বাঁশবাজার থেকে কারওয়ান বাজার

আপডেট : ১০ নভেম্বর ২০২৫, ২১:৩০

সাইনবোর্ডে লেখা ‘কারওয়ান’, আর লোকমুখে অহরহ শোনা যায় ‘কাওরান’। তাহলে কোনটা ঠিক? দেশের বাণিজ্যিক ইতিহাসের অন্যতম কেন্দ্রের নাম নিয়ে এমন দ্বিধায় পড়তে হয় অনেককে। ব্যাকরণবিদেরা বলছেন, ধ্বনি বিপর্যয়ের কারণে ‘কারওয়ান’ হয়ে গেছে ‘কাওরান’। তবে বানানেই শুধু নয়, বাজারটি চলছেও প্রচলিত নিয়মের উলটো দিকে। নগরবাসী ঘুমিয়ে পড়লেই জেগে ওঠে নিশাচরের মতো। রাতভর হাজারো মানুষের কোলাহল, কর্মব্যস্ততায় লাভক্ষতি, রহস্যময় লেনদেন আর জীবনের জটিল হিসাব-নিকাশের খেলায় মুখর হয়ে ওঠে।

গবেষণার তথ্য বলছে, কারওয়ান বাজার আগে ছিল সরাইবাড়ী, পথিক ও বণিকদের আশ্রয়স্থল। দূরপথের ক্লান্ত কাফেলা-যাত্রীরা এখানে রাত কাটাতেন। আশীর্বাদ পেতে মোগল আমলে নির্মিত মসজিদে অবস্থান করতেন। পুরান ঢাকার লোককথায় বলা হতো, ‘কারওয়ান বাজারের রাত মানে কাফেলার ঘুম।’ ঢাকার নগর-সাংস্কৃতিক গবেষণায় বাজারটিকে ‘যাযাবর সংস্কৃতির জীবন্ত উত্তরাধিকার’ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়। ২৫০ থেকে ৩০০ বছরের দীর্ঘ পথচলায় যা বর্তমানে ঢাকার অন্যতম বাণিজ্য হাব আর দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ বাজারে পরিণত হয়েছে।

ইতিহাস

গবেষকদের মতে, মোগল আমলের রাজধানী হিসেবে ঢাকার আভিজাত্য থাকলেও কারওয়ান বাজার ছিল প্রান্তিক। ১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধের পর ব্রিটিশ শাসকরা নগর কাঠামো পুনর্গঠন শুরু করলে পুরান ঢাকা থেকে ব্যবসা-বাণিজ্য উত্তর-পশ্চিমে ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় নৌপথের সংযোগস্থল হিসেবে কারওয়ান বাজার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অদূরে তুরাগ নদ, পূর্বদিকে পুরান ঢাকার ঘন জনপদ পরিবেষ্টিত নগরের পশ্চিমে প্রসারিত হয় নতুন বাণিজ্যপথ। অবস্থানগত এসব সুবিধা নিয়েই বিকাশ ঘটেছিল বাজারটির। ১৮ শতকের আগে স্থানটি বাঁশবাজার নামে পরিচিত ছিল।

সকালের প্রাণচঞ্চল কারওয়ান বাজার। ছবি: শাকিরুল আলম শাকিল

ইতিহাসবিদ ও গবেষক মুনতাসীর মামুনের মতে, মোগল আমলে পত্তন হওয়া কাওরান বাজারে স্থাপিত নিরাপত্তাচৌকিতে (থানা) শহরে ঢোকার মুখে সবাইকে চেক করা হতো। ঐতিহাসিক ও পুরাতত্ত্ববিদ সৈয়দ মোহাম্মদ তাইফুরের উদ্ধৃতি তুলে ধরে গবেষক মামুন জানান, চৌকির পাশে ছিল কারওয়ান সরাই বা সরাইখানা। পথিকেরা সেখানে জিরিয়ে নিতেন, খাওয়া-দাওয়া করতেন কখনো অবস্থান করতেন। মাঝে মধ্যে বণিকেরা কাফেলা (কাঁরাভা বা কারাভান) নিয়ে আসার সময় চৌকিতে নামতেন।

