শনিবার, ২৫ জুন ২০২২, ১১ আষাঢ় ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে নতুন চ্যালেঞ্জে দেশের অর্থনীতি 

আপডেট : ২১ মে ২০২২, ০৯:২৭

আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের সংকট চলছে। এক্ষেত্রে জ্বালানি তেল এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়ছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক ধরনের অস্থিতিশীল ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ২০০৮-০৯ সালে বিশ্ব অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাতে বড় সংকটের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি হয়েছিল। এরপর ১৩-১৪ বছরে এবারই সবচেয়ে চাপে বা টানাপড়েনে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি। এখনো করোনা-উত্তর পরিস্থিতিতে ফিরে যাওয়া সম্ভব হয়নি। এর মধ্যেই বিশ্ব অর্থনীতিতে সংকট আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতিকে বড় ধরনের চাপে ফেলেছে।

গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে শক্তির জায়গা ছিল বৈদেশিক খাত। রপ্তানি, রেমিট্যান্স, বৈদেশিক সাহাঘ্য এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতে বৈদেশিক বিনিয়োগ শক্তিশালী ছিল। এতে বৈদেশিক আয়-ব্যয় বা চলতি হিসাবের ভারসাম্য শক্ত অবস্হানে ছিল। এই অবস্হার দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। অনেকে বলে থাকেন, বাংলাদেশের রপ্তানি আয় এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে। কিন্তু রপ্তানির যে উলম্ফন, এটি আমদানিকৃত উপকরণের দাম বৃদ্ধির কারণে হয়েছে। ফলে এত রপ্তানি বৃদ্ধির পরও দেশের বাণিজ্য ঘাটতি ২৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। আর গত বছর এই ঘাটতি ছিল এর অর্ধেকের কাছাকাছি। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে আমরা আত্মতুষ্টিতে ভুগছি। কিন্তু এটি ক্রমান্বয়ে কমে আসছে। গত বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর থেকে রিজার্ভ কমতে শুরু করে। এখনো এই কমা অব্যাহত রয়েছে। বর্তমানে যে রিজার্ভ আছে, তা নিয়ে ৫-৬ মাসের বেশি আমদানি ব্যয় মেটানো যাবে। এরপর বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম বাড়তে থাকলে রিজার্ভে বড় ধরনের টান পড়বে। ফলে টাকার মান আরো কমতে থাকবে। এ বছরে অর্থনীতির নতুন বিষয় হলো রাজস্ব খাতের সঙ্গে বৈদেশিক খাতের দুর্বলতা বাড়ছে। আরেকটি বড় বিষয় হলো মূল্যস্ফীতি। খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের চেয়ে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি বেশি। আগামী দিনে পরিস্থিতি আরো কঠিন হবে। কারণ, সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম যে হারে বেড়েছে, সেই উচ্চমূল্যের পণ্য এখনো বাংলাদেশে আসেনি। এছাড়াও মুদ্রার বিনিময় হার আরো বাড়লে তা পণ্যমূল্যে প্রভাব পড়বে।

একটি দেশের অর্থনীতির ব্যবস্হাপনা কতটা সুসংহত, তা বোঝার জন্য তিনটি সূচক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো হল মূল্যস্ফীতি হার, মুদ্রার বিনিময় হার এবং ঋণের সুদের হার। এই তিনটি সূচকের মধ্যে সমন্বয় থাকা জরুরি। সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতায় যে বিষয়টি জোর দিয়ে বলা যায়, তা হলো মূল্যস্ফীতির সঙ্গে টাকার মূল্যমান কমে যাচ্ছে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে সুদের হার আটকে রাখা হচ্ছে। এক্ষেত্রে বলা হচ্ছে, সুদের হার কম থাকলে বিনিয়োগ বাড়বে। কিন্তু ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশ এবং আমানতের সুদের হার ৬ শতাংশ করা হয়েছিল। এতে গত কয়েক বছরে বিনিয়োগ বেড়েছে-এমন তথ্য দেখা যাচ্ছে না। কারণ সুদ ছাড়াও বাংলাদেশে বিনিয়োগে অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এগুলো দূর করতে হবে। সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য মূল্যস্ফীতিকে কেন্দ্রীয় সূচক হিসাবে বিবেচনা করতে হবে। অন্য সূচকগুলোকে সহযোগী হিসাবে বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ, অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নষ্ট হলে নিম্ন আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর পরের বিষয় হলো বিনিয়োগ ও কর্মসংস্হান। গত কয়েক বছরে দেখা যাচ্ছে, বিনিয়োগ কোনোভাবেই ৩৩ শতাংশের বেশি বাড়ানো যাচ্ছে না। এর মধ্যে বেসরকারি বিনিয়োগের হার হলো ২৩-২৪ শতাংশ। এখনো দেখা যাচ্ছে বড় শিল্প বেশি সুবিধা পাচ্ছে। কিন্তু সাধারণ নিয়মে ছোট শিল্পে বিনিয়োগ হলে কর্মসংস্হান বাড়ে। এখানেও বৈষম্য হচ্ছে। ফলে করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে দেশীয় বাজারমুখী শিল্পকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। আমাদের সঞ্চয় কমে যাচ্ছে। মানুষ আর্থিক কষ্টের কারণে সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে। এটি অর্থনৈতিক দুর্বলতার অন্যতম লক্ষণ। ডলারের বিপরীতে টাকার রেকর্ড অবমূল্যায়ন হয়েছে। বিশ্লেষকরা ডলারের এই ঊর্ধ্বগতি আরো সামনে এগোবে বলে আশঙ্কা করছেন। এ ধারা অব্যাহত থাকলে টাকার মান আরো কমবে এবং সংগতকারণে অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়বে।

