দুই দুই বার সংরক্ষিত নারী ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, কিন্তু এখনো আঁকড়ে আছেন নিজের পুরোনো পেশা—হোটেলে থালা-বাসন ধোয়ার কাজ! একজন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হয়েও তিনি জীবিকা নির্বাহ করেন একটি হোটেলে থালা-বাসন ধোয়ার কাজ করে। অন্যের ভাগ্য বদলের জন্য কাজ করে গেলেও নিজের ভাগ্য উন্নয়নে জনপ্রতিনিধি হিসেবে বাড়তি অনৈতিক কোনো সুযোগ-সুবিধাও নেন না তিনি। আলোচিত এই ইউপি সদস্য হলেন তাড়াশ উপজেলার বারুহাস ইউনিয়নের খোদেজা খাতুন (৬৫)। একজন ইউপি সদস্যের এমন মানসিকতা মুগ্ধ করেছে এলাকাবাসীকেও।
মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা থাকার কারণে ২০১৬ সালে এলাকাবাসী খোদেজাকে ইউপি নির্বাচনে সংরক্ষিত আসনে দাঁড় করিয়ে দেন। মনোনয়নপত্র কেনারও টাকা ছিল না খোদেজার। এলাকাবাসী সেই টাকা জোগাড় করে তাকে প্রার্থী করেন। ঐ সময়ে খোদেজার গ্রাম বিনসাড়ায় কোনো প্রার্থী না থাকলেও পঞ্চম ধাপের ইউপি নির্বাচনে তার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন আরো সাত নারী। কিন্তু গত মেয়াদে তার নিষ্ঠা ও সততার পুরস্কার হিসেবে ভোটাররা আবারও তাকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত করেন। বিনসাড়া ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল হান্নান বলেন, মানুষের বিপদে-আপদে ছুটে যেতেন খোদেজা। ঐ সময়ে বিনসাড়া গ্রামে যোগ্য প্রার্থী না থাকায় খোদেজাকে প্রার্থী করা হয়েছিল। তার ওপর আস্থার প্রতিদান তিনি দিয়ে যাচ্ছেন।
২০১৬ সালে নির্বাচিত হওয়ার পরও তিনি নিজেকে এক বিন্দুও বদলাননি—যে হোটেলে কাজ করতেন সেখানেই থেকে যান। দ্বিতীয় দফা নির্বাচিত হওয়ার পরও তিনি আগের মতোই কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। মোছা. খোদেজা খাতুনের বাড়ি বারুহাস ইউনিয়নের বিনসাড়া গ্রামে। তার স্বামীর নাম মো. আবু তাহের (৭২)।
খোদেজা খাতুন বলেন, আমার নির্বাচন করতে কোনো পয়সা-কড়ি লাগে না। ভোটাররা প্রচার-প্রচারণা করেন। তাদের টাকাতেই আমি চা-পান খাই। নির্বাচন শেষ করে যথারীতি দিনমজুরের কাজ শুরু করি। বর্তমানে তাড়াশ বাজারের শাহ্ হোটেলে থালা-বাসন ধোয়ার কাজ করছি। সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত কাজ করে ১৫০ টাকা পাই।
শাহ্ হোটেলের ম্যানেজার আব্দুর রশিদ বলেন, ইউপি সদস্য খোদেজা খাতুন হোটেলের থালা-বাসন মাজেন ও রান্না করাসহ অন্যান্য কাজে সহায়তা করেন। তিনি তার কাজের ক্ষেত্রে যথেষ্ট দায়িত্বশীল। ইউনিয়ন পরিষদের মিটিংয়ের দিন আগে থেকে জানিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ছুটি নেন। মিটিং শেষে আবারও কাজে যোগ দেন।
খোদেজার ছেলে ভ্যানচালক খিদির হোসেন, ফয়েজ রহমান ও খাজামুল ইসলাম বলেন, নির্বাচনের জন্য ন্যূনতম খরচ করার সামর্থ্য নেই আমাদের। ভোটারদের এক কাপ চা ও একটি পান খাওয়াতে পারি না। আমাদের মাকে মানুষ যথেষ্ট শ্রদ্ধা করেন, খুব ভালোবাসেন। বিশেষ করে আমাদের মায়ের সততার জন্য বার বার মানুষ ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, স্বামীর সঙ্গে বিনসাড়া গ্রামের মনি পুকুর পাড়ে একটি ছাপড়া ঘর তুলে বসবাস করছেন খোদেজা। সেখানে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নেই, নেই সামান্যতম স্যানিটেশন সুবিধাও।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা আইন সহায়তা কেন্দ্রের সহকারী পরিচালক ও রাজশাহী বিভাগীয় কমিটির সভাপতি স্বপ্না চৌধুরী বলেন, সৎ থেকে যে কোনো কাজ করে খাওয়া নিসন্দেহে অধিক গর্বের। এই ধরনের মানুষের মানবাধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
বারুহাস ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ময়নুল হক বলেন, ইউপি সদস্য খোদেজা খাতুন ২ নাম্বার বারুহাস ইউনিয়নের সংরক্ষিত নারী আসনের বিনসাড়া ৭, চৌবাড়িয়া ৮ ও কুসুম্বী ৯ নাম্বার ওয়ার্ডের ১ হাজার ৭৩১ ভোট পেয়ে ইউপি সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। সরকারিভাবে তিন মাস অন্তর তিনি ১০ হাজার ৮০০ টাকা ভাতা পান। এত কম টাকায় পরিবারের সার্বিক ব্যয়ভার বহন করা সম্ভব না। দ্রুততম সময়ের মধ্যে তার বাড়িতে টয়লেট স্থাপন ও নলকূপ বসিয়ে দেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মেজবাউল করিম বলেন, ইউপি সদস্য খোদেজা খাতুন ১৪৬৬ দাগের ১ নাম্বার খাস খতিয়ানভুক্ত ভিটা শ্রেণির জায়গাতে বসবাস করছেন। কালের বিবর্তনে ২০ শতক জায়গার অধিকাংশ পুকুরে বিলীন হয়ে গেছে। সেখানে মাটি ভরাট করে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর দেওয়া হবে।
