খালেদা জিয়ার মুক্তি কত দূর?

আপডেট : ০৩ জুন ২০১৯, ২১:৩৪

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি এখন আর তেমন আলেচনায় নেই। ঈদের আগে তার মুক্তি পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা আছে বলে মনে হয় না। কিছুদিন গুজব ছিল যে বিএনপির নির্বাচিত এমপিরা শপথ নিয়ে সংসদে যাবেন এবং খালেদা জিয়া চিকিত্সার জন্য বিদেশে যাবেন। খালেদা জিয়াকে কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আনার পর ওই গুজব বেশি ছড়িয়েছিল। সরকারের সঙ্গে বিএনপির গোপন সমঝোতার কথাও শোনা যাচ্ছিল। খালেদা জিয়া প্যারোলে মুক্তি পাবেন, নাকি জামিনে—তা নিয়েও কথা শোনা যাচ্ছিল। বেগম জিয়া প্যারোলে মুক্তি চাইলে সরকার সেটি বিবেচনা করবে বলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানিয়েছিলেন। বেগম জিয়া বা তার পরামর্শদাতারা হয়তো প্যারোলে মুক্তি পাওয়াটা সম্মানজনক মনে করেননি। তারপর নানা নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে বিএনপির এমপিরা শপথ নিয়েছেন কিন্তু বেগম জিয়ার মুক্তির বিষয়টি চাপা পড়ে গেছে। বিএনপি নেতাদের কেউ কেউ মাঝে মাঝে দলীয় প্রধানের মুক্তির বিষয়টি বলেন। কিন্তু এই বলায় আসলে সরকারের ওপর কোনো চাপ তৈরি হয় না। বেগম জিয়াকে কীভাবে মুক্ত করা যাবে তার কোনো সুনির্দিষ্ট কর্মপরিল্পনা বা রোডম্যাপ বিএনপির নেই।

এদিকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গত ১ জুন সাংবাদিকদের কাছে বলেছেন যে, খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে সরকারের কিছু করার নেই। আইন অনুযায়ী তিনি আদালতে গেছেন, আদালত তাকে দোষী সাব্যস্ত করে সাজা দিয়েছেন। আইনি লড়াই করে বিএনপির নেতারা তাকে মুক্ত করে আনতে পারেন। বিষয়টি আদালতের এখতিয়ারে।

সরকার খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি আদালতের ওপর ছেড়ে দেওয়ায় এখন বিএনপি নিরুপায় হয়েই অপেক্ষার প্রহর গুনছে। সরকারকে ঘায়েল করার মতো তেমন কোনো অস্ত্র তাদের হাতে নেই। বিএনপিতে চলছে এক ধরনের অস্থিরতা। দলের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে বিরোধ এখন চরমে। স্থায়ী কমিটিকে বাদ দিয়ে যেভাবে বাইরে থেকে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, সেটা অনেকেই মানতে পারছেন না। কদিন আগে প্রথমে গণমাধ্যমে খবর বের হলো : খালেদা জিয়াসহ মোট পাঁচজন বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনে বিএনপি থেকে মনোনয়নপত্র জমা দেবেন।

আবার এক দিন পরের খবর : বেগম জিয়া মনোনয়নপত্রে স্বাক্ষর দানে অসম্মতি জানিয়েছেন। তিনি বগুড়ার উপনির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

এই ঘটনা থেকে আবার এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, বিএনপিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমন্বয়হীনতা চলছে। জেলের ভেতরে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ভাবনাচিন্তার সঙ্গে জেলের বাইরের সিনিয়র নেতাদের চিন্তার মিল নেই। আবার  লন্ডনে অবস্থানরত তারেক রহমানের চিন্তার সঙ্গে দেশের নেতাদের মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। এতদিন শোনা গিয়েছিল, বেগম জিয়ার সঙ্গে আলোচনা করেই তারেক রহমান সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। কিন্তু বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনের ব্যাপারে দেখা গেল, তারেক রহমানের চিন্তা এবং বেগম জিয়ার চিন্তা এক ধারায় অগ্রসর হচ্ছে না। বেগম জিয়া উপনির্বাচনে অংশ নিতে অনাগ্রহী। কিন্তু তারেক অংশগ্রহণের পক্ষে। বিএনপি এখন কার্যত এরকম এলোমেলো অবস্থায়ই চলছে। বিএনপির এমপিরা শপথ নিয়ে সংসদে গেলে বেগম জিয়ার কারামুক্তির যে সম্ভাবনার কথা শোনা গিয়েছিল সেটাও বাস্তবে সঠিক না হওয়ায় বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে হতাশা বেড়েছে। বেগম জিয়ার মুক্তির কোনো আভাসই পাচ্ছেন না নীতিনির্ধারকরা। তাদের কী করা উচিত তা-ও হয়তো বুঝে উঠতে পারছেন না। আন্দোলন করে হবে না, আইনি প্রক্রিয়া লম্বা। বাকি থাকে সরকারের সঙ্গে সমঝোতা। সমঝোতার প্রকাশ্য উদ্যোগ দেখা যায় না। চিকিত্সার জন্য খালেদা জিয়া বিদেশ যেতে সম্মত হলে একটি অগ্রগতির সম্ভাবনার কথা প্রচার হলেও বাস্তবে তার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে  না।

