ফিস্টুলা রোগ প্রতিরোধ ও প্রতিকার

আপডেট : ০৩ জুন ২০১৯, ২১:৩৪

বিগত কয়েক দশক ধরেই বাংলাদেশসহ অনেক আফ্রিকান, দক্ষিণ এশীয় এবং ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোতে প্রসবজনিত ফিস্টুলা নারী স্বাস্থ্যের জন্য একটি অন্যতম উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ১০-২০ মিলিয়ন নারী ফিস্টুলায় আক্রান্ত। যদিও উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপ থেকে প্রসবজনিত ফিস্টুলা নির্মূল করা সম্ভব হয়েছে তবে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর প্রায় ৫০টির বেশি আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এটি এখনো বিদ্যমান। প্রতিবছর, বিশ্বব্যাপী ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ নারী নতুন করে ফিস্টুলায় আক্রান্ত হচ্ছেন। সাম্প্রতিক কয়েক দশকে বাংলাদেশ মাতৃমৃত্যু রোধ, নবজাতক এবং শিশুস্বাস্থ্যের উন্নতির মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ১৯৯৬ সালে মাতৃমৃত্যু হার ৫৯৬ জন (প্রতি লক্ষ জীবিত জন্মে) থেকে হ্রাস পেয়ে বর্তমানে ১৭২ জনে নেমে এসেছে। প্রায় ১৪ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা হাসপাতাল, একটি গতিশীল এনজিও এবং বাণিজ্যিক সেবাখাত নিয়ে গঠিত একটি সুবিশাল স্বাস্থ্য অবকাঠামো এই সাফল্যের জন্য অবদান রেখেছে। এই অর্জন সত্ত্বেও, ৫৩% প্রসব এখনো বাড়িতে হচ্ছে। এই বাড়িতে প্রসবের একটি ক্ষুদ্র অংশ দক্ষ প্রসূতি সেবাদানকারীর (স্কিল বার্থ এ্যাটেন্ডেন্ট) সহায়তা পায়। বাড়িতে প্রসবের এই উচ্চহারের কারণে অনেক নারী প্রসবকালীন জটিলতা যেমন: বিলম্বিত ও বাধাগ্রস্ত প্রসব এবং প্রসবজনিত ফিস্টুলার ঝুঁকিতে থাকেন। এখন পর্যন্ত ৩% মাতৃমৃত্যুর জন্য দায়ী বাধাগ্রস্ত প্রসব। এসব কারণে জননেন্দ্রিয়ের ফিস্টুলা বাংলাদেশের নারীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের কারণ। মানসম্মত তথ্যের অভাবে বাংলাদেশের জন্য এর প্রকৃত রোগীর সংখ্যা বলা সহজ নয়।

২০০৩ সালে ইউএনএফপিএ এবং এনজেন্ডারহেলথ কর্তৃক পরিচালিত একটি জরিপে দেখা যায়, প্রতি ১ হাজার বিবাহিত মহিলাদের ১.৬৯ জন ফিস্টুলার মতো উপসর্গে আক্রান্ত। সেই হিসেবে বলা হয় প্রায় ৭১ হাজার মহিলা ফিস্টুলা রোগে ভুগছেন। পরবর্তী সময়ে ২০১৬ সালের সর্বশেষ জরিপে দেখা যায় যে, প্রতি ১ হাজার বিবাহিত মহিলাদের ০.৪২ জন ফিস্টুলার-ন্যায় উপসর্গে আক্রান্ত হচ্ছে। সে হিসেবে বলা যায় এই মুহূর্তে প্রায় বাংলাদেশে ২০ হাজার  মহিলা ফিস্টুলা রোগে ভুগছেন। এছাড়াও প্রতিবছর আনুমানিক প্রায় ১ হাজার  নতুন করে এই সংখ্যার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। যদিও মানসম্মত তথ্যের অভাবে বাংলাদেশের জন্য এর প্রকৃত বা সঠিক ফিস্টুলা রোগীর সংখ্যা বলা সহজ নয়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে প্রসবজনিত ফিস্টুলার সংখ্যা কিছুটা কমেছে কিন্তু আয়াট্রোজেনিক বা অপারেশনজনিত ফিস্টুলা যেমন: সিজারিয়ান অপারেশন বা জরায়ু অপসারণের (হিস্ট্রেক্টমি) পর ফিস্টুলার ঘটনা একটি সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু বর্তমান পরিবর্তিত পারিপার্শ্বিক অবস্থায় প্রসবজনিত ফিস্টুলার বাইরেও আয়াট্রোজেনিক বা অপারেশনজনিত ফিস্টুলার উপর দৃষ্টি দেবার সময় এসেছে কারণ উভয় ক্ষেত্রেই নারী স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব একই। সম্প্রতি জাতিসংঘ আগামী এক দশকের মধ্যেই (২০৩০ সাল বা তার পূর্বেই ) প্রসবজনিত ফিস্টুলা অবসানের লক্ষ্য ঘোষণা করেছে।

