শততম জন্মবার্ষিকীতে স্মরণ

মাজহারুল ইসলাম: আধুনিকতা আর দেশীয় সংস্কৃতির মিশেলে স্থাপত্য গড়ার পথিকৃৎ যিনি

আধুনিকতা আর দেশীয় সংস্কৃতির মিশেলে স্থাপত্য গড়ার পথিকৃৎ এই স্থপতি।  তিনি দেখিয়েছেন আমাদের মাটি, বায়ু আর সংস্কৃতিকে কী নিপুণ কায়দায় তুলে ধরা যায় স্থাপত্যে। তিনি একইসঙ্গে আধুনিকতা ও দেশজ সংস্কৃতির সমন্বয় ঘটিয়েছেন। স্থাপত্যকে কখনো শুধু শহরকেন্দ্রিক দর্শনীয় বস্তুতে রূপান্তর করতে চাননি

আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০২৩, ২৩:৪৫

বর্তমান বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় 'গ্রিন আর্কিটেকচার' বা সবুজ স্থাপত্য গড়ার দিকে ঝুঁকছে, পরিবেশসচেতন হওয়ার কথা ভাবছে। স্থাপত্য ও নগর পরিকল্পনায় জোর দেওয়া হচ্ছে বৃক্ষের আচ্ছাদন তৈরিতে। অথচ আজ থেকে প্রায় সাত দশক আগে— মাত্র ত্রিশ বছরবয়সী একজন বাঙালি স্থপতি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউট ডিজাইন করেন, তখন তিনি ভূমি জরিপকারীকে বলেছিলেন, আমাকে প্রতিটি গাছের অবস্থান চিহ্নিত করে দিন। সে অনুযায়ী কোনো গাছ না কেটেই তিনি পুরো প্রকল্পের পরিকল্পনা করেন। চারপাশের প্রকৃতিকেই করে নেন মূল উপজীব্য, যেখানে আলো-বাতাসের নিরবছিন্ন প্রবাহের পাশাপাশি উপভোগ্য হয়ে  ওঠে সবুজের সমারোহ। ভাবতে পারেন —এতগুলো বছর আগেও একজন বাঙালি স্থপতি পরিবেশের প্রতি এতটা সংবেদনশীল ও মানবিক ছিলেন —যখন বিশ্বও এমন চিন্তা ধারণ করতে শেখেনি!

স্থাপত্য ও পরিকল্পনার সঙ্গে সম্পৃক্ত যারা, তারা স্পষ্টতই বুঝতে পারছেন কার কথা বলছি। অন্য যারা এই পেশাজীবীদের সম্পর্কে সঙ্গে খুব একটা পরিচিত নন, তাদের কাছে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি এই কীর্তিমান বাঙালি স্থপতিকে। তাঁর নাম মাজহারুল ইসলাম। তিনি বাংলাদেশে স্থাপত্যপেশাচর্চার পথিকৃৎ। আধুনিকতা আর দেশীয় সংস্কৃতির মিশেলে স্থাপত্য গড়ার অনন্য উদাহরণ রেখে গেছেন তিনি। আজ সোমবার (২৫ ডিসেম্বর ২০২৩) স্থাপত্যাচার্য মাজহারুল ইসলামের শততম জন্মবার্ষিকী।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। ছবি: সংগৃহীত

দেশের অনেক বিখ্যাত স্থাপনার নকশা করেছেন এই স্থপতি, যার পেছনে ছিল তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো জাহাঙ্গীরনগর ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, শাহবাগের গণগ্রন্থাগার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট ও নীপা ভবন, আগারগাঁওয়ের জাতীয় গণগ্রন্থাগার ও আর্কাইভ ভবন, আজিমপুর এস্টেট, জয়পুরহাট হাউজিং, এবং বেশকিছু পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট। এছাড়া লুই আই কানের সঙ্গে জাতীয় সংসদ ভবন ও পল রুডলফের সঙ্গে ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী স্থপতি হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি।

প্রকৃতি যে স্থাপত্যকলার বাইরে নয়, বারবার তা প্রমাণ করেছেন মাজহারুল ইসলাম। দেখিয়েছেন আমাদের মাটি, বায়ু আর সংস্কৃতিকে কী নিপুণ কায়দায় তুলে ধরা যায় স্থাপত্যে। তিনি একইসঙ্গে আধুনিকতা ও দেশীয় সংস্কৃতির সমন্বয় ঘটিয়েছেন। স্থাপত্যকে কখনো শুধু শহরকেন্দ্রিক দর্শনীয় বস্তুতে রূপান্তর করতে চাননি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউট। ছবি: আসিফ সালমান

মাজহারুল ইসলামের জন্ম ১৯২৩ সালের ২৫ ডিসেম্বর তার নানার বাড়ি পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে। বাবা ছিলেন ওমদাদুল ইসলাম ছিলেন কৃষ্ণনগর কলেজের গণিতের শিক্ষক। কৃষ্ণনগর কলেজ স্কুলে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছিলেন মাজহারুল ইসলাম। এরপর বাবার বদলির কারণে তারা চলে আসেন রাজশাহীতে। তাকে ভর্তি করানো হয় রাজশাহী কলেজ স্কুলে। রাজশাহী কলেজ স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করে তিনি ভর্তি হন রাজশাহী কলেজে। উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্নের পর পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে অনার্স পড়ার সময়ই সুযোগ পান শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়ার। সেখানে ১৯৪৬ সালে প্রকৌশলবিদ্যায় ডিগ্রি অর্জন করেন। অল্পকিছুদিন পর দেশভাগ হয়। ১৯৪৭ সালে মাজহারুল ইসলাম ঢাকায় পূর্ব পাকিস্তান সরকারের যোগাযোগ, বিল্ডিং ও সেচ মন্ত্রণালয়ে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন। ১৯৫০ সালে ‘পোস্টওয়ার ডেভেলপমেন্ট’ স্কলারশিপ নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অরিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্যবিদ্যায় পড়তে চলে যান। সেখানে তাঁর দু'জন অধ্যাপক রস ও হেইডেন তাকে বলতেন, 'আমরা এখানে ইউরোপীয় ধাচে স্থাপত্য শেখাই। কিন্তু তুমি ভারতবর্ষ থেকে এসেছো, মনে রাখবে তোমাদের সংস্কৃতি বহু পুরনো এবং ভীষণ গর্বের। তোমাকে নিজের চেষ্টায় তা শিখে নিতে হবে।' এই প্রেরণাই কাজ করেছে মাজহারুল ইসলামের ভেতরে, যার মাধ্যমে পুরকৌশলী থেকে একজন সৃষ্টিশীল স্থপতিতে পরিণত হন তিনি।

দেশে ফেরার পর সেসময়কার প্রধান স্থপতি রেমন্ড ম্যাককনেল মাজহারুল ইসলামকে আর্ট কলেজ ও লাইব্রেরি ডিজাইনের দায়িত্ব দেন। একনাগাড়ে ছয় মাসের পরিশ্রমে এই দুই অনন্য স্থাপনা ডিজাইন করেন তিনি। তৎকালীন আর্টকলেজ বা চারুকলার দালান ও এর পরিবেশ-প্রতিবেশকে এমনভাবে বুনট করেন, যেন তা শিল্পকলায় পড়তে আসা ছাত্রছাত্রীদের সৃজনশীলতা বিকাশে সহায়ক হয়। সেসময় প্রতিষ্ঠানটিতে অধ্যক্ষ ছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন; ছিলেন কামরুল হাসান, সফিউদ্দীন আহমেদ, মোহাম্মদ কিবরিয়া ও রশীদ চৌধুরী। তাঁদের প্রগতিশীল কর্মকাণ্ডে আর্ট কলেজ একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়। মাজহারুল ইসলামও তখন এসব কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন।

চারুকলা ইন্সটিটিউট বা তৎকালীন আর্ট কলেজের ডিজাইন। ছবি: মাজহারুল ইসলাম আর্কাইভস

১৯৫৬ সালে বৃত্তি নিয়ে তিনি লন্ডনের এএ স্কুল অব আর্কিটেকচারে ট্রপিক্যাল আর্কিটেকচারের ওপর পড়াশোনা করেন। ১৯৫৯ সালে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে অনুষ্ঠিত গভর্নরস কনফারেন্সে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে দ্বিতীয় রাজধানী নির্মাণের প্রস্তাব গৃহীত হয়। তখন স্থপতি মাজহারুল ইসলামকে দ্বিতীয় রাজধানীর পরিকল্পনা প্রণয়নের অনুরোধ করেন কেন্দ্রীয় পূর্তমন্ত্রী। কিন্তু মাজহারুল ইসলাম নিজে এই পরিকল্পনা না করে বরং পৃথিবীর খ্যাতনামা কোনো স্থপতিকে এই কাজে আমন্ত্রণ জানানোর কথা বলেন। পরে তাঁর প্রস্তাবে রাজি হন মার্কিন স্থপতি লুই আই কান। পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশে এসে লুই আই কান মাজহারুল ইসলামের সঙ্গে পুরো দেশ ঘোরেন। বুঝতে চেষ্টা করেন এই দেশের সংস্কৃতি ও প্রকৃতিকে। শেষপর্যন্ত সংসদ ভবনসহ শেরেবাংলা নগরের পরিকল্পনা করেন। যা এখন বিশ্বের সবচেয়ে নন্দিত স্থাপত্যকর্মগুলোর একটি।

