ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অন্যতম পার্ক গুলিস্তানের শহিদ মতিউর পার্কটি কিছুদিন আগেও সবার জন্য ছিলো উন্মুক্ত। যে কারো সবুজ এই পার্কে প্রবেশে কোনো অনুমতি বা আনুষ্ঠানিকতা ছিল না। এখন সেই পার্কে ঢুকতে লাগছে টিকিট। যার মূল্য ১০ টাকা। সিটি করপোরেশন বাণিজ্যিকভাবে পরিচালনা করছে এটি। পার্কটি ইজারা দেওয়া হয়েছে আওয়ামী লীগের এক নেতার কাছে। আর সেই ইজারাদার পার্কের ভেতর বসিয়েছেন ফলের আড়ত। ১০ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকতেই ফলের আড়তের দেখা মিলবে পার্কে। তবে অন্যান্য রাইডও রয়েছে। সেটির জন্যও গুনতে হবে আলাদা আলাদা টাকা। নগরবিদরা বলছেন, সিটি করপোরেশন নৈতিকভাবে এমন একটি পার্কে প্রবেশ সংরক্ষিত করতে পারে না।
জানা যায়, প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘জল-সবুজে ঢাকা’ প্রকল্পের মাধ্যমে গুলিস্তান শহিদ মতিউর পার্কটির আধুনিকায়ন করে ২০২০ সালে চারদিকের দেওয়াল সরিয়ে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয় দক্ষিণ সিটি। কিন্তু এর পরেই গুলিস্তানের একমাত্র স্বস্তির জায়গা শহিদ মতিউর পার্কটি ইজারা দিয়ে সাধারণ মানুষের প্রবেশ সংরক্ষিত করেছে ডিএসসিসি। গত নভেম্বরে দক্ষিণ সিটির সম্পত্তি বিভাগ এক বছরের জন্য প্রায় ২০ লাখ টাকায় পার্কটি ইজারা দেয় ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের ২০ নম্বর ওয়ার্ডের নেতা মো. অলি উল্লাহ ও রনি শিকদারের কাছে। পরে তারা পার্কটির চারদিক দেওয়াল দিয়ে ঘিরে জনসাধারণের প্রবেশ সংরক্ষিত রেখে টিকিট সিস্টেম করে। উন্মুক্ত পার্কটির চারদিকে দেওয়াল দিয়ে ভেতরে বসানো হয়েছে বেশ কয়েকটি রাইড ও খাবারের দোকান। এমনকি এর এক পাশে বসানো হয়েছে মৌসুমি ফলের আড়তও।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় ৩ দশমিক ৫০ একর আয়তনের এই পার্কের চার পাশ দেওয়ালঘেরা। প্রত্যেক গেটের মধ্যেই টিকিট নিয়ে বসে আছেন ইজারাদারদের লোক জন। পার্কে ঢুকতে প্রবেশ ফি দিতে হয় ১০ টাকা। তবে ঢুকতেই বিভিন্ন খাবার দোকানসহ অনেক রাইড চোখে পড়ে। ওয়াটার বোটে ৫০ টাকা এবং অন্যান্য রাইডে লাগে ২০ থেকে ৪০ টাকা। দর্শনার্থীর সংখ্যাও চোখে পড়ার মতো। পার্কের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে কাজী বশির মিলনায়তন (মহানগর নাট্যমঞ্চ)। পার্কের মাঝখানে রয়েছে একটি পুকুর। সম্প্রতি এই পুকুরের চারপাশে বিভিন্ন রাইড যুক্ত করা হয়েছে। পুকুরে নামানো হয়েছে দুটি ওয়াটার বোট। নাট্যমঞ্চের পাশের গেটের সংলগ্ন বসানো হয়েছে ফলের আড়ত। যেখানে রাত থেকে পর দিন সকাল পর্যন্ত চলে বেচাকেনা। ব্যবসায়ীরা জানান, ইজারাদারদের টাকা দিয়েই তারা এই ফলের আড়ত বসিয়েছেন। দর্শনার্থীরা বলছেন, পার্কের মধ্যে লিচুর আড়ত বসিয়ে পার্কের পরিবেশ নষ্ট করছেন তারা। এভাবে চলতে থাকলে পুরো পার্কটি একসময় ব্যাবসায়িক কেন্দ্রে পরিণত হবে।
এ বিষয়ে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ও নগর-পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, সিটি করপোরেশন নৈতিকভাবে এ ধরনের পাবলিক স্পেস কোনোভাবেই ইজারা দিয়ে মানুষের প্রবেশাধিকার ক্ষুণ² করতে পারে না। এটা একদমই অন্যায্য। পার্কে প্রবেশের জন্য এক টাকার টিকিটও রাখা যাবে না, উলটো জনগণের সুবিধার কথা চিন্তা করে পার্কে সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। এ বিষয়ে ইজারাদার অলিউল্লাহকে ফোন করে পাওয়া যায়নি। তবে রনি শিকদার বলেন, ‘এই পার্কে মাদকসেবনসহ নানা অসামাজিক কর্মকাণ্ড চলত। এখন সাধারণ মানুষ বিনোদনের জন্য আসে। মেইনটেন্যান্স খরচের জন্য ১০ টাকা টিকিটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পার্কে যে পরিমাণ বিনিয়োগ করা হয়েছে, তাতে পোষাচ্ছে না। প্রচারণা না থাকায় বেশি মানুষ আসছে না। তাই প্রচারের জন্য একটি মৌসুমি ফলের মেলার আয়োজন করা হচ্ছে। এজন্য সিটি করপোরেশনে আবেদন করা হয়েছে।’
এ বিষয়ে ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা রাসেল সাবরিন বলেন, পার্কে ফলের আড়ত বা অন্য কোনো স্থাপনা করার অনুমতি দেওয়া হয়নি। যদি কেউ তা করে থাকে, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আবেদন করে থাকলেও পার্কে এমন স্থাপনার সুযোগ নেই।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফরিদ আহাম্মদ বলেন, ‘পার্কটিতে আমরা বেশ কয়েকটি রাইড বসিয়েছি, যেগুলো দেখাশোনার জনবল সিটি করপোরেশনের নেই, তাই ইজারা দিয়েছি। তারা ১০ টাকার টিকিটের বিনিময়ে প্রবেশের সুযোগ দিচ্ছে। টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকে কেউ রাইডে না চড়তে চাইলে খেলাধুলা করারও পর্যাপ্ত জায়গা রয়েছে।’