প্রসবজনিত ফিস্টুলা কি

প্রসবজনিত ফিস্টুলা হচ্ছে প্রসবকালীন একটি অন্যতম গুরুতর জটিলতা এবং বেদনাদায়ক পরিস্থিতি। বাধাগ্রস্ত প্রসবের ক্ষেত্রে সময়মতো পর্যাপ্ত চিকিত্সা না পেলে প্রসব রাস্তায় ক্ষত সৃষ্টি হয়। এর ফলে প্রসব পথের সঙ্গে মূত্রপথ বা মলাশয়ের একটি অস্বাভাবিক সংযোগ তৈরি হয়। যার ফলে মহিলাদের অনবরত মূত্র অথবা মল অথবা উভয়ই ঝরতে থাকে, যা প্রায়শই দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি করে, তাঁরা বিষণ্নতায় ভোগেন, সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন এবং চূড়ান্ত দারিদ্র্যতায় পতিত হন। 

এছাড়াও নারীদের জননেন্দ্রিয়ের ফিস্টুলা আরো কিছু কারণে হতে পারে যেমন: অস্ত্রোপচারের আঘাত। আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট যেমন: দারিদ্র্য, শিক্ষার অভাব, সমাজে নারীর অবস্থা, নিম্নমানের প্রসবকালীন সেবা, অপুষ্টি, বাল্যবিবাহ, পরিবার পরিকল্পনা সেবার আওতায় না আসা, সামাজিক সংস্কৃতি, বাড়ি থেকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দূরত্ব এগুলো সবই ফিস্টুলার ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।

সঠিক সময়ে চিকিত্সা না করালে ফিস্টুলার কারণে বেশ কিছু দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা দেখা দিতে পারে। প্রস্রাব ও পায়খানা ধরে রাখতে না পারা, বারবার মূত্রতন্ত্রের সংক্রমণ, স্নায়ুবিক ক্ষতি যেমন: ফুট ড্রপ ও হাঁটার সমস্যা, ক্রমাগত প্রস্রাব ক্ষরণের ফলে চামড়ায় ক্ষত ইত্যাদি। স্বল্প পানি পান করার ফলে কিডনিতে পাথর হতে পারে। ঘুম ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপর বিরূপ প্রভাব পড়ে ফলে নিদ্রাহীনতা ও অবসন্নতা দেখা দেয়। চিকিত্সাজনিত ও শারীরিক পরিণতি ছাড়াও মহিলাজনিত ফিস্টুলা ঐ নারীর জীবনমানের উপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলে।

