এখন ডিজিটাল যুগ। সব শ্রেণিপেশার মানুষ যেকোনো তথ্যের জন্য অনলাইনে চোখ বুলান। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে বেড়েছে অনুমোদিত গণমাধ্যম। পাশাপাশি বাড়ছে ব্যক্তিগত চ্যানেল ও অনলাইন একাউন্ট। ইউটিউবসহ নানা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পেজ, একাউন্টে এটা-ওটা দিয়ে বাড়ানো হচ্ছে ভিউয়ার। ভিউ বাড়ার সঙ্গে বাড়ছে অনলাইনে আয়। এটি দেখে এসব অনলাইন একাউন্ট হোল্ডারদের মাঝে শুরু হয় ‘ভিউ বাড়ানোর’ অসুস্থ প্রতিযোগিতা।
একটি ঘটনাকে যে যার মতো রঙ মিশিয়ে উপস্থাপন করতে পারলে সেসব ঘটনায় তার চ্যানেল বা একাউন্টের ভিউ হয় বেশি। তাই যেকোনো দুর্যোগের অসত্য তথ্যও সরকার অননুমোদিত এসব প্রচার মাধ্যমে ছড়িয়ে বিভ্রান্তি ছড়ায়। সীতাকুণ্ড ট্র্যাজেডিতেও একইরকম কাণ্ড ঘটেছে।
এমনটি জানিয়েছেন চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে আনা সীতাকুণ্ডে আহতদের রক্ত দিতে আসা একাধিক মানবিক মানুষ।
নিজেদের নাম ও ভিডিও প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখি দ্বগ্ধ ও আহতদের চিকিৎসায় রক্তের জন্য চমেকে হাহাকার চলছে। স্ট্যাটাস ছাড়াও যার ভিডিও বার্তাও প্রচার হচ্ছিল ইউটিউব চ্যানেল এবং ফেসবুক পেজে। এমনভাবে প্রচার হচ্ছিল যে, মানবিক ছাড়া পাষাণ হৃদয়ও ভয়ে মুহূর্তে গলে গিয়ে হাসপাতালে ছুটে এসেছে। কিন্তু এসে জানা গেলো পোড়া রোগীর চিকিৎসায় তেমন রক্ত দরকার পড়ে না। ফলে রক্তের জন্য হাহাকার পড়েনি। কাটা-ছেঁড়ায় অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণ হওয়া আহতদের মাঝে যেসব রক্ত গ্রুপ সহজে মেলে না, তা নিয়ে সংকট তৈরি হয়। কিন্তু বিষয়টি এমনভাবে প্রচার হচ্ছিল, যে কেউ দেখেই আহতদের প্রাণ রক্ষায় ছুটে এসেছেন চমেকে। এভাবে লোকের জটলা বেড়েছে।
এসব অসত্য তথ্য প্রচার নিয়ে উদ্বেগ ও বিরক্তি প্রকাশ করেছেন স্বয়ং চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মো. মমিনুর রহমানও। প্রেস ব্রিফিংকালে ডিসি মমিন বলেন, ‘অননুমোদিত অনলাইন চ্যানেল ও সামাজিক পেজে সীতাকুণ্ডের অগ্নি দুর্ঘটনায় হতাহতসহ নানা বিষয় নিয়ে অসত্য তথ্য প্রচার করা হয়েছে। এটি মোটেও শুভ নয়। ডিজিটালাইজেশনে অনলাইনে আয়ের পথ থাকায় এমন স্পর্শকাতর বিষয় নিয়েও মনগড়া, ভাসা কথা প্রচার করে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে। এটি মোটেও কাম্য নয়।’
সরেজমিন দেখা গেছে, সীতাকুণ্ডে অগ্নি দুর্ঘটনায় সৃষ্ট মানবিক সংকটে সব পেশার লোকজন স্বতস্ফূর্তভাবে সহায়তা দিচ্ছেন। ফায়ার সার্ভিস, সেনা, আনসারসহ সরকারি সব বিভাগের সঙ্গে যোগ দিয়েছে স্বেচ্ছাসেবী নানা সংগঠন। এসেছেন শিক্ষার্থী, যুবকসহ নানা পেশার মানবিক মানুষ।
আহতদের উদ্ধার, হাসপাতালে আনাসহ সব কাজে স্বাস্থ্যকর্মী ও প্রশাসনকে সহযোগিতা দিচ্ছে স্বেচ্ছাসেবী টিম। কিন্তু চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের ইমার্জেন্সি গেটসহ সব সেবাস্থলে প্রয়োজনের অধিক স্বেচ্ছাসেবীর উপস্থিতি জটলা ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে। স্বেচ্ছাসেবীর পোশাকে দাঁড়ানো অনেক উৎসুখ তরুণ দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে লাইভ প্রচার করছিল। ভিডিও ধারণ করে ছাড়ছিল নিজস্ব বা দলগত ইউটিউব চ্যানেল বা টাকার বিনিময়ে অন্যের চ্যানেলে।
আহত রোগী নিয়ে কোনো অ্যাম্বুলেন্স কিংবা সিএনজি অটোরিকশা এলেই সেবাকর্মীর সঙ্গে সঙ্গে ভিডিও অন করে মোবাইল ধরা অসংখ্য হাত সেই গাড়িকে ঘিরে ধরছে। এদের কারণে স্বেচ্ছােসবী কিংবা স্বাস্থ্যকর্মী কেউ যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে পারছিল না। কোনো ভিডিও কিংবা ছবি নিতে পারছিল না সত্যিকারের গণমাধ্যম কর্মীরাও। জেলা প্রশাসন কিংবা অন্য সরকারি সংস্থার ব্রিফিংয়েও গণমাধ্যমের ক্যামেরার আগে ব্যক্তিগত বা সামষ্টিক অনলাইন চ্যানেলগুলোর মোবাইল ক্যামেরা ভিড় জমিয়ে জটলা করেছে। এতে বাড়িয়েছে বিড়ম্বনা।