এদিকে গত ২৪ মে এক সংবাদ সম্মলনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অভিযোগ করেছেন যে, সরকার ছলচাতুরী করে বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগারে আটক রেখে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সরকার খালেদা জিয়াকে হত্যা করতে চায় কি না, সে প্রশ্নও তুলেছেন মির্জা আলমগীর।

আবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে বিনা চিকিত্সায় মেরে ফেলার মতো অমানবিক ও নিষ্ঠুর কাজ শেখ হাসিনার সরকার করবে না।

বেগম জিয়ার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে ভয়াবহ চিত্র বিএনপির পক্ষ থেকে তুলে ধরা হচ্ছে তিনি জেলে যাওয়ার পর থেকেই। চিকিত্সকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তার অবস্থা গুরুতর বলে মত দিচ্ছেন না। তবে এটা ঠিক যে, তিনি অসুস্থ। সেজন্য তাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিত্সা দেওয়া হচ্ছে। বিএনপি তাকে বেসরকারি ইউনাইটেড হাসপাতালে রেখে চিকিত্সা দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে। সরকার মনে করছে, বিএসএমএমইউতেই খালেদা জিয়ার উপযুক্ত চিকিত্সা হচ্ছে।

বেগম জিয়ার কারাবাস তার দলকে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে ফেলেছে। বিএনপি রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে বেহাল অবস্থায় আছে। নির্বাচনের পর বিএনপির সমস্যা বেড়েছে। দলটি ক্রমাগত অস্তিত্ব সংকটের দিকেই যাচ্ছে। বেগম জিয়াকে মুক্ত করার কোনো উপায় তাদের সামনে খোলা আছে বলেও এখন আর মনে করা হচ্ছে না। সম্প্রতি ভারতের নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফিরে আসায় বিএনপিতে দুশ্চিন্তা বাড়ছে। আঞ্চলিক কিংবা আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার সরকার বিএনপির সঙ্গে কোনো সমঝোতায় যাওয়ার গরজ বোধ না করারই কথা। পরিস্থিতি সরকারের অনুকূলে এবং নিয়ন্ত্রণে। বিএনপিকে রাজনীতিতে জায়গা পেতে হলে সরকারের প্রতি নমনীয়তা না দেখিয়ে উপায় আছে বলে মনে হয় না।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মাঝে মাঝে বক্তৃতা দিয়ে কর্মী-সমর্থকদের মনোবল চাঙ্গা করার চেষ্টা করেন কিন্তু তাতে কাজের কাজ কিছু হয় বলে কারো বিশ্বাস হয় না। শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা সবার চোখেই ধরা পড়ে। ১ জুন এক অনুষ্ঠানে মির্জা আলমগীর বলেছেন, ‘খালেদা জিয়া কারাগারে বসেই প্রতি মুহূর্তে গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। প্রতি সপ্তাহে একটি মেসেজই পাঠান, যাতে যে-কোনো মূল্যে আমরা দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখি। আমরাও এ পর্যন্ত যত সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তার সবই খালেদা জিয়ার সঙ্গে আলোচনা-পরামর্শ করেই নিয়েছি। আমরা নির্বাচনে গিয়েছি গণতন্ত্র এবং আমাদের দলকে রক্ষা করার জন্য। আমরা হাজার হাজার নেতা-কর্মীর স্বার্থেই নির্বাচনে গিয়েছি। আমরা পার্লামেন্টে গেলাম কেন? এটা অনেকেই প্রশ্ন করে। এটা নিয়ে ভুল-বোঝাবুঝির কোনো অবকাশ নেই। আমরা পার্লামেন্টে দলের সিদ্ধান্তেই গিয়েছি। যারা পার্লামেন্টে গিয়েছেন, তারা দলের সিদ্ধান্তেই গিয়েছেন। আমি নিজে যাইনি, সেটাও দলের সিদ্ধান্ত।’

বিএনপি মহাসচিবের এই কৈফিয়ত ও আত্মরক্ষামূলক বক্তব্য থেকেই এটা স্পষ্ট বোঝা যায় যে, বিএনপি এখন ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। দলের ঐক্য সংহত নয়। খালেদা জিয়া কেন ‘যেকোনো মূল্যে দলকে ঐক্যবদ্ধ’ রাখতে বলছেন? কারণ তার কাছেও অনৈক্যের খবর আছে। দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সবকিছু হওয়ার যে দাবি মহাসচিব করছেন, তার সঙ্গে স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য একমত নন। তারা বরং গণমাধ্যম থেকে জানতে পারেন দলের সিদ্ধান্তের কথা।

n লেখক :সিনিয়র সাংবাদিক