বৃহস্পতিবার, ৩০ জুন ২০২২, ১৫ আষাঢ় ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

নতুন দামে চা পাতা কিনছেন না মালিকরা, হতাশায় কৃষক

আপডেট : ২১ মে ২০২২, ১৭:২০

তেঁতুলিয়ায় নির্ধারিত নতুন মূল্যে কাঁচা চা পাতা কিনছে না কারখানাগুলো। মানছেন না প্রশাসনের মূল্য নির্ধারণ কমিটির সিদ্ধান্ত। চা চাষিদের অভিযোগ, গত ১৮ মে পঞ্চগড় জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে কাঁচা চা পাতার মূল্য নির্ধারণ কমিটির জরুরি সভা হয়। সে সভায় প্রতি কেজি চা পাতার ১৮ টাকা নির্ধারণ করা হলেও সেই দামে পাতা কিনছে না কারখানাগুলো। 

কৃষকদের আরও অভিযোগ, আগের দামেই ১১/১২ টাকায় পাতা বিক্রি করতে হচ্ছে তাদের। আর বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে কাঁচা চা পাতার ২৫-৪০ শতাংশ পর্যন্ত কেটে নিচ্ছে। এতে করে চাষিরা চরম বেকায়দায় পড়েছেন।

চাষিরা বলছেন, কারখানাগুলো আমাদের কাছ থেকে কম দামে চা পাতা সরবরাহ করে উৎকৃষ্টমানের পাতায় উৎপাদিত চা নিলাম বাজারে না দিয়ে গোপনে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে চোরাই পথে বিক্রি করা হচ্ছে। আর খারাপ পাতা দিয়ে চা উৎপাদন করে অকশন মার্কেটে তুলে চায়ের মান খারাপ এনে কৃষকদের ঠকানো হচ্ছে।

শালবাহান পেদিয়াগছ এলাকার চা চাষি ইমরান খানসহ কয়েকজন জানান, এ অঞ্চলে প্রথম চা বাগান গড়ে উঠেছে। আশা নিয়ে চা বাগান তৈরি করেছেন চা চাষি ও বাগান মালিকরা। বর্তমানে এক কেজি কাঁচা চা পাতায় উৎপাদন খরচ হয় প্রায় ১৪/১৫ টাকা। কিন্তু কারখানা মালিকরা চা পাতা কিনতে চান মাত্র ১০ থেকে ১২ টাকায়।

শারিয়াল জোত গ্রামের চা চাষি নিজাম উদ্দিন, দর্জিপাড়া গ্রামের আ. সালাম ও মমিনপাড়া গ্রামের আবুল কালাম আজাদ জানান, চা পাতার নতুন দাম ১৮ টাকা নির্ধারণ করার কথা শুনে খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু পরের দিন চা পাতা কারখানায় নিয়ে গেলে পাতা না নেওয়ার কথা জানান তারা। পরে পাইকারদের সঙ্গে কথা বললে তারাও একই কথা বলেন। এখন ১২/১৩ টাকায় পাতা নিচ্ছে, আবার ২৫-৪০ শতাংশ পর্যন্ত কেটে নিচ্ছে। তাহলে নতুন দাম নির্ধারণ করে লাভ কী হলো! 

তেলিপাড়া গ্রামের চা চাষি আহসান হাবিব বলেন, ‘এ মৌসুমে পাতার দাম পাচ্ছি না। পাতা বিক্রি করতে হচ্ছে ১১-১২টাকায়। লাভের জায়গায় লোকসান গুনতে হচ্ছে। কৃষকরা চা পাতার ন্যায্য মূল্য পেতে রাজপথে আন্দোলন, মানববন্ধন করলেও কোনো টনক নড়ছে না।’ 

বাংলাদেশ চা বোর্ডের আঞ্চলিক কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, তেঁতুলিয়ায় ১ হাজার ২৯০ হেক্টরের বেশি জমিতে গড়ে উঠেছে চা বাগান। নিবন্ধিত ক্ষুদ্র চা বাগান রয়েছে ১ হাজার ১৬৮ টি। অনিবন্ধিত চা বাগান রয়েছে ৬ হাজার। ১৪ টিরও বেশি গড়ে চা কারখানা গড়ে উঠলেও চা পাতার দাম না পাওয়ায় হতাশায় রয়েছেন প্রান্তিক চাষিরা। 

