মঙ্গলবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২২, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

যে স্কুলের ছাত্র-ছাত্রী-শিক্ষক সবাই কৃষক

আপডেট : ২৬ মে ২০২২, ১৭:৪৭

চেয়ার-টেবিল, বেঞ্চের সঙ্গে নেই স্কুল ভবনও। বটতলা কিংবা বাঁশের মাচার ওপর পাটিতে বসে চলছে ক্লাস। শিক্ষার্থীরা শিখছেন বিষমুক্ত ফসল উৎপাদন, রোগ বালাই প্রতিকার ও প্রাকৃতিক উপায়ে জীবন ধারা প্রবাহিত সম্পর্কে নানা জ্ঞান। এই প্রতিষ্ঠানের নাম ‘কৃষি শিক্ষণ স্কুল’। এখানকার পাঠদানকারী ও শিক্ষার্থী সবাই কৃষক।

২০ জন কৃষক-কৃষানি শিক্ষার্থী সপ্তাহে ৩ দিন ক্লাস করেন। প্রতি সেশনেই যুক্ত হন নতুন শিক্ষার্থীরা। এ ক্লাসে বিষমুক্ত নিরাপদ ফসল উৎপাদনের কৌশল ও প্রাকৃতিক জীবনযাপন সম্পর্কে সম্মুখ ধারণা অর্জনই প্রতিপাদ্য। মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার কাউটিয়া গ্রামে এ স্কুলের শিক্ষার্থীরা হলেন গ্রাম্য কিষান-কিষানি, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী, উচ্চশিক্ষিত চাকরিজীবী, শিল্পপতি ও শহরের এলিট মানুষ।

Krishi-4

এসব শিক্ষার্থীদের নিয়ে গড়ে তোলা এই কৃষি পাঠে ব্যবহারিক শিক্ষা, পাঠদান করেন প্রাকৃতিক কৃষি কেন্দ্রের পরিচালক দেলোয়ার জাহান। আরও প্রশিক্ষক অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক আব্দুল মতিন দেওয়ান, স্থানীয় কৃষি উদ্যোক্তা রফিকুল ইসলাম নওশাদ এবং কৃষক মো. কালাচাঁদ প্রমুখ।

বৃহস্পতিবার (২৬ মে) সকালে সরেজমিনে বালিয়াখোড়া ইউনিয়নের কাউটিয়া গ্রামে প্রাকৃতিক কৃষি কেন্দ্রের ‘কৃষি শিক্ষণ স্কুলে’ গিয়ে দেখা যায়,  দু’পাশে গাছগাছালির ছায়া সুনিবিড় আঁকাবাঁকা মেঠো পথ। প্রায় ৩০০ বছর বয়সী বিশালদেহী বট-পাকুড়ের জোড়বন্ধন। সকালে এ বৃক্ষের পাদদেশে পাটি বিছিয়ে তার ওপর বসে হাতে-কলমে কৃষক-কৃষানিরা শিখছেন নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন পদ্ধতি। এর পাশেই প্রাকৃতিক কৃষি কেন্দ্র। চার পাশে নানা প্রকার দেশি জাতের ঔষধী ও ফসলের বৈচিত্র্য। দুপুরে ঝিরঝিরে বাতাসে বাঁশের মাচায় বসে শিক্ষার্থীরা শিখছেন মাঠ ফসলের নানা পাঠ, সংকট ও সমাধানের আলোচনা। সন্ধ্যার পর বসে মাছ চাষ নিয়ে জেলেদের সঙ্গে সংলাপ। কৃষকেরা তাতে লিখে রাখেন প্রতিদিনের পাঠ্য।

Krishi-1

এ কৃষি শিক্ষণ স্কুলের শিক্ষার্থীরা বাড়ির আঙিনায় চাষ করছেন বিষমুক্ত সবজি। লালন-পালন করা হচ্ছে গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগি। ফলমূলের গাছ লাগানোর মাধ্যমে জোগান হচ্ছে পুষ্টির। পতিত পুকুর-জলাশয়ে মাছ চাষ করে মিলছে আমিষ। প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে বিষমুক্ত ফলন বৃদ্ধি পাচ্ছে দিন দিন। এতে কৃষক পরিবারের পুষ্টি ও পরিবেশ উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে আসছে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা। এ স্কুলে শিক্ষাদান অবৈতনিক। তবে, দূর-দূরান্ত থেকে যারা আসেন, তাদের শুধু খাওয়া খরচ দিতে হয়।  

কৃষি শিক্ষণ স্কুলে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও উদ্বুদ্ধকরণে তৃণমূলে এমন পরিবর্তনের ধারা সূচিত হয়েছে বলে মনে করেন প্রাকৃতিক কৃষি কেন্দ্রের পরিচালক দেলোয়ার জাহান। 

তিনি বলেন, ‘কৃষক উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পান না বলেই অনিশ্চিত কাজে নিজের সন্তানদের তাঁরা কৃষি থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চান। তবে, বাণিজ্যিকভাবে কৃষির ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে। প্রশিক্ষিত কৃষকেরা প্রাকৃতিক ফসল উৎপাদন, সুস্থ ও নিরাপদ জীবনযাপন পদ্ধতি শিক্ষা নিতে প্রতি সেশনেই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পপতি ও শহরস্থ উচ্চশিক্ষিত নারী-পুরষ এখানে নিয়মিত ক্লাস করেন।’

Krishi-5

স্কুলের একজন প্রশিক্ষণার্থী স্থানীয় কৃষক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আব্দুল মতিন দেওয়ান বলেন, ‘আমরা প্রচলিত পদ্ধতিতে চাষাবাদ করতাম। না বুঝে যখন-তখন জমিতে বিষ ছিটাতাম। এখন পরিবেশবান্ধব উপায়ে ফসল উৎপাদন ও সুস্থ থাকতে প্রকৃতিক জীবন ধারা রীতি আয়ত্ত করেছি।’

কৃষি শিক্ষণ স্কুলে নিরাপদ ও প্রাকৃতিক কৃষি ও জীবন ধারা সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান নিতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান এসেছেন। 

তিনি বলেন, ‘পরিবেশবান্ধব উপায়ে ফসল উৎপাদনের শিক্ষা নিয়েছি। সেইসঙ্গে সুস্থ সাবলিলভাবে বেঁচে থাকার কিছু অভিজ্ঞতা শিখতে পেরেছি। কৃষক শিক্ষিত হলে সুবিধা বেশি। নিজেদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার জন্য সংগঠিত হতে পারবে।’

Krishi-2

আরেক শিক্ষার্থী ঢাকার শিল্পপতি আমজাদ হোসেন বলেন, ‘শিক্ষিত কৃষককে আগে লজ্জাটা ঝেড়ে ফেলতে হবে। এখানে এক সপ্তাহে তিন দিন ক্লাসে অংশ গ্রহণ করে উপলব্ধি করতে পেরেছি, নিজে সুস্থ থাকতে হবে, অপরকে নিরাপদ রাখতে সহায়তা করতে হবে।’

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শেখ বিপুল হোসেন বলেন, ‘দেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে। এখন নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের বিষয় নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। এ ধরনের কৃষি পাঠ বিষয়ক স্কুল, কৃষকদের সচেতনতা বাড়াতে ভূমিকা রাখবে।’

ইত্তেফাক/এএইচ