ন্যাশনাল লাইব্রেরি অ্যান্ড আর্কাইভস। ছবি: সংগৃহীত

১৯৬০ সালে ইয়েল ইউনিভার্সিটিতে মাস্টার্স করেন মাজহারুল ইসলাম। ১৯৬১ সালে সরকারের বাধার মুখেও রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদ্​যাপনে অন্যতম মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন তিনি, আর তখন তিনি মোজাফফর আহমদের বাম রাজনৈতিক দল ন্যাপের কোষাধ্যক্ষ হিসেবে রাজনীতিতে প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৬৪ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে দেন মাজহারুল ইসলাম। প্রধান স্থপতি ম্যাককনেলের সঙ্গে তাঁর বনিবনা হচ্ছিলো না। পরে তিনি প্রকৌশলী শহীদুল্লাহকে সঙ্গে নিয়ে গড়ে তোলেন নিজের প্রতিষ্ঠান বাস্তুকলাবিদ। এসময় বুয়েটে স্থাপত্য অনুষদ চালুর ক্ষেত্রেও বিশেষ ভূমিকা রাখেন ও খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি। ছবি: সংগৃহীত

স্বাধীনতাসংগ্রাম ও একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধেও প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ করেন মাজহারুল ইসলাম। অন্যদিকে বাস্তুকলাবিদ থেকে চালিয়ে যাচ্ছিলেন স্থাপত্য ডিজাইন ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হন। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সরকার তাঁর প্রকল্পগুলো নিয়ে নেওয়ায় তিনি বাস্তুকলাবিদ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন। সৃজনশীলতা ও অভিজ্ঞতায় দেশের শ্রেষ্ঠ স্থপতি হয়েও তাকে তখন কর্মহীন থাকতে হয়েছে। তবে অর্থবিত্তের প্রতি লালসা ছিল না, তাই তিনি কখনোই দমে যাননি। দেশকে নিয়ে ভাবনার জায়গা সবসময়ই অটুট রেখেছেন। নতুন জন্ম নেওয়া বাংলাদেশের যাত্রার শুরুতেই বঙ্গবন্ধুর কাছে গিয়েছিলেন মাজহারুল ইসলাম। বঙ্গবন্ধুর কাছে দাবি জানিয়ে বলেছিলেন, 'দেশে মিনিস্ট্রি অব ফিজিক্যাল প্ল্যানিং নামে একটা মন্ত্রণালয় তৈরি করা উচিত। এ মন্ত্রণালয়ের কাজ হবে দেশকে সুন্দরভাবে গুছিয়ে রাখা।' এই প্রস্তাবটি কতোটা দূরদর্শী ছিল, তা দিন দিন আরও স্পষ্ট হচ্ছে। স্বাধীনতার পঞ্চাশবছরে আমরা অর্থনৈতিকভাবে অনেক উন্নতি করলেও, আমাদের বেশিরভাগ ভৌতিক উন্নয়ন রাজধানীকেন্দ্রিক। ফলে এখন আমরা বিকেন্দ্রীকরণ নিয়ে আলোচনা করি, অন্যান্য এলাকায় উন্নয়নের সুষম বণ্টনের কথা বলি। অথচ ভৌতিক উন্নয়ন নিয়ে সামগ্রিক মহাপরিকল্পনা থাকলে দেশ আরও আগেই অনেকদূর এগিয়ে যেতো।

মাজহারুল ইসলাম ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেন এবং প্রথম সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮০–৮১ সময়ে সৌদি আরব সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মূল ভবনের ডিজাইন প্রতিযোগিতা ও আগা খান স্থাপত্য পুরস্কারের বিচারক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে স্বাধীনতা পুরস্কার নিচ্ছেন মাজহারুল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

আজীবন সততা, নিষ্ঠা ও বাঙালিয়ানার প্রতি তীব্র আবেগ আঁকড়ে ধরে রেখেছেন মাজহারুল ইসলাম। রাজনীতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে স্থাপত্যবিদ্যার সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে তাঁর। তিনি মনে করতেন, স্থপতিরা সমাজের সবার সঙ্গে মিশে থেকে স্থাপনা তৈরি করলে তা সবার হবে। ৫৬ হাজার বর্গমাইলের পুরো বাংলাদেশের যথাযথ ভৌত পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রিত উন্নয়নের মাধ্যমে ডেস্কে একটি উন্নত, রুচিশীল ও সভ্য দেশে পরিণত করার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। তিনি বলতেন, 'একজন স্থপতি চাইলেই গোটা সমাজকে খোঁচাতে পারে, ভালো জিনিস বোঝাতে পারে।’ ২০১২ সালের ১৪ জুলাই ৮৯ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন মাজহারুল ইসলাম। কিন্তু তিনি তাঁর কাজ, আগাগোড়া বাঙালিয়ানা, মানবতাবাদী দর্শন, রাজনীতিসচেতন ও সংস্কৃতিমনস্ক চিন্তার যে উদাহরণ রেখে গেছেন, বাংলাদেশের স্থাপত্যের ইতিহাসে তা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। এই স্থপতির কাজ ও দর্শনকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে স্থাপত্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে, যা হয়ে ওঠবে সমৃদ্ধ দেশ গড়ার প্রেরণা।

 

ইত্তেফাক/এসটিএম