পতেঙ্গা থেকে রোগী নিয়ে আসা এনজিওকর্মী এরশাদুজ্জামান বলেন, ‘সীতাকুণ্ড ট্র্যাজেডি চরম হৃদয় বিদারক। এমন সংকটে সেবায় এগিয়ে আসা বড় মানবিকতা। এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগ বলা চলে। অনেক তথ্য প্রচার মাধ্যমের আগে লোকজন এখান থেকে জানতে পারছেন। আমরাও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই সীতাকুণ্ডের বিষয়টি জেনেছি। কিন্তু অনেকে কাল্পনিক তথ্য প্রচার করে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে। প্রশাসনিক কোনো অথরিটির বক্তব্য না নিয়ে নিজেদের মতো হতাহতসহ রাসায়নিক বিষক্রিয়ার তথ্য প্রচার করা হয়েছে। এতে ছড়িয়েছে আতঙ্ক। নিজের চ্যানেলের কাটতি বাড়িয়ে, কিছু আর্থিক লাভের আশায় এমন হটকারি প্রচারণা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য চরম ক্ষতিকর।’
এদিকে, নিজেদের চ্যানেলের ভিউয়ারদের সর্বশেষ আপডেট জানাতে চট্টগ্রাম শহর ও আনাচে-কানাচের অনলাইনসহ ঢাকা এবং অন্য জেলা শহরের পরিচিত ইউটিউবাররাও হাসপাতাল এলাকায় এসে রোববার মধ্যরাত পর্যন্ত লাইভ দিয়ে নিজেকে জাহির করেছেন। অনেকে নিয়ে এসেছেন বন্ধু ও সমর্থকদের বিশাল বহর। এরা আবার নিরাপত্তাকর্মীদের ঠেলে ইমার্জেন্সি কক্ষে প্রবেশ করেও লাইভ করেছে। এসব দেখে সেনাবাহিনী ও র্যাব জরুরি বিভাগের সামনে ও আশপাশ এলাকায় অতিরিক্ত স্বেচ্ছাসেবক এবং এসব ইউটিভারদের সরিয়ে দিলে ভোগান্তি কমে।
ডিপোতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও আগুনে রোববার রাত ১২টা পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৪৯ জন বলে জানিয়েছিলেন চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. ইলিয়াছ হোসেন চৌধুরী। তবে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মো. মমিনুর রহমান ব্রিফিংয়ে জানান, এসময় পর্যন্ত নিহত ৪৬ জনের তথ্য এসেছে তাদের কাছে। আর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন আরও ১৬৩ জন।
শনিবার (৪ জুন) রাত ৯টার দিকে সীতাকুণ্ডের সোনাইছড়ি এলাকায় বিএম কনটেইনার ডিপোতে আগুন লাগে। আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করার সময় রাসায়নিক থাকা একটি কনটেইনারে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। এটার পর আরও একাধিক কন্টেনার বিস্ফোরণ হয় বলে জানান আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করা প্রশাসনের টিম। এতে কয়েকশ মানুষ আহত হন। তাদের মধ্যে ডিপোর শ্রমিক, স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরাও রয়েছেন।
ঘটনার পরপরই আহতদের অধিকাংশকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। এ ছাড়া, অনেককে ভর্তি করা হয়েছে নগরীর অন্যান্য হাসপাতালেও। চিকিৎসাধীন অবস্থায় বেশ কয়েকজনের মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে ফায়ার সার্ভিসের ৯ কর্মীও রয়েছেন। রবিবার রাত ১২টা পর্যন্ত নিহত ২১ জনের পরিচয় শনাক্ত করেছে জেলা প্রশাসন। এদের মাঝে রাত ১০টা পর্যন্ত ১২ জনের মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে চমেকের জরুরি বিভাগের বাইরে স্থাপনকরা সহায়তা কেন্দ্রে টানানো নোটিশ বোর্ডে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিহতদের দাফনে জেলা প্রশাসনের পক্ষে জনপ্রতি ৫০ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়েছে। আহতদের প্রাথমিকভাবে দেওয়া হয়েছে ২৫ হাজার টাকা। এসব টাকা চমেকে চিকিৎসাধীনরা পেলেও অন্য হাসপাতালে চিকিৎসাধীনদের ব্যাপারে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন।
