উৎসে কর ০.৫% বহাল রাখার দাবি বিজিএমইএর

আপডেট : ১৪ জুন ২০২২, ০২:১১

পোশাক রপ্তানির ওপর উৎসে কর শুন্য দশমিক ৫০ শতাংশ বহাল রাখার দাবি জানিয়েছেন বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান।  সোমবার (১২ জুন) দুপুরে রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ দাবি জানান।

বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে পোশাক রপ্তানির ওপর উৎসে কর শুন্য দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি করে ১ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য অত্যন্ত দুরূহ হবে। যখন কি না এ শিল্প মহামারি থেকে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, তাই কর বাড়ানোর জন্য এটা সঠিক সময় নয়। বর্তমানে অস্থিরতাময় বিশ্ব বাণিজ্য পরিস্থিতি আমাদের পোশাকশিল্পের জন্যও বেশকিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে এই উৎসে কর বৃদ্ধির প্রস্তাব পোশাকশিল্পের টিকে থাকার সংগ্রামটি আরো কঠিন করে তুলবে। তিনি বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে একদিকে যেমন জ্বালানি তেলসহ খাদ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে ইউরোপসহ বিশ্বের বেশকিছু দেশে অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কাও বাড়ছে। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতিও তীব্র আকার ধারণ করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য দেশগুলো সুদের হার বাড়াচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের পণ্যের চাহিদা ও ক্রয়ক্ষমতা কমেছে এবং সামনে আরো কমে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, গত ৭ জুন বিশ্বব্যাংক তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দিয়েছে, বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব এবং স্থবির চাহিদার কারণে অর্থনৈতিক মন্দা তীব্র হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে পোশাক রপ্তানিতে বর্তমানে যেই প্রবৃদ্ধিটি দেখা যাচ্ছে, সেটি আগামীতে চলমান থাকার লক্ষণ আমরা দেখছি না। বরং বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, যেখানে ২০২১ সালে বিশ্ব বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ৩ শতাংশ, সেটা ২০২২ সালে ৪ শতাংশে নেমে আসবে।

সেই সঙ্গে শিল্পের কাঁচামাল সংগ্রহ, কনটেইনার ভাড়া, ডিজেলে মূল্যসহ সামগ্রিক উৎপাদন খরচ বিগত পাঁচ বছরে গড়ে প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। আর সম্প্রতি গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির ফলে উৎপাদন খরচ আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। আবার সম্প্রতি বিশ্বব্যাপী ডলার শক্তিশালী অবস্থান নিয়েছে। ডলারের বিপরীতে ইউরো যেভাবে মান হারাচ্ছে, তাতে করে চলতি বছরের শেষ নাগাদ ইউরো ও ডলারের মূল্য সমান পর্যায়ে চলে আসতে পারে, অর্থাৎ ১ ইউরো নিয়ে ১ ডলার পাওয়া যাবে। ফলে ইউরোপের বাজারে আমাদের পণ্যের মূল্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়াটা অস্বাভাবিক নয়, যোগ করেন তিনি।

বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, বিগত প্রায় দুই বছরে করোনার কারণে যেখানে আমাদের তেমন কোনো কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের রেমিট্যান্সে মন্দাভাব ও আমদানি ঊর্ধ্বগতির কারণে ব্যালেন্স জব পেমেন্টে চাপ তৈরি হয়েছে। আর ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে অর্থনৈতিক মন্দার যে পূর্বাভাস আমরা পাচ্ছি সেটা মোকাবিলায় আমাদের প্রস্ত্তত থাকতে হবে। এ পরিস্থিতিতে সর্ববৃহত্ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত, পোশাকশিল্পের অগ্রযাত্রা যে কোনোভাবেই হোক মসৃণ রাখা জরুরি। তাই পোশাকশিল্পে উৎসে কর বর্তমানে যে অবস্থায় রয়েছে, সে অবস্থায় রাখার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী সুবিবেচনায় রাখবেন বলে আশা করছি।

সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, রপ্তানির বিপরীতে প্রযোজ্য উৎসে কর শুন্য দশমিক ৫০ শতাংশ আগামী পাঁচ বছর পর্যন্ত কার্যকর রাখলে শিল্পটি বর্তমান সংকটকালীন সময়ে স্বস্তিতে থাকবে। শিল্প টিকে থাকলে রাজস্ব আসবে, নতুন নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে আমাদের পোশাক রপ্তানি ছিল ২৭ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার, ৮৩ দশমিক ৪৫ টাকা এক্সচেঞ্জ রেট হিসেবে টাকার অঙ্গে রপ্তানি আয় হয়েছিল ২ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা, অর্থাৎ শুন্য দশমিক ৫০ শতাংশ হারে উৎসে ১ হাজার ১৬৬ কোটি টাকা উৎসে কর প্রদান করা হয়।

২০২০-২১ অর্থবছরে রপ্তানি ছিল ১ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার, ৮৩ দশমিক ৯৫ টাকা এক্সচেঞ্জ রেট হিসেবে টাকার অঙ্কে রপ্তানি আয় হয়েছিল ২ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা, অর্থাৎ শুন্য দশমিক ৫০ শতাংশ হারে উৎসে ১ হাজার ৩২০ কোটি টাকা উৎস কর প্রদান করা হয়। আর চলতি অর্থবছর ২০২১-২২ শেষে রপ্তানি ৪১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে আশা করছি, ৮৭ টাকা এক্সচেঞ্জ রেট হিসেবে টাকার অঙ্কে রপ্তানি আয় হবে ৩ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা, অর্থাৎ শুন্য দশমিক ৫০ শতাংশ হারে উৎসে ১ হাজার ৭৮৩ কোটি টাকা উৎসে কর প্রদান করা হবে।

আর সামনের অর্থবছর ২০২২-২৩ এ আমরা যদি ৪৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি করতে পারি তবে ৯২ টাকা এক্সচেঞ্জ রেট হিসেবে টাকার অঙ্কে রপ্তানি হবে ৪ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা, অর্থাৎ শুন্য দশমিক ৫০ শতাংশ হারে উৎস ২ হাজার ৭০ কোটি টাকা উৎসে কর প্রদান করা হবে। অর্থাৎ আমরা যদি প্রতিযোগী সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে রপ্তানি বাড়াতে পারি, তাহলে কর হার না বাড়িয়েও রাজস্ব বাড়ানো সম্ভব হবে। এতে করে সামষ্টিক অর্থনীতি উপকৃত হবে।

ফারুক হাসান বলেন, আমরা নন-কটন খাতে বিনিয়োগ ও রপ্তানি উত্সাহিত করতে, নন-কটন পোশাক রপ্তানির ওপর ১০ শতাংশ হারে বিশেষ প্রণোদনা প্রদানের জন্য অনুরোধ করছি। আমাদের মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় ৭৪ শতাংশ কটনের তৈরি, যেখানে বিশ্বের মোট টেক্সটাইল কনজাম্পশনে কটনের শেয়ার মাত্র ২৫ শতাংশ। বর্তমান বিশ্বে ভোক্তাদের ক্রমাগত জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং টেকসই ও পরিবেশবান্ধব পোশাকের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে নন-কটন পণ্যের চাহিদা বাড়ছে।

তিনি বলেন, আমরা নগদ সহায়তার ওপর প্রযোজ্য ১০ শতাংশ আয়কর প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছি। যেহেতু নগদ সহায়তা কোনো ব্যাবসায়িক আয় নয়, তাই নগদ সহায়তার অর্থকে করের আওতার বাইরে রাখাই যুক্তিযুক্ত। পরিবেশবান্ধব কারখানা তৈরির অন্যতম উপাদান সোলার প্যানেল আমদানিতে শুল্কহার শূন্য থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে। শিল্পে পরিবেশগত টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি সূচিত হয়েছে, তার ধারা অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে সোলার প্যানেল আমদানিতে শুল্কহার শূন্য করা হোক।

ইত্তেফাক/ ইআ