শুক্রবার, ১৯ আগস্ট ২০২২, ৪ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

কার্ল ল্যান্ডস্ট্যাইনার: রক্তের গ্রুপ আবিষ্কার করে মানবজাতিকে ঋণী করেছেন যিনি

আপডেট : ১৪ জুন ২০২২, ২০:০৭

ছোট একটা পরিসংখ্যান দিয়ে শুরু করা যাক। প্রতিবছর বিশ্বে গড়ে প্রায় ১১৮ মিলিয়ন ইউনিট রক্তের প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশে রক্তের চাহিদা বছরে ৬ লাখ ব্যাগ।

স্বেচ্ছায় রক্তদাতা বিভিন্ন সংগঠন ও সাধারণ মানুষের মানবিকতায় মিটছে চাহিদা। সারাবিশ্ব অথবা বাংলাদেশ, প্রতিদিনই রক্তের চাহিদা বাড়ছে। এমন একসময় ছিল, যখন রক্তের অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরতো মানুষ। এখন রক্তদাতা তৈরি হচ্ছে। রক্তদানকে লোকে ভয় পায় না। এসবের জন্য আপনি কাকে ধন্যবাদ দেবেন? সাহসী সেই ব্যক্তিদের নিশ্চয়ই, যারা ছুটে যান মানবতার ডাকে সাড়া দিতে! তবে আসল ধন্যবাদ প্রাপ্য অন্য একজন! 

১৮৬৮ সালের ১৪ জুন, অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় যার জন্ম। যার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তার জন্মদিনে পালন করা হয় বিশ্ব রক্তদাতা দিবস। তিনি 'কার্ল ল্যান্ডস্ট্যাইনার।' এই চিকিৎসাবিজ্ঞানী সর্বপ্রথম আবিষ্কার করেন রক্তের গ্রুপ। ল্যান্ডস্ট্যাউনারের প্রতি রক্তদাতা এবং রক্তগ্রহীতা তো বটেই, কৃতজ্ঞ গোটা মানবজাতি।

কার্ল ছোট বেলা থেকে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। ১৭ বছর বয়সে ভর্তি হন ভিয়েনা মেডিক্যাল কলেজে। ছাত্রাবস্থাতেই গবেষণায় নেমে পড়েন। ২৩ বছর বয়সে নামের পাশে ডক্টরেট ডিগ্রি যুক্ত হলে নড়েচড়ে বসেন চিকিৎসাবিজ্ঞানের তাবড়-তাবড় লোকেরা। 'রক্তের উপাদানের ওপর খাদ্যের কেমন প্রভাব পড়তে পারে'—এ সংক্রান্ত গবেষণাপত্র প্রকাশ করে হৈচৈ ফেলেন চারদিকে। সবাই একবাক্যে স্বীকার করে, একদিন বিশ্বসেরা ডাক্তার হবে এই ছেলে। ঠিক তখনই অবাক করেন কার্ল ল্যান্ডস্ট্যাইনার স্বয়ং! চিকিৎসাসেবার পথে নয়, গবেষণার অকূল দরিয়ায় নিজেকে সমর্পণ করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

এই তো একশতক আগেও মানবদেহে রক্ত সঞ্চালন ছিল অনেকটা ধোঁয়াশা। বিভিন্ন রোগবালাই ও দুর্ঘটনার ফলে রক্তের ঘাটতি অহরহই লেগে থাকতো। জটিল প্রক্রিয়া শেষে রক্ত দেওয়া গেলেও, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রোগী ঢলে পড়তো মৃত্যুর কোলে। চিকিৎসকরা কোনোভাবেই কিনারা করতে পারছিলেন না সেই রহস্যের। কার্ল ল্যান্ডস্ট্যাইনার লক্ষ করছিলেন সবকিছু। ১৯০০ সালের শুরুতে গবেষণা শুরু করেন তিনি। ততদিনে প্রকট আকার ধারণ করে রক্ত-সংক্রান্ত এসব সমস্যা। এর আগে এটি নিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে কাজ হলেও বিজ্ঞানসম্মত উপায় বের করতে পারেনি কেউই। বিভিন্ন মানুষের রক্ত সংগ্রহ করতে আরম্ভ করেন কার্ল। গবেষণাগারে নিয়ে এক রক্তের সঙ্গে আরেক রক্ত মিশিয়ে দেখলেন কী হয়! দেখতে পেলেন, কিছু রক্তের মিশ্রণে রক্তজমাট বাঁধতো। আবার, কিছু ক্ষেত্রে জমাট বাঁধতো না। এমনকি জমাট বাঁধার ধরনেও ভিন্নতা থাকে। দেখা গেলো, একই রক্ত একসঙ্গে  সবগুলোর সঙ্গে জমাট বাঁধতো না। রহস্য উন্মোচনের নেশা চাপে কার্ল ল্যান্ডস্ট্যাইনারের মাথায়। একবছর গবেষণার পর রক্তের অ্যান্টিবডি-এ ও অ্যান্টিবডি-বি আবিষ্কার করেন। দুটোর উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে রক্তকে এ, বি, ও (ABO)- তিন শ্রেণিতে ভাগ করেন।

আরও বছরখানেক পর কার্ল ও সহকর্মীরা মিলে চতুর্থ ধরন এবি (AB) গ্রুপ নির্ণয় করেন। ব্লাড গ্রুপিংয়ের মাধ্যমে রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়া চালু করার পরে সফল প্রয়োগ দেখা গেলেও, কিছু ক্ষেত্রে রোগীর শরীরে জটিলতা প্রকাশ পেতে লাগলো। রক্ত রহস্যের জট খুলতে গিয়ে বরঞ্চ যেন জট পাকিয়ে যায়। কার্ল ল্যান্ডস্ট্যাইনার ফের গবেষণায় মত্ত হন। সহযোগী আলেকজ্যান্ডার ওয়াইনারকে নিয়ে নেমে পড়েন সমস্যা অবলোকনে। দুই জন মিলে পরীক্ষা চালান রেসাস প্রজাতির বানরের দেহে। সেখানে কিছু ফ্যাক্টর লক্ষ করেন তারা। যেসব ফ্যাক্টর বিভিন্ন গ্রুপের রক্ত জমাট বাঁধার পেছনে দায়ী ছিল। এমনকি একই গ্রুপের রক্তের ক্ষেত্রে ফ্যাক্টরের উপস্থিতি-অনুপস্থিতি সমস্যা তৈরি করতো। মানব শরীরে অভিন্ন পরীক্ষা চালান দু'জন। মানব শরীরে ফ্যাক্টরের উপস্থিতি নির্ণয় করেন সফলভাবে। ১৯৩৭ সালে রেসাস বানরের নামের সঙ্গে মিলিয়ে কার্ল ল্যান্ডস্ট্যাইনার আবিষ্কার করেন রেসাস ফ্যাক্টর বা সংক্ষেপে আরএইচ ফ্যাক্টর (rh factor)। এতে করে এ, বি, ও (ABO) গ্রুপের সঙ্গে গাণিতিক চিহ্ন যোগ ও বিয়োগ যুক্ত করে রেসাস ফ্যাক্টরের উপস্থিতি আলাদা করা হয়। সেই থেকে আজ অবধি রক্তের গ্রুপিং প্রক্রিয়া এভাবেই হয়ে আসছে। যা সহজ করেছে রক্তদান ও নিশ্চিত করেছে নিরাপত্তা। 

১৯৩০ সালে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন কার্ল। ১৯৪৬ সালের ২৬ জুন মৃত্যুবরণ করেন মহান এই চিকিৎসক ও গবেষক। কার্ল ল্যান্ডস্ট্যাইনার বেঁচে থাকবেন তার গবেষণাপত্রের প্রতি পাতায়, প্রতি শব্দে। তারচেয়ে বেশি বাঁচবেন রক্তের প্রতি বিন্দুতে। রক্তদান এমন এক ব্যাপার, যা জাতি, ধর্ম, বর্ণের ভেদাভেদ ভুলিয়ে সম্প্রীতির বার্তা বয়ে চলে। হাসি ফোটায় মৃত্যু পথযাত্রীর ঠোঁটের কোণে। রক্তের গ্রুপ আবিষ্কার করে পৃথিবীর মানুষদের কতখানি ঋণী করে গেছেন কার্ল ল্যান্ডস্ট্যাইনার, সেটি কখনো জানা হবে না তার।

ইত্তেফাক/এসটিএম