বুধবার, ০৫ অক্টোবর ২০২২, ২০ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ইউক্রেনের লড়াই আমাদের লড়াই

আপডেট : ১১ মে ২০২২, ০৯:৩৯

ইউক্রেনে যুদ্ধ আধুনিক বিশ্ব সম্পর্কে আমাদের মনোভাব এবং অনুমানের পুনঃনিরীক্ষারই কথা বলছে। গত ছয় সপ্তাহে বিশ্বে ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির একটি আমূল পুনর্বিন্যাস ঘটেছে। সমসাময়িক ভূরাজনীতিকে নিয়ন্ত্রকারী খেলোয়াড়দের অদলবদল ঘটেছে। অবশেষে বিশ্ব এখন সত্যিকারের রাশিয়াকে চিনতে পারছে।

বিশ্ব কয়েক দশক ধরে রাশিয়া সম্পর্কে অপ্রীতিকর সত্য থেকে তার দৃষ্টি আড়াল করে রেখেছিল। পোল্যান্ডের নাগরিকেরা রাশিয়ার হাতে ট্র্যাজেডির পর ট্র্যাজেডির শিকার হয়েছে এবং বিভাজন, দাসত্ব, সাইবেরিয়ান নির্বাসন, ক্যাটিন গণহত্যা, গুলাগস ও কমিউনিজমের অধীনে জীবন যাপন করতে বাধ্য হয়েছে। এসবকে রুসোফোব বা রাশিয়াভীতি বলে পাত্তা দেওয়া হয়নি। কিন্তু আমরা যে বিষয়গুলো নিয়ে বিশ্বকে কয়েক বছর ধরে সতর্ক করে আসছি, তা এখন প্রকাশ্যে চলে এসেছে। এসেছে গণকবরের আকারে এবং ইউক্রেন জুড়ে নির্মমভাবে বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা করার মাধ্যমে।

রাশিয়া ও রাশিয়ানরা কী না করতে পারে, তা আজ বিশ্ব দেখতে পাচ্ছে। আমি এখানে স্পষ্টভাবে রাশিয়ানদের উল্লেখ করছি, কারণ ইউক্রেনের সংঘাত কেবল পুতিনের যুদ্ধ নয়। এর প্রভাব একক ব্যক্তির থেকেও অনেক বেশি বিস্তৃত, ঠিক যেমনটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারই একমাত্র মানুষ ছিলেন না, যিনি ভয়াবহতার জন্য দায়ী। কোনো একক ব্যক্তি এ ধরনের নৃশংস ঘটনার পেছনে একমাত্র অপরাধী হিসেবে কাজ করে না। রাশিয়ায় যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা কাজ করছে, তা পাগলামি ছাড়া আর কিছু নয়। এটি যেমন অপ্রত্যাশিত, তেমনি মানবতার জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ।

বিশ্ব এই নগ্ন বর্বরতার আভাস দিয়ে যাচ্ছে। তবু এখনো এই সত্য পুরোপুরি বুঝতে পারছে না অনেকে। যদিও এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে ভয়ানক কিছু ঘটছে এবং সেই বিপদের উত্স হলো রাশিয়া। বিশ্ব এখনো রাশিয়ার আগ্রাসনের পরের পরিণতি মেনে নিতে নারাজ। অনেকের কাছে মনে হচ্ছে, ক্ষতি খুব সামান্যই হবে। অথচ বাস্তবে ইউক্রেনীয়দের এবং সম্ভবত মেরু ও বাল্টিক রাষ্ট্রগুলোকে এর জন্য চরম মূল্য দিতে হবে।

এই ক্ষয়ক্ষতি থেকে রাশিয়াকে বিরত রাখার কাজটি মোটেও সহজ নয়। আমরা যদি একযোগে কাজ না করি, তাহলে বিপর্যয়কর পরিস্থিতি এড়ানো যাবে না—এটিই প্রথম বাস্তবতা, যা আমাদের ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রে মেনে নিতে হবে। যতক্ষণ না আমরা রাশিয়াকে থামাব, ততক্ষণ রাশিয়া থামবে না। রাশিয়া ইউক্রেন বা পোল্যান্ডে জিতলে শুধু এতেই স্থির থাকবে না। তখন মিউনিখ, বার্লিন ও লিসবনে রাশিয়ার শ্যেনদৃষ্টিতে পড়বে, যদি না আমরা এর বিরুদ্ধে শক্তভাবে না দাঁড়াই। অ্যাঙ্গেলা মার্কেল যুক্তি দিয়েছিলেন যে রাশিয়ার সঙ্গে সংলাপে জড়িত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। আলাপ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে যোগাযোগ করা ঠিক ততটাই অত্যাবশ্যক। রাশিয়ার শাসনব্যবস্থা বোঝে শুধু শক্তির যুক্তি। ইউরোপসহ সমগ্র বিশ্বে এ ধরনের শক্তি প্রদর্শনের দায়িত্ব রয়েছে আমাদের।