নামের বিতর্ক

কারওয়ান বাজার নামের উত্পত্তি নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ ও বিতর্ক আছে। যা এখনো অসমাপ্ত। ইতিহাসবিদ আর স্থানীয় জনশ্রুতির মধ্যেও রয়েছে অনেক ফারাক। উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, মধ্যযুগে প্রাচীন ভারতের অন্যতম শক্তিশালী মহাজনপদ মগধ থেকে বাংলার বাণিজ্যপথে আসত উটের কাফেলা, ঘোড়ার গাড়ি কিংবা নৌযান পণ্যবাহী কাফেলা। সেগুলো কারওয়ান বাজার স্থানটি অতিক্রম করতে গিয়ে বিরতিস্থল বা ‘সরাই’ হিসেবে বেছে নিত। ব্যবসায়ী কাফেলা বা সরাইবাড়ীর ফারসি নাম ‘ক্যারাভাঁ। সেই নাম প্রথমে ‘ক্যারভাঁন’, এরপর ‘ক্যারাভান’ হয়। যুগ যুগ ধরে কাফেলার সেই বিরতিস্থানটিই পরিচিত হয় ক্যারাভান বাজার বা ‘কারওয়ান বাজার’ নামে।

ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন তার ‘ঢাকা স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী’ বইতে লিখেছেন, খুব সম্ভবত কারওয়ান সরাই কালক্রমে কাওরান বাজার হিসেবে পরিচিতি পায়। একই মতামত ঐতিহাসিক ও পুরাতত্ত্ববিদ সৈয়দ মোহাম্মদ তাইফুরেরও। তবে অন্য অনেক গবেষকের মতে, ১৮ শতকের শেষভাগে বাঁশবাজারে প্রথম বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করেছিলেন মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী ‘কারওয়ান সিং’। পণ্যের পাইকারি বেচাকেনার জন্য একাধিক আড়তও স্থাপন করেছিলেন। যা শহরের ব্যাবসায়িক বিন্যাসে অনেক গুরুত্ব পায়। ফলে বাঁশবাজারকে কারওয়ান সিংয়ের বাজার বলে ডাকতে শুরু করেন স্থানীয়রা। কালক্রমে যা ‘কারওয়ান বাজার’ হয়ে যায়। বিজ্ঞানী ও গবেষকদের বাণিজ্যিক সামাজিক নেটওয়ার্কিং সাইট জার্মানভিত্তিক রিসার্চগেটে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রেও একই ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।

বাজার থেকে ব্যবসার হাব

১৮৬৯ সালে প্রণীত ব্রিটিশ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক নথি ‘ঢাকা গেজেটিয়ারে’ কারওয়ান বাজারকে অভ্যন্তরীণ ব্যবসায়ীদের জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক স্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই সময় থেকেই সেখানে পণ্যের গুদামঘর গড়ে উঠতে শুরু করেছিল। ১৮৮৫ সালে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেলপথ চালুর পর বাজারে রেলসংযোগ ঘটে। ফলে পণ্য পরিবহন আরো বেশি সহজ হয়। ফলে বাজারটি নদী ও রেল যোগাযোগের হাব হয়ে ওঠে।

 কোলাহল, লাভক্ষতি, রহস্যময় লেনদেন আর জীবনের জটিল হিসাব-নিকাশের খেলায় মুখর থাকে কারওয়ান বাজার। ছবি: ইত্তেফাক

রিসার্চগেটে ২০১৫ সালে প্রকাশিত কারওয়ান বাজারবিষয়ক গবেষণাপত্রে গবেষক মার্কুস কেক বলেছেন, ঊনবিংশ শতকের শেষ দিকে বাজারটি গৃহস্থালির সামগ্রী, তথা মাটির হাঁড়ি-পাতিল ও চীনামাটির পাত্র বেচাকেনার বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি পায়। বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাজারটি রেললাইনের ধারে স্থানান্তিত হলে গতি বাড়ে। বিগত সত্তরের দশকে বুড়িগঙ্গাকে বালু নদীর সঙ্গে যুক্ত করে প্রচুর নৌপথ থাকায় বেশির ভাগ পণ্য নৌকায় করে কারওয়ান বাজারে আনা হতো। ১৯৮৪ সালে তত্কালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বাজারটিকে ঢাকার দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার ঘোষণা দেন।