২০২১ সালে করোনাকালে উত্তরাঞ্চলের সমতল ভূমিতে ১৪ দশমিক ৫৪ মিলিয়ন কেজি চা রেকর্ড পরিমাণ উৎপাদনে অতীতের সব রেকর্ড ভাঙা হয়েছে। উৎপাদনে রেকর্ড হলেও চাষিরা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। প্রতিনিয়ত গুণতে হচ্ছে লোকসান। এভাবে আয়ের চেয়ে ব্যয়ের পরিমাণ বাড়তে থাকলে মুখ থুবড়ে পড়তে পারে সমতলের চা-শিল্প। 

তবে কারখানার মালিকদের অভিযোগ, নিলাম বাজারে চায়ের দরপতন, মানসম্পন্ন চা পাতা সরবরাহ না করায় ক্ষতির মুখে পড়ছেন তারা। চায়ের নিলাম বাজার যখন ভালো ছিল, তখন ২৪ থেকে ২৫ টাকা কেজিতে চা পাতা কিনেছেন তারা। বর্তমানে নিলাম বাজারে সিলেটের চা থেকে পঞ্চগড়ের চায়ের মান নিম্ন। ‘দুটি পাতা একটি কুড়ি’ এই নীতি না মেনে বাগান থেকে চা পাতা সংগ্রহ করা হচ্ছে। এ কারণে মানসম্পন্ন চা উৎপাদনে ব্যর্থ হচ্ছেন তারা। এজন্য নতুন নির্ধারিত দামেও চা পাতা কিনতে পারছেন না মালিকরা।

গ্রিন কেয়ার চা কারখানার ম্যানেজার মঞ্জুরুল আলম মঞ্জু বলেন, ‘চাষিরা ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না, এটি সত্য নয়। চা-পাতার দাম অকশন বাজারের ওপর নির্ভর করে। এক কেজি চায়ের অর্ধেক পাবে কৃষক আর অর্ধেক পাবে কারখানা। সেই অনুযায়ী চায়ের মূল্য নির্ধারণ হয়।’ 

তিনি বলেন, ‘বিশেষ করে চা পাতা তোলার নিয়ম হচ্ছে হাতে তোলা। এক কুঁড়ির তিন পাতা পর্যন্ত। কিন্তু এখানকার চাষিরা ৪-৮ পাতা পর্যন্ত নিয়ে আসছে কারখানায়। যার কারণে চায়ের মান খারাপ হলে মূল্য হ্রাস ঘটছে।’ বাগান থেকে নিয়মমতো পাতা কেটে কারখানায় আনলে কৃষকরা নতুন নির্ধারিত ১৮ টাকাই পাবে বলে জানান তিনি।

প্রসঙ্গত, গত ১৮ মে জেলা প্রশাসকের ডাকা চা পাতা মূল্য নির্ধারণ জরুরি সভায় কারখানা মালিকদের কালোবাজারির কথা উঠে আসলে সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আমিরুল ইসলাম একটি টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দেন। এ প্রস্তাবে মূল্য নির্ধারণ কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক জহুরুল ইসলাম একটি টাস্কফোর্স কমিটি করার সিদ্ধান্ত  নেন। 

বাংলাদেশ চা বোর্ডের আঞ্চলিক শাখার বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শামিম আল মামুনকে চাষিদের উৎপাদন খরচ নির্ধারণ করে দিতে বললে ড. শামিম আল মামুনের মতামতের ভিত্তিতে ১৮ টাকা প্রতি কেজি চায়ের মূল্য নির্ধারণ করা হয়।

ইত্তেফাক/এএইচ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

বিশেষ সংবাদ

ভাঙনের শব্দে ঘুম ভাঙে তিস্তা পাড়ের মানুষের

বিশেষ সংবাদ

দেশের মধ্যাঞ্চল ছাড়িয়ে দক্ষিণাঞ্চলেও বন্যা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা

বিশেষ সংবাদ

সুনামগঞ্জে পানি কমলেও ভেঙে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা

বিশেষ সংবাদ

কোরবানির ঈদ সামনে রেখে ব্যস্ত রাজবাড়ীর কামার পল্লী

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

বিশেষ সংবাদ

নাটোরে জমে উঠেছে কোরবানির পশু বেচাকেনা

বিশেষ সংবাদ

সিলেটে বন্যা: পুনর্গঠনই এখন বড় চ্যালেঞ্জ

বিশেষ সংবাদ

দৌলতদিয়া ঘাটে স্বস্তির পারাপার, নেই যানবাহনের চাপ

বিশেষ সংবাদ

নারায়ণগঞ্জে অগ্নি-ঝুঁকিতে ৩৪ শিল্পকারখানা