শনিবার, ২৫ জুন ২০২২, ১০ আষাঢ় ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ঘিওরে নড়বড়ে কাঠের পুল, ভোগান্তিতে ২০ গ্রামের মানুষ  

আপডেট : ২৪ মে ২০২২, ১৬:৩৮

‘ছবি তুইলা কী করবেন? জন্মের পর থেকে দেইখা আইতাছি এই নড়বড়ে পুল। অনেক কষ্ট হয় আমাগো পারাপারে। পুলের ওপর উঠলে হাত পাও কাঁপে। আমাগো কথা কেউ শোনে না।’ হতাশার সুরে কথাগুলো বললেন ঘিওর উপজেলার শোলধারা গ্রামের বাসিন্দা মজিবর রহমান (৭২)।

তিনি আরও বলেন, ‘কত জায়গায় উন্নতি দেখি, আমাগো এখানে বদলায় না ঘিওরের ও শিবালয় সীমান্তের ২০ গ্রামবাসীর যোগাযোগ ব্যবস্থা।’ 

স্থানীয়রা জানান, ইছামতি নদীর দক্ষিণ দিকে শিবালয় উপজেলার শিমুলিয়া ইউনিয়নের বুতুনি গ্রাম আর উত্তরে ঘিওর উপজেলার বানিয়াজুরি ইউনিয়নের শোলধারা। এই দুই উপজেলার মাঝে সীমানা দিয়ে বয়ে গেছে ইছামতি নদী। প্রতিদিন নড়বড়ে কাঠ আর বাঁশের সাঁকো দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হচ্ছেন হাজারো লোকজন। এখানে একটি পাকা সেতু নির্মাণের জন্য দুই উপজেলাবাসী দীর্ঘ দিন যাবত দাবি জানিয়ে এলেও আজও পর্যন্ত পূরণ হয়নি তাদের দাবি। কিন্তু ‘ইছামতি নদীর ওপর ব্রিজ নির্মাণ’ থেকে যায় কেবলই প্রতিশ্রুতি।

তারা আরও জানিয়েছে, ব্রিজ না থাকায় বর্ষাকালে ২০টি গ্রামের লোকজনসহ স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকা কিংবা বাঁশের সাঁকো দিয়ে পারাপার হতে হচ্ছে। ইতোমধ্যে সাঁকোর ওপর থেকে পানিতে পড়ে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে স্কুল-কলেজগামী ছাত্র-ছাত্রীসহ পথচারীরা। আর শুষ্ক মৌসুমে ওই জরাজীর্ণ সাঁকো দিয়ে পারাপার এলাকাবাসীর জন্য আরও মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।

বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ এলাকার মানুষ শিবালয় এবং ঘিওর উপজেলার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। শিবালয় উপজেলার মানুষের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ঘিওরে রয়েছে, আবার ঘিওর উপজেলার মানুষের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে শিবালয়ে। চিকিৎসা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার ক্ষেত্রেও রয়েছে একই রকমের চিত্র। নদীতে একটি পাঁকা ব্রিজের অভাবে তাদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। আশেপাশের বেশকয়েকটি গ্রামের মানুষ নিত্য প্রয়োজনে এ রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করেন। যুগ যুগ ধরে এসব মানুষের যাতায়াতের মাধ্যম ভাঙা কাঠের পুল।

স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যমতে, দুই উপজেলার ইছামতি নদীর ওপর বাঁশ ও কাঠের সাকোঁ ব্রিটিশ আমল থেকেই চলে আসছে। সাঁকোটি দিয়ে বানিয়াজুরি ইউনিয়নের শোলধারা, কেল্লাই, কাকজোর, বানিয়াজুরি, জোকা, নয়াচর, তারাইল, গাংডুবি এবং শিবালয় উপজেলার শিমুলিয়া ইউনিয়নের বুতুনি, বেজপাড়া, ধোলাকান্দা, কাছিধারা, ছোটবুতুনি, ইসারাবাজ, কোঠাধারা, বিলবৈড়ল, বিবিরাস্তি, শিমুলিয়া, খাইলসা, ফেচুয়াধারা, দোচুয়া, গালা, ডাকিজোড়া, পাড়াগ্রাম, ইন্তাজগঞ্জসহ ২০টি গ্রামের প্রায় ২০ হাজার লোকের সহজ পারাপারের একমাত্র অবলম্বন এটিই।

জানা যায়, প্রতি বছর বানিয়াজুরি ইউনিয়ন পরিষদ থেকে রাজকুমার দাস ও কৃষ্ণ দাস ৮/১০ হাজার টাকা ডাকের মাধ্যমে নিয়ে তারা আরও লাখ টাকা খরচ করে কাঠ ও বাঁশ দিয়ে পাটনির মাধ্যমে সাঁকো তৈরি করে। তারা পারাপাররত কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা পয়সা না নিয়ে প্রত্যেকটি গ্রামের বাড়ি বাড়ি থেকে ধান, চাল, গম. ভুট্টা, পেঁয়াজসহ নানা শস্য উত্তোলন করেন।