ঢাকার অন্যতম বাণিজ্য হাব আর দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ বাজারে পরিণত হয়েছে বাজারটি। ছবি: শাকিরুল আলম শাকিল

মিডিয়াপাড়া

ট্রাকের হর্ন, সবজির ঝাঁপি নিয়ে ছুটাছুটি, আড়তের দরদামের কোলাহলের মধ্যে নীরব আরেকটি যুদ্ধ চলে একুশ শতকের শুরু থেকে কারওয়ান বাজারে স্থাপিত দেশের বড় বড় সংবাদমাধ্যমের অফিসে। কেউ প্রতিবেদন লিখছেন, কেউ প্রতিবেদন জমা দিয়ে একুশের গলিসহ চায়ের দোকানগুলোতে আড্ডায় মেতে উঠেছেন। কেউ কেউ আবার ছুটে যাচ্ছেন ঘটনাস্থলে। পরদিনের লিড নিউজ নিয়ে ভাবছেন বার্তা প্রধানরা। রাত যত বাড়ে মুখর হয় ঢাকার নিউজ হাব খ্যাত কারওয়ান বাজারের মিডিয়া অফিসগুলো। টকশোতে যুক্তিতর্ক বাড়ে, খবরে খবরে ভরে উঠতে থাকে পত্রিকার পাতা। ঢাকা যত নিস্তব্ধ হয়, ততটাই উজ্জ্বল হয় কারওয়ান বাজার মিডিয়াপাড়ায় নিউজের আলো। একদিকে ব্যবসার কোলাহল, অন্যদিকে খবর তৈরির নিরবচ্ছিন্ন উত্তাপ—বাজারের ব্যস্ত সময়কে বন্দি করে অদ্ভুত এক ছন্দে।

নিরাপত্তাহীনতার কারণ দেখিয়ে ২০২৪ সালে বাজার স্থানান্তরের উদ্যোগ নেয় ডিএনসিসি। ছবি: শাকিরুল আলম শাকিল

স্থানান্তরের উদ্যোগ

কারওয়ান বাজারে সাড়ে ২৪ বিঘা জমিতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) পরিচালিত চারটি মার্কেটের সবগুলোই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। যেগুলো ভেঙে দিয়ে বাণিজ্যিক হাব তৈরির পরিকল্পনা করেছে ডিএনসিসি। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশসহ নিরাপত্তাহীনতার কারণ দেখিয়ে ২০২৪ সালে বাজার স্থানান্তরের উদ্যোগ নেয় সংস্থাটি। প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে মহাখালীতে বিশাল মার্কেট নির্মাণ করা হয়। আরেকটি মার্কেট গড়ে তোলা হয় গাবতলীতে।

২০২৪ সালের মার্চ মাসে বাজারের মোট ১ হাজার ৭৮৯টি দোকানের মধ্যে প্রথম ধাপে ২৫৬টি দোকান সরানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যার মধ্যে গাবতলীতে ১৭৬টি ও আমিনবাজার বা যাত্রাবাড়ীতে ১৮০টি দোকান সরাতে নোটিশও দেওয়া হয়। এমনকি, একই বছরের ২৮ মার্চ ডিএনসিসি তাদের নিজস্ব আঞ্চলিক কার্যালয়টিও সরানোর কাজ শুরু করে দেয়। তবে নতুন স্থানে ব্যবসার ধারা ও সুযোগের অনিশ্চয়তায় ব্যবসায়ীরা বেঁকে বসেন। তারা যুক্তি দেখান, নতুন স্থানে গেলে ক্রেতা কম হবে, ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। এ ঘটনায় ডিএনসিসির উদ্যমে অনেকটা ভাটা পড়ে। তবে বিগত সরকারের পতনের পর এ নিয়ে নতুন আর কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

ইত্তেফাক/এসএএস

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন