পুলিশে পদায়ন বাণিজ্য: জড়িত প্রভাবশালী সিন্ডিকেট 

আপডেট : ১২ জুন ২০২২, ০০:১৬

পুলিশ বিভাগে পদায়নের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা নয়, ঘুষই প্রাধান্য পায়। এতে যোগ্যরা বঞ্চিত হন। আর যার খুঁটির জোর বেশি, তিনিই লাভবান হন। পুলিশে এই পরিস্থিতি বাড়ছে দলবাজি ও সুবিধাভোগীদের কারণে। সম্প্রতি বিভিন্ন পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত ১৮৪ পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে অনেকেই ভালো জায়গায় পদায়ন পেতে প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের কাছে জোর তদ্বির চালাচ্ছেন।

কথিত সিন্ডিকেটের সদস্যরা কোন জায়গায় পদায়ন পেতে কত টাকা লাগবে সেই রেটও নির্ধারণ করে দেয়। এমনও অভিযোগ পাওয়া গেছে। পুলিশের ইতিহাসে এতো বড় পদোন্নতি অতীতে কখনো হয়নি। তবে যোগ্যদের পদায়ন দিয়ে সেটা কাজে লাগাতে হবে। অভিমত সৎ ও নিষ্ঠাবান পুলিশ কর্মকর্তাদের। পদোন্নতিপ্রাপ্তদের কেউ কেউ ডিআইজি কিংবা অতিরিক্ত ডিআইজি হওয়ার যোগ্য নন, কিন্তু তারাও দলবাজি ও সিন্ডিকেটের কারণে পদোন্নতি ভাগিয়ে নিয়েছেন। কেউ কেউ আছেন টোল কালেকটর হিসেবে পরিচিতি। তারাই এখন রেঞ্জ ও জেলায় পদায়ন পেতে মরিয়া। কাকে কোথায় পদায়ন দেওয়া হবে, সেই আলোচনা এখন সর্বত্র।

সৎ ও নিষ্ঠাবান সিনিয়র একাধিক কর্মকর্তা বলেন, সততা, নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্ব দেখেই পুলিশ হেডকোয়ার্টারের মাধ্যমে পদায়নের যে প্রস্তাব দেওয়া হবে, সেটা বাস্তবায়িত হলে সঠিক পদায়ন হবে। তবে সেই প্রস্তাব পরিবর্তন হলে যোগ্যরা বঞ্চিত হবেন। মাঠ পর্যায়ে আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ব্যাহত হবে।

অপরদিকে জ্যেষ্ঠতা, অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা, সততা, নিষ্ঠাবান, পেশাদারিত্ব ও এসিআর রিপোর্টের ভিত্তিতে পদায়ন হওয়ার কথা থাকলেও বিশেষ সিন্ডিকেটের কারণে তা সম্ভব হয় না। বিগত সরকারের আমলে ঘুষের পাশাপাশি দলীয় লোকদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন দেওয়া হয়েছিল। সেই সব সরকারের আমলে পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নসহ নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিল।

বর্তমান সরকারের আমলেও সেই দলবাজ সিন্ডিকেটের তৎপরতা অব্যাহত আছে। এতে লাভবান হচ্ছেন ঘুষখোর ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা। এ কারণে মাঠ পর্যায়ের অপরাধ দমনে কোন কোন ক্ষেত্রে ব্যর্থ হচ্ছে পুলিশ। একটি জেলার দায়িত্বে থাকেন এসপি। তার সঙ্গে দুইয়ের অধিক জন অতিরিক্ত এসপি থাকেন। আর রেঞ্জে, অর্থাত্ বিভাগীয় পর্যায়ের প্রধান হলেন ডিআইজি। তার সঙ্গে থাকেন দুই থেকে তিন জন অতিরিক্ত ডিআইজি।

এছাড়া আরো অনেক কর্মকর্তা থাকেন। এসবের অধিকাংশের পদায়ন জ্যেষ্ঠতা, অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা, সততা, নিষ্ঠাবান ও পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে হচ্ছে না। যাদের ঘুষ খাওয়ার অভিজ্ঞতা বেশি তাদের ভাল স্হানে পদায়ন দেওয়া হয়। তারাই দুর্নীতি ও অনিয়মের সাথে জড়িত। দলবাজ, টোল কালেকটর হিসেবে পরিচিতরা সত্ ও যোগ্য পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। একাধিক অযোগ্য কর্মকর্তা পদোন্নতি পেয়েই কোন কোন সৎ কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়ারও কলকাঠি নাড়ছেন।

পুলিশ বিভাগে গুরুত্বপূর্ণ পদে যারা সততা ও নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন, তারা পুলিশের এসেট হিসেবে পরিচিত সর্বমহলে পরিচিতি, তাদের সংখ্যা সর্বাধিক। একাধিক কর্মকর্তা বলেন, দলবাজ আর সিন্ডিকেটের প্রভাবে দায়িত্ব পালন করাও কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

তারা বলেন, রেঞ্জ, মেট্রোপলিটন এলাকা ও জেলায় পদায়নের ক্ষেত্রে সততা, নিষ্ঠাবান, পেশাদারিত্ব ও বার্ষিক এসিআর রিপোর্টকে মূল্যায়ন করা উচিত। কারণ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পদায়ন হলে আরেকটি সিন্ডিকেট তৈরি হয়ে যাবে। করোনার সময় মৃত ব্যক্তিদের গোসল করানো, দাফন করা, মানুষের ঘরে খাবার পৌঁছে দেওয়াসহ নানা মানবিক কারণ করে পুলিশ জনগণের আস্হা অর্জন করেছে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের রক্তসহ ওষুধ সামগ্রী পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে। ২৪ ঘণ্টা বিরতিহীনভাবে মানবিক সেবা দিয়েছেন। মানুষের কাছে মানবিক পুলিশ হিসেবে সুনাম অর্জন করেছে। অযোগ্য ও কথিত ঘুষখোরদের পদায়ন রুখতে না পারলে সেই অর্জনও ভূলণ্ঠিত হবে।

সৎ ও নিষ্ঠাবান ওসি লেভেলের কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, তাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ঘুষ না দিলে যে ভাষায় কথা বলেন, তা মুখে বলা যায় না। আমরা চাই, উপরের কর্মকর্তা হিসেবে সৎ ও নিষ্ঠাবান অফিসাররা আসুক। কারণ ঘুষখোর অফিসারদের ম্যানেজ করতে গিয়ে আমাদের নানা কায়দায় পাবলিকের কাছ থেকে টাকা নিতে হয়।

এদিকে পুলিশ বিভাগে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটের সদস্যদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা না থাকলেও এসিআর রিপোর্ট ভাল। কারণ তারা মোটা অঙ্কের উত্কোচ দেন এক শ্রেণীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের। এ কারণে তারা পান ভাল এসিআর। 

ইত্তেফাক/এএএম