এ্যানটিকের গহনার কাজ প্রায় এক রকম। তারা একটি মোমের ছাঁচে এ্যানটিকের গহনা জোড়া দিয়ে তৈরী করেন নানা ডিজাইনের গহনা। এ সব এ্যানটিক তৈরী হয় তামা, পিতল ও দস্তার সংমিশ্রনে। অপূর্ব হতের কারু কাজে তৈরী হচ্ছে চোখ ধাঁধানো এ্যনটিকের গহনা।

করোনার শুরুতে মুখ থুবড়ে পড়লেও আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে এ্যানটিক পল্লী। বগুড়া শহরের ধরমপুর গ্রামে ‘গহনা’ তৈরি করাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে মোকাম। এই বাজারে ২৩৮টি গহনার দোকান রয়েছে। শুধু বাজার মালিক-শ্রমিক মিলে রয়েছেন প্রায় ২ হাজার ৭০০ জন। এখান থেকে তৈরি গহনা ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বেশ কদর রয়েছে। এসব গহনা তৈরি করতে বগুড়ার ধরমপুর ও এর আশেপাশে অন্তত ১০ হাজার শ্রমিক কাজ করেন।

গহনা তৈরি করছেন নারী কারিগররা।

গ্রামের নারীরা ব্যবসায়ীদের থেকে কাজের অর্ডার নিয়ে ঘরে বসেই গহনা বানান। এর মধ্যে কেউ কেউ ঘরেই গড়ে তুলেছেন ছোট কারখানা। সেখানে একসঙ্গে পাড়ার একাধিক নারীরা তৈরি করেন অ্যান্টিকের গহনা। শুরুটা ধরমপুরে হলেও এ শিল্পের বিস্তার ঘটেছে সদরের নিশিন্দারা, ঝোপগাড়ী, ফুলবাড়ী ও বারোপুরসহ আরো অনেক এলাকায়। এসব এলাকায় নারী-পুরুষ কারিগরদের কর্মসংস্থানের উৎস তৈরি হয়েছে। অ্যান্টিকের গহনা তৈরির আয় থেকে এ এলাকার নারীরা নিজেদের আর্থিকভাবে সাবলম্বী করেছেন। অনেকে সংসারের হাল ধরেছেন। গড়েছেন নিজের বাড়িঘরও। 

কারিগরদের কাছে জানা যায়, বিয়ে-শাদিসহ যেকোনো অনুষ্ঠানে সোনার মতোই দেখতে এই অ্যান্টিক ও সিটিগোল্ড গহনার ব্যাপক চাহিদা। নারীদের পছন্দের সীতাহার, শাড়িমালা, কান্দা, লহর, হাশলি, জড়ো, টাইরা, টিকলি, চুড়, বালা, মানতাসা, নূপুর, বিছাসহ আরো বিভিন্ন দৃষ্টিনন্দন গহনা তৈরির কাজ করেন তারা। ধরমপুরে প্রায় ১০০ ধরনের গহনা পাওয়া যায় বলে জানান ব্যবসায়ীরা।

শ্রমিকের হাতে তৈরী এ্যানটিক গহনা

ধরমুপর, নিশিন্দারা, ঝোপগাড়ি, আটাপাড়া এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে শুধু গৃহবধূরা নয়, অনেক শিক্ষার্থীরা পড়ালেখার পাশাপাশি এই হাতের কাজ করছেন। সরকারি মুজিবর রহমান মহিলা কলেজের সম্মান দ্বিতীয় বর্ষের ইসলামের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী আদুরী আক্তার জানান, তিনিও অ্যান্টিকের গহনা তৈরি করে নিজের লেখাপড়ার খরচ জোগান।

উচ্চমাধ্যমিক পড়ুয়া পল্লী মঙ্গল এলাকার সাদিয়া বলেন, শখ থেকে মূলত এই কাজ শুরু। এখন সময় কাটে, টাকাও উপার্জন হয়।

নিশিন্দারার এলাকার মিম, জান্নাতী, সাথী, ছোট কুমিড়ার সানজিদা পড়াশোনার পাশাপাশি অ্যান্টিকের কাজ করেন। তাদের কথা বসে থেকে সময় নষ্ট করার চেয়ে এ কাজ করলে বাড়তি টাকা আয় হয়। তবে তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেলো, পুরুষের চেয়ে এ কাজে নারীদের আগ্রহই বেশি থাকে। এ কারণে অ্যান্টিকের গহনা তৈরির কারিগর তুলনামূলকভাবে পুরুষের চেয়ে নারী বেশি।

ব্যবসায়ীরা বলেন, এ এলাকার গহনার কারিগরদের ইতিহাস অনেক পুরোনো। প্রায় দেড়শ বছর আগে থেকে এখানে গহনার কাজ শুরু হয়। সে সময় পিতলের গহনা তৈরি হত। পরে একপর্যায়ে সোনার গহনার চাহিদা বাড়তে থাকে। কিন্তু ৮০ দশকের শেষে আবার সোনার গহনার চাহিদা পড়তে থাকে। তখন থেকে একটু একটু করে অ্যান্টিক শিল্পের দিকে ঝুঁকতে থাকে কারিগররা। এরপর ২০০৬ থেকে ২০০৭ সালের দিকে পুরোদমে শুরু হয় অ্যান্টিকের গহনা তৈরি। পরে ধরমপুর বাজারে মোকাম গড়ে ওঠে।

ধরমপুর বাজার দোকান মালিক সমিতির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক সামসুর রহমান সবুজ জানান, করোনা তাদের অনেক ক্ষতি হয়েছে। তারা আবার ঘুওে দাঁড়িয়েছে। ঈদের বাজারেও ধরম পুরের তৈরী এ্যানটিকের গহনার চাহিদা বেড়েছে। নারীরা একটা সোনার গহনা পরলে সেই সাথে আরো দুটি এ্যানটিকের গহনা পরছেন।

ধরমপুর বাজার দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. জাকির হোসেন জানান, সোনার দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় এ্যানটিকের গহনা চাহিদা বেড়েছে। এখানকার অনেকে যারা রিক্সা চালাতো, দিন মজুর ছিল, বা অন্যান্য পেশা নিয়োজিত ছিল। তাদের অধিকাংশই প্রথমে এ্যানটিক কারখানার  শ্রমিক ছিল । এরপর তারা নিজেরাই এখন এ্যানটিক শিল্পের মালিক বনে গেছে।

এ্যানটিক শিল্পের জন্য সরকারি সহয়তা দেয়ার জন্য প্রস্তুত বগুড়া বিসিক। বগুড়া বিসিকের ডিজিএম  মাহফুজুর রহমান জানান, বিসিক ঋণ সহায়তা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। তিনি বলেন, এটি একটি সম্ভাবনাময় খাত। বিসিক এই খাতে সব রকম সহায়তা দিতে প্রস্তুত। অনেক ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প প্রতিষ্ঠান প্রণোদনা পেয়েছে, কিন্তু এ্যানটিক কারিগররা এখনো কোনো সহায়তা চায়নি।

ইত্তেফাক/ ইআ