মবিনুল আমিন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মানবসম্পদ বিভাগে কাজ করে। শিক্ষার ধারটা আরেকটু থাকলে হয়তো আজকে মবিনের অবস্থান আরো শক্ত হতো। বাসে উঠে যখন শিক্ষা বিষয়ে কোনো লাইন দেখে তখনই মবিনের পুরানো স্মৃতি মনে পড়ে যায়। অনেক জোরে বাসটা ব্রেক করায় পিছন থেকে একজন লোক চিত্কার করে চালকের বাবা-মায়ের জাতগোষ্ঠী উদ্ধার করল। মবিন পিছনে তাকিয়ে দেখে ভাবল, এত সুন্দর একজন ভদ্র পোশাকের লোক কিভাবে এইভাবে গালিগালাজ করে? নিশ্চয় তিনি অনেক উচ্চপদে চাকরি করেন, শিক্ষার আলোয় আলোকিত একজন মানুষ!
বাসায় মেয়ের সঙ্গে সময় পার করে খাবার টেবিলে সবাই বসল। মবিন শখ করে মেয়েকে কয়েক লোকমা ভাত খাইয়ে দেয়, এরপর নিজ হাতে খায় আনিকা। আদরের মেয়ে তাই এত আহ্লাদ। ষষ্ঠ থেকে সপ্তম শ্রেণিতে উঠবে আনিকা। মবিনের স্ত্রী নাসরিন মুখের ভাত শেষ করতে করতেই বলল, এই বছর তো আনিকা এই স্কুলে পার করল, পরের বছর কিন্তু স্টার চাইল্ড ইন্টারন্যাশনাল হাই স্কুলে পড়াতে হবে। আমি রুমা আপার সঙ্গে কথা বলেছি, আপা বলেছেন তিন লাখ টাকা ডোনেশান দিলেই হবে।
মবিন কঠিন মুখে ভাত চিবোতে চিবোতে একবার হুম করল। আর মেয়ের দিকে তাকাল। স্কুলের নাম শোনার সঙ্গে সঙ্গে মেয়ের আনন্দ চোখেমুখে প্রকাশ পেয়েছে। মেয়েই সব। তাই মবিন তিন লাখ টাকা দিতে পিছপা হবে না। আনিকার শিক্ষা বিষয়ক দুঃশ্চিন্তা থেকে মেয়ের মা মুক্ত হচ্ছে এইটা ভাবতেই ভালো লাগছে। পরের দিন মবিন অফিস থেকে বের হয়ে সিএনজি নিয়ে রওনা হয়েছে। গন্তব্য স্টার চাইল্ড ইন্টারন্যাশনাল হাই স্কুল। সিএনজিতে উঠেই মবিন যথারীতি ঝিমুতে লাগল। ঝিমুনির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষাবিষয়ক বিবিধ ভাবনা। সিএনজি হঠাত্ ব্রেক করল। সিএনজিওয়ালা বলল, মামা চইলা আইছি ইস্টার চাইল ইশকুল।
মবিনের ঝিমুনি ভাঙল। স্কুলের সিসিটিভি সম্পৃক্ত গেইটের দিকে তাকিয়ে মবিনের কী যেন মনে হলো। সে সিএনজিওয়ালাকে জিজ্ঞেস করল, তুমি কি প্রায়ই এইখানে ভাড়া পাও?
—পাই মাজেমইধ্যে।
—এই স্কুল কেমন?
—এইডা বেপক বড় লুকের স্কুল। ম্যালা টেহা লাগে এইহানো পড়াইতে।
—তোমার ছেলেমেয়ে স্কুলে যায়?
—যায়, আমগো গেরামের স্কুল। সারদা পারথমিক বিদ্যালয়। সরকারি স্কুল। টেহা কম। এইহানের মতন নাহ্।
—তোমার টাকা থাকলে?
কিছুটা ভেবে সিএনজিওয়ালা বলে, এইহ্যানে পড়াইতাম না। কারণ মামা, পড়াইতে এত ট্যাকা লাগবো ক্যান? ট্যাকার লাইগা আমার মাইয়্যা যদি ভালো পড়ালেখা না পায় এই দায় কি আমার? আর কারো দায় নাই?
মবিন কিছু বলে না। ভাড়া মিটিয়ে স্কুলের জৌলুস গেইটের সামনে এসে দাঁড়ায়।
