আগামীকাল বিশ্ব পরিবেশ দিবস। এ দিনটিকে সামনে রেখে তাই পরিবেশ নিয়ে দুটি কথা বলতে চাই। পরিবেশ নিয়ে কি আমাদের কিছুই করার নেই? নিশ্চয়ই আছে।
খাদ্যাভ্যাস আর জীবনযাত্রার ধরন পরিবর্তনে বহুলাংশে রক্ষা পাবে পরিবেশ। বিশেষ করে আমাদের বাঙালিদের খাদ্যাভ্যাস পরিবেশের জন্য খুব ভয়ংকর। বৈশাখ মাসে মুক্ত স্বাদুপানির প্রায় সব মাছ ডিম দেয়। মাছের পেট ভর্তি থাকে ডিমে। তখন আমাদের লোভ জাগে ডিমওয়ালা মাছের ঝোল খাওয়ার। ফলে মাছ বাজারের পাত্রগুলোতে ডিমভর্তি মা মাছদের ছটফট করতে দেখা যায়। ধ্বংসাত্মক এই স্বভাবের জন্য এক চিকুনিতে বিনাশ ঘটে লক্ষ লক্ষ প্রাণের। বাজারে এখন দেশি-বিদেশি মাছ ভরপুর। মাছ চাষে আমরা এখন স্বয়ং সম্পূর্ণ। এই কয়েকটা দিন মুক্ত পানির মাছগুলোকে একটু রেহাই দিলে হয় না? নানা রকম ফাঁদ পেরিয়ে যদি কিছু মাছ অলৌকিকভাবে বেঁচে যায় তবে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে আরেক স্বভাবের মনুষ্য খাদক। শোল, টাকি প্রজাতির মাছেরা ডিম ফোটানোর পর বাচ্চাদের নিয়ে অগভীর পানিতে ঘোরাফেরা করে। বাচ্চাদের রক্ষা করতে এ সময় মা এবং বাবা মাছেরা খুবই অরক্ষিত থাকে। এসময় এক শ্রেণির মানুষ এক বিশেষ প্রজাতির জাল হাতে নিয়ে শ্যান দৃষ্টিতে ঘুরে বেড়ায় অগভীর জলাভূমিতে। বাচ্চাসহ মাছের ঝাক দৃষ্টিগোচর হলে এক ঝটকায় জালে তুলে নেয়। আমরা বাঙালিরা নাকি খুব দয়ালু জাতি। এই কি তবে দয়ার নমুনা? এই পোনামাছ খাবার অভ্যাসটা ত্যাগ করলে কি কোনোরূপ অসুবিধা হবে? দেশের সমস্ত নদী নালা, খালবিল কারেন্ট জালের প্যাঁচে জড়িয়ে আছে। আমাদের বিধ্বংসী আচরণের ফলে মুক্ত পানির জলাশয়ের অনেক মাছ বিলুপ্ত হয়েছে তবুও কারেন্ট জালের বিস্তার থেমে নেই। বিশাল দৈর্ঘ্যের জালে দুই একটা ট্যাংরা পুঁটি হয়তো ধরা পড়ে কিন্তু জাল ভরে থাকে অসংখ্য জলজ সাপ, গুইসাপসহ অন্যান্য জলজপ্রাণি। অকালে প্রাণ হারায় নিষ্পাপ এই প্রাণিজ সম্পদ। যদিও মাছেরা আমাদের খাদ্য। কিন্তু এই রকম ধ্বংসাত্মকভাবে খাওয়ার জন্য নয়। আপনি কি নিজেদের পোষা মুরগিটা তার সমস্ত বাচ্চাসহ একবারে জবাই করে খেয়ে ফেলেছেন? নিশ্চয়ই নয়! তবে মাছেদের জন্য কেন এমন হবে? মাছ ও জলজ প্রাণীরা পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এরা নির্মূল হলে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বেই। আর পড়ছেও!! এইবার আসি পাখিদের কথায়। পাখিদের প্রকৃতির শিশু বলা হয়। কিন্তু এদেরকেও আমরা নিজেদের খাবারের খোরাক বানিয়ে ছেড়েছি! কত রকম পালিত পাখির মাংস আছে এখন বাজারে! কিন্তু তবুও আমাদের লোলুপ নজর চলে যায় তপ্ত দুপুরে