এ সাকোঁ দিয়ে ভ্যান, মটরসাইকেল, রিকশা, বাইসাইকেলসহ নানা ধরনের যানবাহন পারাপার হয়। পারাপারের সময় এ পর্যন্ত প্রায় ২০ জন শিশু, বৃদ্ধ ও মহিলা ব্রিজ ভেঙে নিচে পড়ে গুরুতর আহত হয়েছেন। মোটরসাইকেল চালিয়ে পারাপারের সময় নিচে পড়ে আহত হন বেশ কয়েকজন।

কেল্লাই মনসুর উদ্দিন বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. ইস্কান্দার মীর্জা বলেন, ‘এই এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয় ও উচ্চ বিদ্যালয়সহ ওই পাড়ের প্রায় আড়াইশ’ শিক্ষার্থী ব্রিজ পার হয়ে স্কুলে আসে। অনেক শিক্ষার্থী বইখাতা নিয়ে নিচে পড়ে আহত হয়েছে। কিন্তু ব্রিজ হলো না। ব্রিজটি দ্রুত নির্মাণের দাবি জানাই।’

মানিকগঞ্জ সরকারি দেবেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, মহিলা কলেজ, মহাদেবপুর ইউনিয়ন সরকারি কলেজ, বানিয়াজুরি উচ্চ বিদ্যালয়, মহাদেবপুর গার্লস স্কুল, গোপাল চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়, বেজপাড়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়, শোলধারা ও বুতুনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গামী শিক্ষার্থী ও গর্ভবতী মায়েদের ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হতে হয় এ পুল।

শিমুলিয়া ইউনিয়নের বুতুনি গ্রামের বাসিন্দা মনির হোসেন (৪৫) বলেন, ‘এ পুল দিয়ে অসুস্থ্য ব্যক্তি, শিশু ও বয়স্কদের পারাপারে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। এই ব্রিজ থেকে পড়ে অনেকেই আহত হয়েছেন। এ ছাড়াও, এখানে পাঁকা ব্রিজ না থাকায় পণ্য পরিবহনে বাড়তি ঝামেলা ও দ্বিগুণ অর্থ অপচয় হয়।’

বানিয়াজুরি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এসআর আনসারি বিল্টু বলেন, ‘এপাড়ে ঘিওর উপজেলার বানিয়াজুরি ইউনিয়ন আর অপর পাশে শিবালয় উপজেলার শিমুলিয়া ইউনিয়ন। হাট-বাজার, জেলা সদর কিংবা ৩টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী এই সাঁকোর ওপর নির্ভরশীল। আমি নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে ইছামতি নদীতে ব্রিজের বিষয়ে উপজেলা কর্তৃপক্ষর দৃষ্টি দেওয়ার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানাবো।’

শিবালয় উপজেলার শিমুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়্যারম্যান জহির উদ্দিন মানিক বলেন, ‘ইছামতি নদীতে একটি পাঁকা সেতুর জন্য ভুক্তভোগী মানুষ দীর্ঘ দিন ধরেই ভোগান্তিতে রয়েছে। এ অবস্থায় দুটি উপজেলার অন্তত ৫ হাজার মানুষ সেতুর অভাবে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। এখানে একটি পাঁকা সেতুর খুব প্রয়োজন। এ বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশল দপ্তরে আমি দ্রুত যোগাযোগ করবো।’

শিবালয় উপজেলা প্রকৌশলী মোবারক হোসেন বলেন, ‘আমি এ উপজেলায় কিছু দিন যাবত যোগদান করেছি। তবে, এমন একটি ব্রিজের বিষয়ে আমার অফিসে একটি প্রস্তাবনা রয়েছে।’

ঘিওর উপজেলা প্রকৌশলী মো. সাজ্জাকুর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি আমি সরেজমিন পরিদর্শন শেষে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে অবগত করবো।’

ইত্তেফাক/এএইচ 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

রংপুরে কাঁঠাল প্রতিযোগিতার অর্থ দেওয়া হবে বন্যার্তদের

নওগাঁয় ট্রাকচাপায় নিহত ৫, আরও একজন আশঙ্কাজনক

যবিপ্রবির ৮৫ কোটি ২০ লাখ টাকার বাজেট ঘোষণা

কোরবানির হাট কাঁপাতে প্রস্তুত ‘খাঁন বাহাদুর’

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশকালে নারীসহ আটক ১২ 

লাম্পি স্কিনে আক্রান্ত সাটুরিয়ায় কোরবানির ৭ গরুর মৃত্যু

পদ্মা সেতু: বাগেরহাটে ঘুরে দাঁড়াবে পর্যটন শিল্প

বীর মুক্তিযোদ্ধা হত্যায় ৬ জেএমবির মৃত্যুদণ্ড