মানবজীবনে উন্নতি লাভে ডিসিপ্লিন বা নিয়ম-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নাই। উন্নত দেশগুলির উন্নয়নের স্বর্ণশিখরে উপনীত হইবার পশ্চাতে শৃঙ্খলার গুরুত্ব সর্বাধিক। কিন্তু অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশসমূহে এই সমস্যাটি খুবই প্রকট। এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার অনেক দেশই আজ অর্থনৈতিক দিক দিয়া অগ্রসরমাণ। বাড়িতেছে তাহাদের মাথাপিছু আয় ও জাতীয় প্রবৃদ্ধি। কিন্তু এইসব দেশের নাগরিক জীবনে ও সমাজে শৃঙ্খলা ফিরিয়া আসিতেছে না। এইজন্য তাহাদের মূল্য দিতে হইতেছে, তাহাদের উন্নয়ন টেকসই হইতেছে না। কিছুদিন না যাইতেই তাহারা খাদের কিনারে উপনীত হইতেছে। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ধারাবাহিক সাফল্য লাভ ও স্থিতিশীলতায় আমাদের অবশ্যই নিয়ম-নীতি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করিতে হইবে।
সম্প্রতি গত ৬ জুন ব্রিটেনে পালিত হইল ডি-ডের ৭৫তম বার্ষিকী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪৪ সালের এই দিনে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার দেড় লক্ষাধিক সৈন্য বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করিয়া ফ্রান্সের উত্তরাঞ্চল নরম্যান্ডির সৈকতে অবতরণ করেন। তাহারা ১১ মাসের মধ্যে জার্মানির নািস বাহিনীকে পরাজিত করেন। ইহার মাধ্যমে ইউরোপ যুদ্ধের অবসান ঘটে। সেইখানে প্রথম ব্রিটিশ সৈন্যরা পৌঁছান এবং যুদ্ধে তাঁহাদের ২২ হাজার ৪৪২ জন সৈন্য প্রাণত্যাগ করেন। এই ঐতিহাসিক ঘটনা স্মরণে যে অনুষ্ঠান হইল তাহা ছিল অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ। সেইখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ম্যাকরনসহ বিশ্বনেতাগণ আসিয়াছিলেন। শৃঙ্খলা কাহাকে বলে তাহা আমরা এই অনুষ্ঠান হইতে শিক্ষা গ্রহণ করিতে পারি। বিশ্বক্ষমতাধর ব্যক্তিরা আসিলেও তাহাদের নিয়ম-শৃঙ্খলা কঠোরভাবে অনুসরণ করিতে হইয়াছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাকিংহ্যাম প্রাসাদে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন। ওয়েস্টমিনস্টারে গির্জা সফর করেন। অনামি যোদ্ধারের সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। সাক্ষাত্ করেন প্রিন্স চার্লসের সঙ্গে। এই সকল কর্মসূচিতে শৃঙ্খলার বিষয়টি এতই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে পৃথিবীর সবচাইতে পাওয়ারফুল বা শক্তিশালী দেশের প্রেসিডেন্ট হওয়া সত্ত্বেও তাঁহাকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হয় নাই।
এইজন্য আমরা বলিতে পারি, কোনো দেশে অবকাঠামোগত উন্নয়ন যাহাই হউক না কেন, শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব কোনো অংশে কম নহে। অথচ আমাদের মতো দেশে এই বিষয়টি সবচাইতে অবহেলিত, উপেক্ষিত। এখানে পদে পদে চলে শৃঙ্খলা ভঙ্গের মহড়া। সড়কে শৃঙ্খলা না থাকিবার কারণে অহরহ ঘটিতেছে দুর্ঘটনা। প্রশাসনে শৃঙ্খলা না থাকিবার কারণে নামিয়া আসিতেছে স্থবিরতা। এখানে কথায় কথায় সরকারি কর্মকর্তাদের বদলি হইতে হয়। চুন হইতে পান খসিয়া পড়িলেই বিপদ। মাঝারি বা পাতি নেতাদের অঙ্গুলিহেলনেও তাহারা দুর্ভোগের শিকার হন। একজন উপদেষ্টাও অনেক সময় মন্ত্রীর ওপর ছড়ি ঘোরান। যেখানে শক্তিশালী দেশের নেতারা নিয়ম-শৃঙ্খলা মানিয়া চলেন, সেখানে আমাদের শৃঙ্খলা ভঙ্গের বহর দেখিয়া বিস্মিত হই। শক্তিশালী দেশ হইতে হইলে শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করিলেই চলিবে না, আমাদের সর্বত্র শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠারও চেষ্টা করিতে হইবে।