ডাকতে থাকা নিরীহ ঘুঘুটির দিকে! এয়ারগান, গুলতি, নানা রকম ফাঁদ নিয়ে ঘুরে বেড়াই ওদের শিকারে পরিণত করতে! একটিবার ভাবি না, পাখিটার বাসায় হয়তো অভুক্ত ছানারা ডানা ঝাপটাচ্ছে আর অপেক্ষা করছে মা পাখিটার জন্য। আমাদের বিবেক যদি পাখি আর বন্য প্রাণীদের জন্য মরে যায়, তাহলে মানুষদের জন্য বাঁচবে কী করে? তাই তো আজ চতুর্দিকে এত নিষ্ঠুরতা! হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে শীতের সময়টাতে আমাদের দেশে ভিড় জমায় পরিযায়ী পাখিরা। আর আমরা বিষ টোপ, নানা রকম জাল, ফাঁদ নিয়ে অপেক্ষায় থাকি তাদের অভ্যর্থনা জানাতে! আবার ওদের নাম দিয়েছি অতিথি পাখি। অতিথিপরায়ণ জাতি হিসেবে নামের পাশে তকমা লাগানো আমাদের এ কেমন নৃশংসতা? সেলফোনের টাওয়ারের বিকিরণ, পাখিদের আবাসভূমি ধ্বংস, রাসায়নিকের অযাচিত ব্যবহার ইত্যাদি নানাবিধ কারণে এমনিতেই পাখি প্রজাতির সংখ্যা দিন দিন কমে আসছে। তার ওপর আমাদের এ হত্যাযজ্ঞ কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেবার মতো। এবার আসি স্তন্যপায়ী বন্য প্রাণীদের কথায়। স্থানীয় বনভূমি অর্থাত্ গ্রামীণ বন ইতিমধ্যেই আমাদের দেশ থেকে বিলীন হয়েছে। সঙ্গে অবধারিতভাবেই গ্রামীণ বন্য প্রাণীরাও। আছে কিছু বিশেষ বনাঞ্চল। ওইগুলোও আছে চরম ঝুঁকির মুখে। বন্য প্রাণী বলতে আমরা শুধু বাঘ, ভালুক, হাতি হরিণকেই বুঝি। এদের রক্ষা করতে রয়েছে আমাদের নানাবিধ প্রকল্প। হচ্ছে প্রচারণা, সেমিনার ইত্যাদি।
কিন্তু আমাদের নিজস্ব গ্রামীণ বণ্যপ্রাণী, যেমন— খাটাস, উদিবড়াল, লেমুর, গন্ধগোকুল, শজারু, বন্য খরগোশ— এদের টিকিয়ে রাখতে কি আমাদের কোনো পদক্ষেপ আছে? এরা না টিকলে ওরাও টিকবে না। সকল প্রকার বন্য প্রাণী ও উদ্ভিদ পরিবেশের অমূল্য উপাদন। এরা একে-অপরের সঙ্গে শিকলের মতো জড়িয়ে আছে। একটা অংশ ছুটে গেলে পুরো শিকলটাই ভারসাম্য হারিয়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে। পরিবেশের বিরূপ প্রভাবের কারণে প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হানছে পৃথিবীতে আর প্রাণহানি এবং সম্পদহানি ঘটাচ্ছে প্রচুর। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস প্রভৃতি রোগের আক্রমণে জীবন বাঁচাতে যদি আমরা নিজেদের অতিপ্রিয় গরু, খাসির মাংস, উপাদেয় মিষ্টির লোভ সংবরণ করতে পারি, তাহলে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে, পরবর্তী প্রজন্মের সুরক্ষার স্বার্থে পরিবেশ ধ্বংসাত্মক খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাত্রার মান পরিবর্তন করতে পারব না?
n লেখক :মুক্তির বন্ধন ফাউন্ডেশনের সদস্য
