চলতি একাদশ সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসনে লিখিত চুক্তি করে জাতীয় পার্টির (জাপা) মনোনয়ন দেওয়ার ঘটনাকে অনেকে তুলনা করছেন ওয়ান ইলেভেনের স্টাইলের সঙ্গে। দলের সঙ্গে লিখিত ‘অঙ্গীকার’ করে মনোনয়ন নিয়ে এমপি হওয়ার পর সেই অঙ্গীকার পূরণ না করায় সংরক্ষিত আসনে দলের নারী সংসদ সদস্য প্রফেসর মাসুদা এম রশীদ চৌধুরীকে শোকজ নোটিশ প্রদান এবং তাকে দল থেকে বহিষ্কারের হুমকি দেওয়ার ঘটনায় খোদ দলটির দায়িত্বশীল অনেক নেতা বিস্মিত। গত দুই দিনে জাপার প্রেসিডিয়ামের বেশ কজন সদস্যসহ দলটির কেন্দ্রীয় অনেক নেতা ইত্তেফাকের সঙ্গে পৃথক আলাপকালে মন্তব্য করেন, ‘কথিত ওয়ান-ইলেভেনের সময় যেভাবে ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে ব্ল্যাংক চেকে স্বাক্ষর এবং লিখিত অঙ্গীকারনামা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল— ঠিক একই কায়দায় জাপাতেও অঙ্গীকারনামা নিয়ে নারী এমপি পদে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।’
জাপার এই নেতাদের মতে, সংরক্ষিত মহিলা আসনে আনুপাতিক হারে পাওয়া চারটি আসনে জাপার মনোনয়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে যে আট নেতা দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন তাঁরা ওয়ান-ইলেভেনের সেই কৌশল অনুসরণ করে লিখিত অঙ্গীকারনামা আদায় করে নেন। মাসুদা এম রশীদ চৌধুরীকে জাপা মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা যে নোটিশ দিয়েছেন সেটিতেই তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘একাদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসন নির্বাচনে— জাতীয় পার্টির শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দের ফোরামে কিছু শর্ত সাপেক্ষে আপনাকে মনোনয়ন প্রদান করা হয়। যার কপি জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে সংরক্ষিত আছে। আপনার স্বাক্ষরিত পার্টিসংক্রান্ত অঙ্গীকারপত্রও আছে। কিন্তু অতীব দুঃখের বিষয়— আপনার দেওয়া অঙ্গীকারগুলো আপনি যথাযথভাবে পালন করেননি।’ ইত্তেফাকের সঙ্গে কয়েক দফায় আলাপকালেও রাঙ্গা বলেছেন, ‘মনোনয়ন প্রদানের জন্য গঠিত ওই আটজনের কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন পার্টির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জি এম কাদের।
জি এম কাদেরের নেতৃত্বে ওই আটজনের কমিটিতে অন্যদের মধ্যে ছিলেন : দলের মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা, প্রেসিডিয়াম সদস্য লে. জে. (অব) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী, গোলাম কিবরিয়া টিপু, ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারি ও অ্যাডভোকেট শেখ সিরাজুল ইসলাম।
এদিকে অঙ্গীকার ভঙ্গ করায় এমপি মাসুদা এম রশীদ চৌধুরীকে কেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্যসহ সকল পদ-পদবি থেকে বহিষ্কার করা হবে না, ১০ দিনের মধ্যে তা লিখিতভাবে জানাতে বলা হয়েছে নোটিশে। জাপা মহাসচিব ও সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মসিউর রহমান রাঙ্গা ইত্তেফাককে বলেছেন, ‘পার্টি চেয়ারম্যান আমাকে বলেছেন— ১০ দিনের মধ্যে ওনাকে (মাসুদা এম রশীদ চৌধুরীকে) দল থেকে বহিষ্কার করে দিতে। বহিষ্কার করলে আমরা নির্বাচন কমিশনে (ইসিতে) চিঠি দিয়ে দেব, যেন ওনার সংসদ সদস্য পদ খারিজ করা হয়।’ তবে আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, দল বহিষ্কার করলেও কারো সংসদ সদস্য পদ যাবে না।
সংসদ সদস্য পদ বাতিলের বিষয়ে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘কোন নির্বাচনে কোন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোন ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি (ক) উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন, অথবা (খ) সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন, তাহা হইলে সংসদে তাঁহার আসন শূন্য হইবে।’
‘অঙ্গীকার’-এর যে ব্যাখ্যা দিলেন রওশন আরা মান্নান
গতকাল ইত্তেফাকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ছাপা হয়েছে, “বর্তমান সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসনে জাপার আরেক এমপি অধ্যাপিকা রওশন আরা মান্নান ইত্তেফাককে বলেন, ‘লিখিত অঙ্গীকার কী আছে কী নেই, সেটা বিষয় নয়। আমার সঙ্গে দলের যে অঙ্গীকার ছিল আমি সেটা পূরণ করে দিয়েছি।” এ ব্যাপারে রওশন আরা মান্নান গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘অঙ্গীকার বলতে আমি কোনো টাকা-পয়সার বিষয় ইঙ্গিত করিনি।’