প্রসবজনিত ফিস্টুলা প্রতিরোধ

প্রসবকালীন সর্বোত্তম চিকিত্সার বিধান এবং ব্যবহারই প্রসবজনিত ফিস্টুলা রোধ করার মূল চাবিকাঠি। ব্যাপকভাবে ব্যবহূত মাতৃস্বাস্থ্য বিষয়ক গবেষণাপত্র অনুযায়ী গর্ভাবস্থায় জরুরি কোনো অবস্থার ফলাফল মূলত তিনটি প্রধান বিষয়ের উপর নির্ভরশীল। এগুলো বিভিন্ন মেয়াদের চিকিত্সা গ্রহণের বিলম্ব নিয়ে আলোচনা করে যেমন :সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাবার জন্য যানবাহনের ব্যবস্থা করতে বিলম্ব এবং সঠিক ও পর্যাপ্ত চিকিত্সা সেবা পেতে বিলম্ব হওয়া ।  প্রতিরোধের জন্য অবশ্যই কীভাবে এই তিন রকমের কালক্ষেপণ হ্রাস করা যায় সে বিষয়ে নজর দিতে হবে এবং সকল নারীই যেন সময়মতো মানসম্মত প্রসবকালীন সেবা পায় সেটি নিশ্চিত করবে। প্রসবকালীন সেবা ও সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য নারীদের সক্ষম করা/স্বাস্থ্যসেবার সহজলভ্যতা, (২৪/৭) সপ্তাহে ৭ দিন ও দিনে ২৪ ঘণ্টা মানসম্পন্ন জরুরি প্রসবকালীন সেবা (ইএমওসি) দিতে পারে এমন উপজেলা/জেলা পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি করা, সারা দেশে মাতৃস্বাস্থ্য এবং প্রসবকালীন সেবার জন্য ডিপ্লোমা সমমানের মিডওয়াইফ দ্বারা সেবার কার্যক্রমকে প্রসারিত করা এবং বাধাগ্রস্ত প্রসবের ক্ষেত্রে শুরুতেই ক্যাথেটার পরানো নিশ্চিত করা প্রসবজনিত ফিস্টুলা প্রতিরোধে মূল ভূমিকা রাখতে পারে ।

প্রসবজনিত ফিস্টুলা প্রতিকার

পাশাপাশি কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা ফিস্টুলা রোগী শনাক্তকরণের জন্য ৪টি প্রশ্নের নির্দেশিকার ব্যবহার, রোগনির্ণয় নিশ্চিতকরণের জন্য ফিস্টুলার লক্ষণ আছে এমন রোগীদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স/জেলা হাসপাতাল/ সিএফডিইতে প্রেরণ করা, ফিস্টুলা নিরাময়কেন্দ্রে নারীকে সঠিক বিশেষজ্ঞ দ্বারা সঠিক সার্জারি করা এবং অপারেশনকৃত রোগীদের পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনের সহায়তার জন্য উপযুক্ত সরকারি বা বেসরকারি কেন্দ্রে প্রেরণ করার মাধ্যমে ২০৩০ সাল নাগাদ অথবা একটি প্রজন্মের মাঝেই বাংলাদেশকে প্রসবজনিত ফিস্টুলা মুক্ত করা সম্ভব।

‘এখন থেকে বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী প্রতিটি মেয়ে প্রসবজনিত ফিস্টুলা থেকে ঝুঁকিমুক্ত থাকবে এবং ফিস্টুলা আক্রান্ত প্রতিটি নারী সর্বোচ্চ মানের সেবা পাবে ও মানসম্মত জীবনযাপন করবে’ এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য ইতিমধ্যে প্রসবজনিত ফিস্টুলা সম্পর্কিত ২য় জাতীয় কৌশলপত্র প্রণীত হয়েছে যা প্রসবজনিত ফিস্টুলা আক্রান্তের সংখ্যা শূন্যে নামিয়ে আনা ও দেশের ফিস্টুলায় আক্রান্ত সকল রোগীকে চিকিত্সার মাধ্যমে ২০৩০ সাল নাগাদ সেবা দিয়ে বাংলাদেশকে ফিস্টুলামুক্ত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। সকলের সমন্বিত প্রচেষ্টা, পারস্পরিক সহযোগিতার দ্বারাই এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব। ফিস্টুলা রোগ  হতে প্রতিরোধ ও প্রতিকার প্রত্যেক নারীর অধিকার-আসুন সবাই মিলে ফিস্টুলা রোগ নির্মূল করি ।

n লেখক :জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