এই যুদ্ধের দ্বারা উন্মোচিত দ্বিতীয় মূল্যবান সত্যটি আমি সাহস করে না বলে পারছি না। তা হলো, কেবল বিদ্যমান ক্ষমতার ভারসাম্যই নয়, যার ওপর আমাদের পশ্চিমা সভ্যতা প্রতিষ্ঠিত, তার প্রতিও গুরুত্ব দিতে হবে। যে কোনো জাতির অস্তিত্ব নাগরিকদের দেশপ্রেমের ওপর নির্ভর করে। দেশপ্রেম আত্মরক্ষার জন্যই জরুরি। আমি জানি না আজ প্রতিটি ইউরোপীয় সম্প্রদায়, প্রতিটি সমাজ বা প্রতিটি রাষ্ট্র তার নাগরিকদের জীবনের মূল্য দিয়ে তাদের সম্প্রদায়ের অখণ্ডতা রক্ষা করতে প্রস্ত্তত কি না। ইউক্রেনের বাইরেও এই জাতীয় দেশপ্রেম আজকাল আর ফ্যাশনসর্বস্ব হলে চলবে না। ইউক্রেনীয়রা দেখিয়েছে যে তাদের সমাজকে রক্ষা করার জন্য তাদের চূড়ান্ত ত্যাগ-তিতিক্ষা দিতে প্রস্ত্তত থাকতে হবে, স্বদেশের জন্য প্রয়োজনে জীবন দিতে হবে। তারা দেখিয়েছে যে এই বিশ্বাসের কারণেই এখন পর্যন্ত তারা পুতিনকে পরাজিত করতে পেরেছে। তাদের যৌথ সাংস্কৃতিক পরিচয় ও সাংস্কৃতিক পটভূমিই তাদের এ ধরনের আত্মত্যাগে সক্ষম করে তুলেছে। নিজের মাতৃভূমিকে রক্ষা করার অর্থ হলো নিজের স্বার্থ, নিজের পরিবার, নিজের সন্তান এবং যে জিনিসগুলো সবচেয়ে প্রিয় তা রক্ষা করা। তারা এই সচেতনতা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছে।

যদিও কেউ কেউ আমাদের পোলিশ বা ইউক্রেনীয় দেশপ্রেমকে জাতীয়তাবাদের ব্র্যান্ড, এমনকি অরাজকতা হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করে থাকে। তবে এটি স্বদেশের প্রতি ভালোবাসা ছাড়া আর কিছুই নয়। ইউক্রেনীয়দের মতো আমরা পোলান্ডের জনগণ জানি যে এই মনোভাব আমাদের সমাজের ভবিষ্যতের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এটা স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে যে, ইউক্রেনের জনগণ দেশপ্রেমের মধ্যে বড় ধরনের শক্তি খুঁজে পাচ্ছে, যা তাদের ভূরাজনৈতিক খেলার নিয়ম পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন।

সারা বিশ্ব আশা করেছিল ইউক্রেনে আগ্রাসন চালানোর তিন দিনের মধ্যে রাশিয়ানরা কিয়েভ দখল করে ফেলবে, একটি পুতুল সরকার প্রতিষ্ঠা করবে এবং এর মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ হবে। যদি বাস্তব জীবনে এই দৃশ্য দেখা যেত, যদি তিন দিনের মধ্যে মন্দকে জয়ী হতে দেওয়া হতো, তাহলে পুতিন ইউরোপের দরজায় বিজয়ী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন, আত্মসমর্পণের নির্মম শর্ত আরোপ করতে প্রস্ত্তত হতেন। জার্মানরা সম্ভবত তাদের দোরগোড়ায় রাশিয়ান সৈন্যদের মোকাবিলা না করে ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে চলে যেত। কিন্তু তারা দেশত্যাগ করেনি! তাদের পালাতে হয়নি; অন্য কেউ নাটকের স্ক্রিপ্টটি নতুন করে লিখে দিয়েছে।