আমদানি দেনা এবং বকেয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ বাড়ায় বাজারে ডলারের চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। কিন্তু সে তুলনায় সরবরাহ নেই। এ কারণে বাজারে এর সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। উপরন্তু চাহিদা বেড়েই যাচ্ছে। যদিও করোনার পর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ায় চাহিদা বেড়েছে। একই সঙ্গে আমদানি পণ্যের দামও বেড়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে পণ্যের দাম আরো লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রায় সব ধরনের পণ্যের দাম ২৫ থেকে শতভাগের বেশি বেড়ে গেছে। এছাড়া করোনার সময়ে যেসব আমদানির দেনা ও ঋণের কিস্তি পরিশোধ স্হগিত করা হয়েছিল, সেগুলোও এখন পরিশোধ করতে হচ্ছে। সবমিলে বাজারে ডলারের চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। কিন্তু আমদানির তুলনায় রপ্তানি আয় সে হারে বাড়েনি।

এখন আমদানি ব্যয় বেশি হওয়ায় ও মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে যাওয়ায় সার্বিকভাবে অর্থনীতিতে চাপ বেড়েছে। এই অবস্হায় রিজার্ভ বেশি থাকলে, ব্যাংকে তারল্য প্রবাহ পর্যাপ্ত হলে, বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ বাড়লে ঝুঁকি মোকাবিলা সহজ হতো। কিন্তু এগুলো হচ্ছে না। এখন বৈদেশিক মুদ্রার অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যয় কমিয়ে আয় বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে হবে। ব্যাংকে সঞ্চয় বাড়িয়ে তারল্য বৃদ্ধি করতে হবে। ছোট ও মাঝারি শিল্প খাতকে চাঙ্গা করে কর্মসংস্হান বাড়াতে হবে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখতে দরিদ্রপ্রবণ এলাকাগুলোতে অর্থের প্রবাহ বাড়াতে হবে। এ পরিস্থিতিতে বৈদেশিক মুদ্রার অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যয় কমিয়ে আয় বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে হবে। রপ্তানিপণ্য বহুমুখীকরণে জোর দেওয়ার পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি শিল্প খাতকে চাঙ্গা করে কর্মসংস্হান বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনৈতিক সংকট কাটানোর লক্ষ্যে শ্রমনির্ভর রপ্তানি পণ্যের পরিবর্তে মেধানির্ভর রপ্তানি পণ্যে গুরুত্ব বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে অর্থনীতিতে ঝুঁকি মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়াতে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানি বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে হবে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে খরচের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

শিল্প খাতে ঋণ বিতরণ বাড়ছে 

অর্থবছরের ১১ মাসে ২৬ হাজার কোটি টাকা কৃষি ঋণ বিতরণ

আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সিইও হতে ২০ বছরের অভিজ্ঞতা লাগবে

সুইস অথরিটির কাছে তথ্য চেয়েছে বাংলাদেশ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

বাংলাদেশের সঙ্গে এডিবির ১৪৩ মিলিয়ন ডলারের ঋণ চুক্তি 

পুঁজিবাজারে কালোটাকা বিনিয়োগের প্রস্তাব বিবেচনা করা যায়

বিশেষ সংবাদ

উৎপাদন খরচের তুলনায় দাম কম, তবু ক্রেতা নেই

‘রেমিট্যান্স প্রবাহ কোভিড পূর্ববর্তী স্বাভাবিক ধারায় ফিরতে শুরু করেছে’