বৃহস্পতিবার, ২৬ মে ২০২২, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ফাঁকা ঢাকায় লাল কৃষ্ণচূড়ার রাজত্ব!   

আপডেট : ০৭ মে ২০২২, ১৭:১৭

‘কৃষ্ণচূড়ার বনে লেগেছে আগুন, নবীন বসন্তে আজ মাতাল ফাগুন। কত বৃষ্টি ঝরে গেল নীরবে, নীল আকাশের অঢেল নীলে, সেই তুমি আজ এলে ফিরে। তোমায় পেয়ে মুগ্ধ এমন। মেঘের খেলায় যেন রঙের আগুন, কৃষ্ণচূড়ার বনে আজ মাতাল ফাগুন (মাজুমদার)।’ সত্যি আজ চারপাশে যেন বাসন্তী রঙের আগুণ লেগেছে। মনে হচ্ছে গ্রামের দস্যি মেয়ের দল বাসন্তী শাড়ি পরে, খোঁপায় লাল-হলুদ ফুল গুঁজে এ গ্রাম-সে গ্রাম করছে। হলুদ পাখিরা এ ডাল থেকে ও ডালে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে। এমন দৃশ্য দেখে ভাবুক মন নেচে উঠছে আনন্দে। 

আজ থেকে দুই যুগ আগেও রাজধানী ঢাকায় সকালে-রাতে বিভিন্ন পাখির কিচিরমিচির ও কাকের কা কা শোনা যেত। কিন্তু দিন যত যাচ্ছে হারিয়ে যাচ্ছে সেই পাখপাখালির দল, বিলীন হয়ে যাচ্ছে ওদের অভয়ারণ্য গাছপালা। এক হাত মাটিও যেন ফাঁকা নেই প্রকৃতির জন্য। সবখানেই ইট-পাথরের ঢালাই। মানুষের পদচারণা। কেনই বা থাকবে না, ১৪৬৪ বর্গ কিলোমিটারের এতটুকু শহরে মানুষের সংখ্যা প্রায় সোয়া দুই কোটি। ৫৭ হাজার মাইলের দেশটির অগ্রযাত্রার সবটুকুই এই শহরকে কেন্দ্র করে।যে যেভাবে পারছেন, সে সেভাবে শহরকে বানাচ্ছেন মাথা গোঁজার ঠাঁই। 

দৃষ্টিজুড়ে সবুজের মাঝে লাল কৃষ্ণচূড়া। গণভবন রোড

সবচেয়ে আশ্চর্যজনক হচ্ছে, আমাদের তরুণদের সিংহভাগই স্বপ্ন দেখেন রাজধানীকে কেন্দ্র করে। যদি স্কুলের বাচ্চাদেরও জিজ্ঞাসা করা হয়, তুমি বড় হয়ে কী হবে? সে বলে, ঢাকা গিয়ে পড়াশোনা করে বড় চাকরি করবো, সেখানে বাড়ি করবো, বিয়ে করবো, বাচ্চা নেবো। আমি আর গ্রামে আসবো না। সত্যি তাই, যারা একবার শহরে এসেছেন, বেশিরভাগই শহরকে আঁকড়ে ধরে পড়ে আছেন। মাথা গোঁজার ঠাঁই বানাতে গিয়ে শহরকে করেছেন বিষাক্ত। মাটি, পানি এবং বায়ু সবকটিই দূষণের শেষ সীমানায়। 

ঈদের ছুটিতে বিনোদন প্রেমীদের কৃষ্ণচূড়া দর্শন। চন্দ্রিমা উদ্যান

এমনই মুহূর্তে শহরে এসেছে মুসলমানদের পবিত্র রমজান শেষে ঈদুল ফিতর। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম অধ্যসিত বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় অধিকাংশ মুসলমানদের বসবাস। মাসের পর মাস রাজধানীবাসী কাজে পাগল প্রায়। ঈদুল ফিতরের মতো এমন ধর্মীয় উৎসব যেন তাদের কাছে একটু নিঃশ্বাস ফেলার অভিপ্রায়। এই শহরের অধিকাংশ বাসিন্দাই দেশের বিভিন্ন জেলার। ঈদ উপলক্ষে প্রায় সবাই নাড়ীর টানে বাড়ি ফেরেন। আর এই সুযোগ কাজে লাগায় প্রকৃতি। ফাঁকা শহরে তখন দাপিয়ে বেড়ায় বিভিন্ন রঙের ফুল, সাজিয়ে তুলে শহরকে। লেকের পাড়ে, ব্যস্ত সড়কের পাশে, পার্কে-উদ্যানে বাড়ির ছাদে ফোটে এসব ফুল।   

সবুজ ডানায় ভর করে অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে কৃষ্ণচূড়া। বঙ্গবন্ধু সম্মেলন কেন্দ্র

শহরের জন্য সবচেয়ে রূপবৈচিত্রের মাস চৈত্র-বৈশাখ। এসময় শহরের ইট-পাথরের বাঁধা ভেদ করে নিজের অস্তিত্ব ও সৌন্দর্যের জানান দেয় প্রকৃতি। অলিতে-গলিতে, প্রধান সড়কের পাশ দিয়ে ফুটে থাকে কত লাল-হলুদ, বেগুনী রঙের ফুল। সবচেয়ে চোখে পড়ে লাল কৃষ্ণচূড়া। যখন গাছে ফুলগুলো ফুটে যায়, তখন পুরো গাছটাকেই মনে হয় আস্ত একটি তোড়া। কখনো কখনো প্রেমিক মন ভাবতে পারে কেউ হয়তো পুরো গাছটিকেই তার প্রেয়সীর জন্য লাল-হলুদ ফুল দিয়ে মুড়িয়ে রেখেছেন উপহার হিসেবে।

কৃষ্ণচূড়ার নিচে বাবা-মেয়ের খুনসুটি। চন্দ্রিমা উদ্যান

প্রেমিক মন আবার গেয়ে ওঠে কবিতার দুটো লাইন ‘শুনো, দেখা যদি হয় কোনো একদিন, ভীষণ কোলাহলের এই শহরে, এই কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে বসা হবে, কোনো এক প্রচণ্ড তৃষ্ণার্ত দুপুরে (মো. আব্দুন নূর)।’ ঈদে রাজধানী ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় ভালোবাসার মানুষের হাত চেপে ধরে সেদিন এমন কথাটিই দিয়েছিল প্রেমিক যুগল। আবার দেখা হবে কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে। 

কৃষ্ণচূড়া আর তুমি আমি মিলে একাকার। চন্দ্রিমা উদ্যান

আরও বলেছিল কবিতার ভাষায় ‘যেদিন আমাদের আবার দেখা হবে, সেদিন তুমি বাসন্তী শাড়ি পরে আসবে, কপালে পরবে লাল-হলুদ টিপ। পায়ে থাকবে চটি জুতো-সঙ্গে আলতা, হাতে শাখা-চুড়ি, নাকে নথ, ঠোঁটে লাল লিপিস্টিক। কানে ঝুমকো, আর চুলে খোঁপা করে এসো। আমি তোমার খোঁপায় লাল কৃষ্ণচূড়ার মালা গেঁথে দেবো। তোমার সেই হাসিমাখা মুখ আর কৃষ্ণচূড়ার আবির মিলে একাকার হয়ে যাবে।’

ইত্তেফাক/এআই