সোমবার, ১৫ আগস্ট ২০২২, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

মেনোপজ

আপডেট : ০৩ জুন ২০২২, ০৯:৪১

অনেকক্ষণ ধরেই বিছানায় এপাশওপাশ করছে মনিকা। উফ! শরীরে যেন আগুন লেগেছে। জিহ্বা শুকিয়ে গেছে। আশপাশে কেউ নেই যে এক গ্লাস পানি এসে দেবে। উঠতেও ইচ্ছে করছে না। থাক, কষ্ট হোক। জ্বলে যাক শরীর, ছাড়খার হয়ে যাক। সে তো নারী, কষ্ট তো তার সহ্য করতেই হবে। কত চলছে বয়স তার এখন? ৫৭। হায় রে! নারী বলে আজ শরীরে হটফ্লাসের জ্বালা।

আর আমার বয়সি পুরুষ। দিব্যি অন্য নারীতে ঢুকতে ছোকছোক করে বেড়াচ্ছে। কিছু ভাবতে ইচ্ছে করছে না আর তার। হাত-পা ছড়িয়ে ঝিম মেরে বিছানায় পড়ে থাকে। ৫৭ বছর। জীবনের খুব বেশি সময় নয় কিন্তু কমই বা কোথায়? শরীর তো কম ইঙ্গিত দিচ্ছে না। রজঃস্বলা তো বন্ধ হয়ে গেছে তিন বছর হলো। হঠাৎ সেদিনের কথা মনে পড়ে। একটু অবাক হয়েছিল সেদিন বোধহয় সে।

যেমন ক্লাস ফাইভে পড়ার সময় প্রস্রাবের সঙ্গে গলগল করে রক্ত যাওয়া দেখে সে অবাক হয়েছিল। আধুনিক পরিবারের মেয়ে হলেও রজঃস্বলা সম্পর্কে ধারণা তাকে দেয়নি কেউ। মনিকা ভেবেছিল— না দেখা সে জায়গায় হয়তো তার ফোঁড়া উঠেছে। ফোঁড়া ফেটেই এই লাল পানির স্রোত। কিশোরী বয়সে ভারি বিরক্তি ঠেকত এই সময়টা। কতবার যে কাপড়ে লাগা লাল দাগের জন্য স্কুলে হাসির পাত্র হতে হয়েছে তাকে!

মেয়েগুলো যে কেন হাসত তা আজো বোঝে না সে। দুনিয়ায় তো সেই প্রথম ঋতুমতী হয়নি। সব নারীই হয়েছে। তবে কেন তারা হাসত? বোধহয় বয়সের কারণেই। আর আমাদের সমাজে এসব তো এখনো লুকোছাপারই বিষয়। যদিও একবিংশ শতাব্দী চলছে। নারীর জন্য আবার এক শতাব্দী থেকে অন্য শতাব্দীতে যাওয়া। সেই তো একই ঘূর্ণিপাকে ঘোরা। হাসি পায় মনিকার। এ শরীরের ওপর দিয়ে গেছে দুই দুটো সি-সেকশন।

মনে পড়ে, সেসময় প্যান্টিতে এক বছরের কাছাকাছি রক্তের দেখা পাচ্ছিল না সে। ন্যাপকিন পালটানোর ঝামেলা নেই। কিন্তু কম্পিউটার চালাতে চালাতে, সবজিতে পাঁচফোড়ন ছড়িয়ে দিতে দিতে হঠাত্ মাথায় এসে কে যেন খোঁচা দিত। এ মাসেও হলো না। তবে কি অন্যকিছু? না তো স্বামীর সঙ্গে কবে যে শেষ একান্েত সময় কাটিয়েছিল— তাও তো মনে পড়ছে না। তাহলে রজঃস্বলার দেখা নেই কেন? তবে কী? হ্যাঁ মনিকা যেটা মনে মনে ভেবেছিল, তাই সত্যি হয়েছিল। কত বিচিত্র যে এ জীবন। আর নারীর শরীর—সে তো বিস্ময়ের আকর। সেদিন মনিকার মনে হয়েছিল—সে আসলে বুড়ো হয়ে গেছে।

৫৪ বছর চলছিল তখন তার। আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছিল সে। না। চোখে রিংকেল নেই, মুখের চামড়াও টানটান। হয়তো বাজারের দামি প্রসাধনীর গুণেই আজো সে এমন আছে। একটু বেশি ডায়েটে থাকলে গলার ভাঁজ বোঝা যায়, এই আর কী। কিন্তু রজঃস্বলা যে বন্ধ হয়ে গেল তার, কী হবে এখন? এ তো কোনো ওষুধ দিয়ে ঠেকিয়ে রাখা গেল না। আজ থেকে তার আর মা হবার ক্ষমতা নেই তবে! একসময় সে ঋতুমতী ছিল, এ শরীরে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠেছিল দুটি সন্তান। আজ থেকে তার আর সে ক্ষমতা নেই। যৌন ইচ্ছেও কি তবে কমে যাবে? নারীর জন্য সবসময় সময় বাধা। শরীরের নানা গ্ল্যান্ড এখন নানা রকম উচ্ছৃঙ্খলতা করবে হয়তো। সেদিন বিছানায় শুয়ে এসবই বোধহয় ভাবছিল মনিকা।

আজো বিছানায় শুয়ে নিজের চুলে নিজে বিলি কাটে। মনিকা শিক্ষিত নারী। সে জানে এ বয়সে এটি নারীর স্বাভাবিক শারীরিক পরিবর্তন, তাহলে এ নিয়ে সে এত চিন্তা করছে কেন? তার কি তবে মানসিক চিকিত্সার দরকার? নারী হিসেবে শারীরিক ছন্দপতনকে সে কি অস্বীকার করতে পারে? সে যে এখন আর ঋতুমতী নয়, এ কথা অন্য কাউকে বলা তো দূর কি বাত, পতিদেবতাকেও বলতে ভীষণ অস্বস্তি হয়। মেনোপজের কথা বলতে গেলেই কে যেন এসে তার মুখ চেপে ধরে।

এসব ভাবতে গিয়ে হাসি পায় মনিকার। কত সাধারণ কথাই তো নারী মুখ ফুটে বলতে পারে না, আর এ তো নারীর মেনোপজ— নিস্ফলা জমির মতন নারীর বয়ে বেড়ানো একটি শরীরের কথা।

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

হাসপাতালে হাঁসফাঁস 

রস 

পরম্পরা 

বঙ্গবন্ধু ও চলচ্চিত্রের একটি অবশ্যপাঠ্য গ্রন্থ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

তামাশা 

কালো সূর্য

থাই মহাকাব্য রামাকীইন-কথা

পথের শেষ কোথায়? ঘৃণার শেষ কোথায়?