ইউক্রেনীয়রা তাদের জাতির জন্য তাদের জীবন বিস্ময়করভাবে উত্সর্গের মাধ্যমে এ ধরনের নিয়তিবাদের বিপদ কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হচ্ছে। দেশপ্রেমের (জাতীয়তাবাদ নয়! অরাজকতা নয়!) মাধ্যমে বিশ্বে আশার আলো আনা যায়। বর্তমান সংঘাতে আবিভূ‌র্ত হওয়া তৃতীয় বাস্তবতাটি হলো যদিও আমরা পোলরা ইউক্রেনের দেশপ্রেমের প্রবণতাকে সতেজ ও তরতজা হিসেবে দেখছি, তবে এটি রাশিয়ানদের জন্য একটি বেদনাদায়ক আঘাত। তারা ইউক্রেনীয় দেশপ্রেমকে নাত্সিবাদ, জাতীয়তাবাদ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নৃশংস ব্যান্ডারিস্ট আন্দোলনের রঙে আঁকতে চেয়েছিল। আমরা আশা করি ইউক্রেনীয় সমাজের ওপর ভিত্তি করে নতুন পৌরাণিক কাহিনি তৈরি হবে। এটি বর্তমানে আমাদের চোখের সামনেই পুনর্গঠিত হচ্ছে। আধুনিক, পরিপক্ব, গণতান্ত্রিক ও ইউরোপীয় মূল্যবোধের মধ্যে নিখুঁতভাবে যা প্রোথিত হবে। আমি বিশ্বাস করি যে এটি একটি প্রবণতা, যা আমাদের সবার সমর্থন করা উচিত। পুতিনের প্রোপাগান্ডা মেশিনের মাধ্যমে প্রচারিত মিথ্যাকে সমর্থন করা উচিত নয়।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, অস্ত্র প্রযুক্তির বিশ্ব এতটাই পরিবর্তিত হয়েছে যে, আজকাল যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অত্যন্ত কার্যকর হয়ে উঠেছে। আমার মতে, ইলেকট্রনিক অস্ত্র, অ্যান্টি-ট্যাংক ও অ্যান্টি-এয়ারক্রাফ্ট অস্ত্রের পাশাপাশি ড্রোন প্রযুক্তি সমসাময়িক যুদ্ধের চেহারাই বদলে দিয়েছে। লোহা ও ধাতব ট্যাংকের বিশাল স্তম্ভ এবং সৈন্যদের বিশাল ট্যাংকগুলো আধুনিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, উচ্চ প্রশিক্ষিত, নৈতিক ও দেশপ্রেমে অনুপ্রাণিত ভ্রাম্যমাণ ডিফেন্ডারদের ছোট দলগুলোর কাছে তেমন কোনো হুমকি নয়। প্রচলিত সেনাবাহিনীর প্রথাগত আক্রমণাত্মক কৌশল এখন অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করা যেতে পারে। প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ও প্রশিক্ষণ (আমরা জানি যে ইউক্রেনীয়রা ন্যাটো দেশগুলোর বিশেষজ্ঞদের দ্বারা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়েছে) সমসাময়িক বিশ্বের স্থিতাবস্থা পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। এই যুদ্ধ যেভাবেই ঘটুক না কেন, রাশিয়ান সেনাবাহিনী ইতিমধ্যে অসম্মানিত হয়েছে এবং তার অপরাজেয়তার আভা কেড়ে নেওয়া হয়েছে—এটি ভূরাজনৈতিক ব্যবস্থায় একেবারে একটি নতুন পরিবর্তনশীল রূপ।

কিয়েভের পার্শ্ববর্তী শহর বুচায় সংঘটিত ভয়াবহ গণহত্যা আবিষ্কারের ব্যাপারে আমাদের উদাসীন থাকা অসম্ভব। এবং এখান থেকেই এই আশার জন্ম দেয় যে, বিশ্বব্যাপী জনমত মন্দের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হবে এবং নিজ নিজ দেশের সরকারকে বাস্তব পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করবে। তাই আমি এটাও আশা করি যে, মন্দের প্রতি মৌলিক মানবিক প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী উভয়েই ইউক্রেনে যা ঘটছে তার নিন্দা না করে পারবে না। বরং এই নতুন ‘অশুভ সাম্রাজ্য’ সম্পর্কে তারা আরো ঐকমত্য পোষণ করবে। মন্দের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হলে বিশ্বকে বাস্তব ও দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে, সেটা যতই কঠিন হোক না কেন। আমরা যদি তা করতে ব্যর্থ হই, তাহলে জার্মান ও ইউরোপীয়রা সাবধান! পৃথিবীর সবচেয়ে প্রত্যন্ত কোণে পালিয়ে গেলেও আমাদের শেষ রক্ষা হবে না। তাই আমাদের এখনই কাজ করতে হবে। ইউক্রেনীয়রা তাদের বীরত্ব ও সাহসিকতার মাধ্যমে আমাদের যে মূল্যবান সময় দিয়েছে, তার সদ্ব্যবহার করতে হবে।

ওপরে বর্ণিত কারণগুলো আধুনিক বিশ্ব ও সমসাময়িক আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে আমরা যেভাবে দেখি তাতে পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তার ভিত্তিতেই আমাদের রুশ আগ্রাসন ও ইউক্রেনের নৃশংস যুদ্ধের মোকাবিলা করতে হবে। আজ ইউক্রেনীয়রা আমাদের জন্য যুদ্ধ করছে। তারা একটি নতুন সম্পদ, এমন একটি জাতি যা বর্তমান সময়ের বিশ্বরাজনীতিকে বদলে দিচ্ছে। তবে আমরা যদি আরো সাহসী পম্হা ও কৌশল অবলম্বন না করি, তাহলে আমরা এই মন্দকে থামাতে সক্ষম হব না।

লেখক: পোল্যান্ডের উপপ্রধানমন্ত্রী ও সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক। ২০০৫ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত তিনি পোলিশ সমাজবিজ্ঞান সমিতির সভাপতি ছিলেন। [একটি পোলিশ মাসিক পত্রিকা থেকে অনুবাদ: ফাইজুল ইসলাম]

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন