শনিবার, ২১ মে ২০২২, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

‘একটি কথা বলব সুরে সুরে...’

আপডেট : ১০ মে ২০২২, ০৯:৩৯

‘তোমারে লেগেছে এত যে ভালো চাঁদ বুঝি তা জানে’—গানটি প্রথম শুনেছি খুব ছোটবেলায় আমার মায়ের মুখে। বড় হয়ে শুনেছি—মা নাকি এই গানটি গেয়ে আমাকে ঘুম পাড়াতেন। গানটির গীতিকার কে জি মোস্তফার নাম জানতে পারি অনেক পরে, যখন রেডিও শুনতে শুরু করলাম। কে জি মোস্তফার লেখা আরো দুটি গান আমাকে মুগ্ধ করত। একটি হলো, ‘আয়নাতে ঐ মুখ দেখবে যখন/কপোলের কালো তিল পড়বে চোখে’ এবং অন্যটি হলো, ‘তোমরা যাদের মানুষ বলো না/বিধিও যাদের কান্না শোনে না।’ তখন কি আর জানতাম—এমন একজন খ্যাতিমান ব্যক্তির সঙ্গে আমার পরিচয় হবে? পরিচয়সূত্রটা একটু ভিন্ন রকম। কে জি মোস্তফা তখন চলচ্চিত্র প্রকাশনা অধিদপ্তর থেকে প্রকাশিত ‘সচিত্র বাংলাদেশ’-এর সম্পাদক। ডাকে লেখা পাঠাতাম। সে লেখাও সচিত্র বাংলাদেশে ছাপা হতো।

১৯৯৪ সালে আমার চাকরিক্ষেত্র হয় সেগুনবাগিচা। চলচ্চিত্র প্রকাশনা অধিদপ্তর বেশ কাছে হওয়ায় একদিন একটি কবিতা নিয়ে কে জি মোস্তফার সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করতে যাই। তিনি আমার হাত থেকে লেখাটি নিয়ে বসতে বললেন। তিনি বললেন, ‘আপনাকে কেন বসতে বলেছি আপনি হয়তো জানেন না।’ আমি অবাক হয়ে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। তিনি বললেন, ‘বসতে বলেছি—কারণ আগামীতে এই চেয়ারটিতে আমি থাকছি না। আপনি হয়তো লক্ষ করেছেন আপনার সবগুলো লেখা আমি ছেপেছি। কারো মুখ দেখে লেখা ছাপি না। লেখা দেখেই ছাপি।’

সুযোগ পেয়ে আমি আমার মায়ের কথাটা বললাম, সেই ষাটের দশকের কথা। তিনি একটু হেসে বললেন, এই গানটি দিয়ে সত্যি আমি মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি। এরপরেই তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা গাঢ় হয়ে গেল। আমার অতি প্রিয় কাছের মানুষ কে জি মোস্তফা পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও তাঁর অমর সৃষ্টি রয়ে গেছে বাংলাদেশের হাজারো মানুষের হূদয়ে। এই গীতিকবির জন্ম ১৯৩৭ সালের ১ জুলাই নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে তাঁর মাতুলালয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন ১৯৬০ সালে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র থাকাকালে তাঁর লেখা গান গেয়েছেন আঞ্জুমান আরা বেগম, ফেরদৌসী রহমান, মোস্তাফা জামান আব্বাসী, সৈয়দ আবদুল হাদী প্রমুখ।

ফজলুল হক হলে যখন থাকতেন, তাঁর দুই বছরের সিনিয়র কবি ও শিক্ষাবিদ আবু হেনা মোস্তফা কামালের অনুপ্রেরণায় তিনি গান লিখতে শুরু করেন। সে সময় এহতেশাম পরিচালিত ‘রাজধানীর বুকে’ ছায়াছবির জন্য গান লিখে খ্যাতি অর্জন করেন। গানটিতে সুর করেছিলেন রবীন ঘোষ এবং কণ্ঠ দিয়েছিলেন তালাত মাহমুদ। রবীন ঘোষের সুরে ‘নাচের পুতুল’ ছায়াছবির জন্য লেখেন ‘আয়নাতে ঐ মুখ দেখবে যখন’, যে গানে কণ্ঠ দিয়েছিলেন মাহমুদুন্নবী।

গানের কবি কে জি মোস্তফা কর্মজীবন শুরু করেন ১৯৫৮ সালে দৈনিক ইত্তেহাদে শিক্ষানবীশ সাংবাদিক হিসেবে। এরপর দৈনিক মজলুমে সাংবাদিক হিসাবে কাজ করেন। পত্রিকাটি বন্ধ হলে দীর্ঘ বিরতির পর ১৯৬৮ সালে সাপ্তাহিক জনতা পত্রিকার সহকারী সম্পাদক হিসাবে যোগ দেন। স্বাধীনতার পর দৈনিক গণকণ্ঠ ও পরে দৈনিক স্বদেশ পত্রিকার চিফ রিপোর্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর কূটনৈতিক প্রতিবেদক ছিলেন দৈনিক জনপদে। ১৯৭৬ সালে বিসিএস (তথ্য) ক্যাডারভুক্ত হন এবং চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরে সহকারী সম্পাদক পদে যোগদান করেন। ১৯৯৬ সালে সিনিয়র সম্পাদক (যুগ্মসচিব পদমর্যাদা) হিসেবে অবসরে যান। একাধারে তিনি কবি, গীতিকার, কলাম লেখক, শিশুসাহিত্যিক এবং নাটক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ—কাছে থাকো ছঁুয়ে থাকো, উড়ন্ত রুমাল, চক্ষুহীন প্রজাপতি, সাতনরী প্রাণ, আয়নাতে ঐ মুখ দেখবে যখন, এক মুঠো ভালোবাসা, প্রেম শোনে না মানা, কোথায় চলেছি আমি, শিশু তুমি যিশু, কন্যা তুমি অনন্যা, মজার ছড়া শিশুর পড়া ইত্যাদি। এছাড়াও তাঁর বেশ কিছু গানের সিডি ও ক্যাসেট রয়েছে। সহকারী পরিচালক হিসাবে বেশকিছু সিনেমায় কাজ করেছেন। সেগুলোর মধ্যে আছে ‘মায়ার সংসার’, ‘অধিকার’, ‘গলি থেকে রাজপথ’ প্রভৃতি।

‘মনের মানুষ’ চলচ্চিত্রে বশির আহমদের সুরে রুনা লায়লা গেয়েছেন, ‘একটি কথা বলব সুরে সুরে ভাবি মনে মনে...’। তাঁর আরো দুটি গানের কথা বলি। একটি হলো, মোহাম্মদ আবদুল জব্বারের কণ্ঠে ‘তুমি আছ কাছে তুমি আছ আশেপাশে’ এবং অন্যটি হলো, ‘কোকিল কেন যে আজ এত সুর সাধে/পূর্ণিমা গেছে কাল/ভাঙন ধরেছে চাঁদে’। কে জি মোস্তফার এসব গানের কথায় যে কাব্য আছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কীর্তিমান এই কবি ও গীতিকার বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পদক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংগীত বিভাগ কতৃ‌র্ক ‘দেশবরেণ্য গীতিকার’ পদকসহ বহু পদকে ভূষিত হয়েছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য, তিনি রাষ্ট্রীয় কোনো পুরস্কার পাননি। তিনি অবশ্য বলতেন, মানুষের ভালোবাসাই আমার পুরস্কার। তবু আজ তাঁর উদ্দেশে একটি কথাই বলতে চাই—আমাদের ভালোবাসা নিয়ে আপনি যেখানেই থাকুন, ভালো থাকুন, শান্তিতে থাকুন।

লেখক: কবি, গীতিকার ও শিশুসাহিত্যিক

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

উজ্জ্বল নক্ষত্র রণজিত নিয়োগী