বৃহস্পতিবার, ১৮ আগস্ট ২০২২, ৩ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বিধি লঙ্ঘন করলে শাস্তির এখতিয়ার রয়েছে ইসির

আপডেট : ১৪ জুন ২০২২, ০৬:৩৭

এমপি-মন্ত্রী, সুবিধাভোগী বা অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নির্বাচনি এলাকায় অবস্থান করা নিয়ে নির্বাচনি আচরণ বিধিমালাতেই অস্পষ্টতা রয়েছে। তবে এসব সুবিধাভোগী বা অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা নির্বাচনি এলাকায় অবস্থান করে আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা আইনে রয়েছে। এক্ষেত্রে ছয় মাসের জেল অথবা ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয়দণ্ড দেওয়ার নির্দেশনা আছে। এমনকি ঐ ব্যক্তিরা আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে এবং এরসঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর সংশ্লিষ্টতা থাকলে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতাও দেওয়া আছে। এদিকে সোমবার কুমিল্লায় নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. আহসান হাবিব খান ও রাশেদা সুলতানা কুমিল্লা-৬ আসনের এমপি আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহারের নির্বাচনি এলাকায় অবস্থান নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করেছেন। 

তারা বলেছেন, একজন সম্মানিত লোককে টেনেহিঁচড়ে নামানো কমিশনের কাজ নয়। কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীন ১৫ জুন কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই নির্বাচনে স্থানীয় এমপির এলাকায় অবস্থান করা নিয়ে গত রবিবার সিইসি জানিয়েছিলেন, এমপি আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন। এমন তথ্যপ্রমাণ আমাদের হাতে রয়েছে। তাকে এলাকা ছাড়তে আমরা চিঠি দিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি এলাকা ত্যাগ করেননি। এরপরও না মানলে কিছু করার থাকে না কমিশনের। সিইসির এভাবে অসহায়ত্ব প্রকাশ আগামী জাতীয় নির্বাচনে নেতিবাচক বার্তা দেবে বলে মনে করেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা।

নির্বাচনি আচরণ বিধিমালা (সিটি করপোরেশন), ২০১৬ অনুযায়ী, এমপির নির্বাচনি এলাকায় থাকতে পারবেন কি-পারবেন না সে বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা নেই। বিধিমালার ২২ ধারায় উল্লেখ আছে, ‘সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী নির্বাচন পূর্ব সময়ে নির্বাচনি এলাকায় প্রচারণা বা নির্বাচনি কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না।’ এই বিধান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে সাধারণত মন্ত্রী-এমপিদের বা সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বলা হয়ে থাকে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কেবল নির্বাচনি প্রচারণায় বা কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন না। এখানে নির্বাচনি এলাকায় থাকতে পারবেন না—এই বিষয়ে কোনো নির্দেশনা নেই। তবে বিধিমালার ২২ ধারার শর্তে উল্লেখ রয়েছে যে এরূপ কোনো ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি এলাকার ভোটার হলে তিনি কেবল তার ভোট প্রদানের জন্য ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবেন।

শর্তের এই বিধানের ব্যাখ্যায় অনেকে মনে করেন যে, সুবিধাভোগী গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা ভোটের দিন শুধু ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবেন। কিন্তু এলাকায় থাকতে পারবেন না। এটি একটি ধারণা। এই ধারণা থেকেই নির্বাচন কমিশনও অতীতের সব নির্বাচনে সুবিধাভোগী গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নির্বাচনি এলাকায় না থাকার নির্দেশ দিয়ে আসছে। কোথাও কোথাও সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এই বিধান লঙ্ঘন করার চেষ্টা করলে অতীতে কমিশন কঠোরভাবে তাদেরকে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করেছিল। বিশেষ করে এমপিদের নির্বাচনি এলাকা ছাড়ার জন্য কখনো কখনো লিখিতভাবে স্পিকারের সহযোগিতাও গ্রহণ করে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি।

কিন্তু আচরণ বিধিমালার নির্দেশনা সিইসির এই অসহায়ত্বকে সমর্থন করে না। এ সংক্রান্ত ধারা ৩১ এ বলা আছে, কোনো প্রার্থী বা তার পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি নির্বাচন পূর্বসময়ে এই বিধিমালার কোনো বিধান লঙ্ঘন করলে অনধিক ছয় মাসের কারাদণ্ড অথবা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এমনকি কোনো প্রার্থী আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে তার প্রার্থিতা বাতিল হবে এবং কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রতিষ্ঠান শাস্তির আওতায় পড়বে।

আচরণবিধি প্রতিপালন করার জন্য তপশিল ঘোষণার পর নির্বাচন কমিশন নির্বাহী এবং বিচারিক দুই ধরনের ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করে থাকে। একই সঙ্গে ভ্রাম্যমাণ আদালতও পরিচালিত হয়। কোথাও নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা রিটার্নিং অফিসার বা কমিশনের দৃষ্টিগোচরে আসলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিচারিক হাকিমের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। রিটার্নিং অফিসার বিচারিক হাকিমের সহযোগিতা নিয়ে আইন কার্যকর করে থাকেন।

এ প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচন কমিশনের (ইসি) হাতে অগাধ ক্ষমতা দেওয়া আছে। কিন্তু কুমিল্লায় ইসি অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছে, এটা ভালো লক্ষণ নয়। সিইসি যে অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন তাতে নির্বাচনি ব্যবস্থাপনায় হতাশা ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হতে পারে। সিইসির এই অসহায়ত্ব প্রকাশ আগামী নির্বাচনে নেতিবাচক বার্তা দেবে।

প্রসঙ্গত, গত ৮ জুন ইসির দেওয়া চিঠির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন স্থানীয় ঐ এমপি। পরে হাইকোর্ট চিঠি কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করে। তবে চিঠির ওপর কোনো স্থগিতাদেশ দেয়নি।

ইত্তেফাক/ ইআ