ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) ব্যালট ইউনিটের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন নির্বাচন কমিশন (ইসি)। গোপন ভোটকক্ষে সংরক্ষিত ব্যালট ইউনিটে একজনের ভোট দিতে পারেন অন্যজন। বর্তমান ইভিএমের এটিই বড় দুর্বলতা হিসাবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। ২ লাখ টাকার দামে ক্রয়কৃত ইভিএমের কন্ট্রোল ইউনিটে ফিঙ্গার প্রিন্টের ব্যবস্থা থাকলেও ব্যালট ইউনিটে তা নেই। ফলে কেন্দ্র দখল হয়ে গেলে জাল ভোট পড়তে পারে উন্নত প্রযুক্তির ইভিএমেও।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. আহসান হাবিব খান বলেন, ভোটকেন্দ্রের গোপনকক্ষে কক্ষে একজন করে ডাকাত ও সন্ত্রাসীরা দাঁড়িয়ে থাকেন আর ভোটাররা এলেই বলেন, ‘আপনার ভোট হয়ে গেছে, চলে যান’। ইভিএমের জন্য এটাই বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, এ ধরনের সন্ত্রাসী-ডাকাতদের অপতত্পরতা ছাড়া ইভিএমে সুষ্ঠু ভোট অনুষ্ঠানে আর কোনো চাপ নেই। তবে আগামী দিনে কোনো নির্বাচনে এরকম কিছু হবে না। কেননা প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা থাকবে, সাংবাদিকদের অ্যালাউ করা হবে। কোথাও এরকম কিছু হলে সঙ্গে সঙ্গে ভোট বন্ধ করে দেওয়া হবে।
ব্যালটের চেয়ে ইভিএমের খরচ একটু বেশি হলেও এর মাধ্যমে নির্বাচনি অনিয়ম দূর করা সম্ভব বলে ইসি মনে করলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। বিদ্যমান নির্বাচনি ব্যবস্থাপনায় ইভিএমও অরক্ষিত। বিগত সময়ে ভোটের রাতে কেন্দ্র দখল করে ব্যালটে সিল মারার ঘটনা ঘটলেও এখন দিনে কেন্দ্র দখল করে ইভিএমে জালভোট দেওয়ার কিছু দৃশ্যও দেখা গেছে। এই কারণে ইভিএমে ভোটারদের উপস্থিতিও অনেকাংশ কমেছে। কেননা ভোটকেন্দ্রে ভোটারের ভোটদানের সুরক্ষার ঘাটতির কারণে ভোটদানে অনীহা রয়েছে। ইভিএম ক্রটিমুক্ত হতে পারে কিন্তু শতভাগ সুরক্ষিত নয় বলে জানিয়েছেন ইসির একাধিক কর্মকর্তা।
অরক্ষিত ব্যালট ইউনিট: ইভিএমের দুটি ইউনিট। একটি কন্ট্রোল ইউনিট এবং অন্যটি ব্যালট ইউনিট। এর মধ্যে ব্যালট ইউনিটটি অরক্ষিত। কন্ট্রোল ইউনিটে ফিঙ্গারপ্রিন্ট ম্যাচিংয়ের পর গোপনকক্ষে সংরক্ষিত ব্যালট ইউনিটে গিয়ে একজনের ভোট দিয়ে দিতে পারেন অন্যজন। কেননা কন্ট্রোল ইউনিটে ফিঙ্গারের ব্যবস্থা থাকলেও ব্যালট ইউনিটে তা নেই। সাধারণত একটি বুথে এক জন সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ইভিএম মেশিন পরিচালনার দায়িত্বে থাকেন। তাকে সহযোগিতার জন্য থাকেন দুই জন পোলিং অফিসার। আর ভোটকক্ষে উপস্থিত থাকেন বিভিন্ন প্রার্থীর এজেন্টরা। একজন ভোটার ভোটকেন্দ্রে প্রবেশের পর জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, স্মার্টকার্ড বা ফিঙ্গার প্রিন্ট দ্বারা কন্ট্রোল ইউনিটে ভোটার শনাক্তের পর তিনি ভোটদানের জন্য বিবেচিত হন। এ সময় ভোটকক্ষের সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার বা প্রভাবশালী প্রার্থীর এজেন্ট অনেক ক্ষেত্রে জোরপূর্বক গোপনকক্ষে স্থাপিত ব্যালট ইউনিটে পছন্দের প্রতীকে কনফার্ম বাটনে চাপ দেওয়ার উদাহরণ আছে। সে ক্ষেত্রে প্রকৃত ভোটারকে ভোটদান থেকে বিরত থেকেই ফিরে আসতে হয়। আবার ইভিএমে আঙুলের ছাপ না মিললে ১ শতাংশ ভোটারকে ভোট দেওয়ার ক্ষমতা পান সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তারা। এটিও অপব্যবহারের প্রবল আশঙ্কা আছে।
অবশ্য ইসি বলছে, ইভিএমের ব্যালট ইউনিট সম্পূর্ণ সুরক্ষিত ও ত্রুটিমুক্ত। যদি কোনো ব্যক্তি ভোটকেন্দ্র বা গোপন কক্ষ দখল করে, সে ক্ষেত্রে প্রিজাইডিং অফিসার আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সহায়তায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করবেন। এছাড়া অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির ক্ষেত্রে কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত করার বিধানও রয়েছে।
এ বিষয়ে সাবেক নির্বাচন কমিশনার মো. শাহ নেওয়াজ ইত্তেফাককে বলেন, এটি সত্য যে বিগত সময়ে বেশ কয়েজন নির্বাচনি কর্মকর্তা গ্রেফতার হয়েছিলেন। তার পরও তাদের ওপর আস্থা রাখতে হবে। কেননা নির্বাচনি দায়িত্বের জন্য তাদের বিকল্প নেই। বুথ দখল করে ইভিএমে জাল ভোট হতে পারে। যাতে কেন্দ্র দখল না হয় সেদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের মতে, আমাদের ইভিএমে কোনো পেপার ট্রেইল না থাকার কারণে প্রদত্ত ভোটের অডিট করা সম্ভব নয়। ভোটাররা নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পেরেছেন কি না—তা নিশ্চিত হতে পারেন না।
